[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

লটারি বাদে আবার ভর্তি প্রতিযোগিতা, শিশুদের ওপর বাড়তে পারে চাপ

প্রকাশঃ
অ+ অ-
মঙ্গলবার সচিবালয়ের সংবাদ সম্মেলনে সব শ্রেণিতে লটারি পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্তের কথা জানান শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন 

স্কুলে প্রথম শ্রেণি থেকে ওপরের সব শ্রেণিতে ভর্তির জন্য বিদ্যমান লটারি পদ্ধতি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন সরকার। আগামী শিক্ষাবর্ষ (২০২৭ সাল) থেকে এই নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সরকারের এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।

এই সিদ্ধান্তের ফলে পছন্দের বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য শিশুদের আবারও সেই পুরোনো ‘ভর্তি যুদ্ধে’ নামতে হবে। শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশঙ্কা করছেন, শিশুদের বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে লটারির পরিবর্তে আবার পরীক্ষা নেওয়া হলে তাদের ওপর মানসিক চাপ বাড়বে। পাশাপাশি কোচিং ও প্রাইভেট পড়ার প্রবণতা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, যা শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এর আগে গত রোববার জাতীয় সংসদে কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, বিগত সরকারের চালু করা লটারি ব্যবস্থা তাঁর কাছে খুব একটা যুক্তিসংগত মনে হয়নি। আগামী শিক্ষাবর্ষে ভর্তির পদ্ধতি নির্ধারণের জন্য সবার মতামত নিয়ে বিষয়টি বিবেচনা করার কথা জানিয়েছিলেন তিনি।

তার একদিন পরেই আজ মন্ত্রী স্পষ্ট জানালেন, ভর্তিতে লটারির পরিবর্তে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে সরকার। তিনি সরাসরি বলেন, ‘আমরা লটারি ব্যবস্থা প্রত্যাহার করলাম।’

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা শিশুদের ভর্তিতে পরীক্ষা নিলে কোচিং ও ভর্তি বাণিজ্যের ঝুঁকি এবং শিক্ষাবিদদের উদ্বেগের কথা তুলে ধরে মন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন বলেন, প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত কোনোভাবেই ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া উচিত হবে না। ভর্তি পরীক্ষা মানেই হলো কোচিং বাণিজ্য ফিরে আসা। এছাড়া ভর্তি পরীক্ষায় ‘ফেল’ করার মাধ্যমে শিশুকে শুরুতেই ‘অযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা তাকে মানসিক ট্রমার মধ্যে ফেলে দেয়।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, ব্যাপক পর্যালোচনার মাধ্যমেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত এক মাস ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনার পর তাঁরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, কোনো কঠিন পরীক্ষা নেওয়া হবে না; প্রাথমিকের স্তরে খুব সাধারণ মানের পরীক্ষা নেওয়া হবে এবং পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা হবে।

অন্য একটি প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী আরও জানান, সরকার ধীরে ধীরে ‘জোনিং সিস্টেম’ বা এলাকাভিত্তিক বিদ্যালয়ে পড়ার ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা করছে।

উল্লেখ্য, একসময় ভর্তি পরীক্ষার কারণে খুব অল্প বয়সেই শিশুদের কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হতো। তখন কোচিং ও প্রাইভেটের ওপর নির্ভরশীলতা ছিল একটি সাধারণ বিষয়। নামী স্কুলগুলোতে সন্তানদের ভর্তি করাতে অনেক পরিবার কোচিং সেন্টারের দ্বারস্থ হতো। পাশাপাশি ভর্তিকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অনেক অভিযোগও শোনা যেত। ফলে সাধারণ ও দরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিশুদের জন্য ভালো স্কুলে ভর্তি হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত। এই পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা চলে আসছিল।

এমন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে প্রথমে কেবল প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য লটারি পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। ২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে যেসব সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি ছিল, সেখানে পরীক্ষার বদলে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি বাধ্যতামূলক করা হয়। পরের বছর বেসরকারি স্কুলগুলোতেও এই নিয়ম চালু হয়। তবে ওই সময় দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমেই চলত।

পরবর্তীতে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে ২০২১ শিক্ষাবর্ষে সব শ্রেণিতেই লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির নিয়ম করা হয়। সেই থেকে এখন পর্যন্ত এই পদ্ধতিতেই ভর্তি কার্যক্রম চলে আসছে।

সরকারের পক্ষ থেকে এখন আবারও স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা গত রোববার জাতীয় সংসদেও আলোচিত হয়। তবে শিক্ষাবিদ ও এই খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত পুরোনো সমস্যাগুলোকে আবারও সামনে নিয়ে আসতে পারে। তাঁদের মতে, শৈশবে শিশুদের মেধার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য থাকে না। তাই এই অল্প বয়সে পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী বাছাই করা মোটেও যুক্তিযুক্ত নয়। এতে শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ ও প্রতিযোগিতার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বে, যা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও বেশি বাণিজ্যিক করে তুলবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন এ বিষয়ে তাঁর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত কোনোভাবেই ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া উচিত নয়। তিনি মনে করেন, ভর্তি পরীক্ষা মানেই কোচিং বাণিজ্যকে উৎসাহিত করা। এছাড়া পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুর মেধা যাচাই করতে গিয়ে ‘ফেল’ করানো হলে তার ওপর একটি নেতিবাচক ছাপ পড়ে যে ‘সে পারে না’। এটি একটি শিশুকে মানসিক ট্রমার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন মনে করেন, প্রতিটি সরকারি বিদ্যালয়ের মান সমান বা কাছাকাছি হওয়া উচিত। সরকার নিজে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিদ্যালয়কে অন্যগুলোর চেয়ে ‘ভালো’ বলতে পারে না। যদি সব বিদ্যালয়ের মান প্রায় সমান হয়, তবে লটারি বা পরীক্ষার কোনো প্রয়োজনই পড়ে না। সে ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ এলাকার কাছের বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাবে। এর ফলে বিশেষ করে শহর অঞ্চলে যানজট কমবে এবং এলাকাবাসীর মধ্যে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সামাজিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে—যা সারা বিশ্বে প্রচলিত।

তিনি আরও বলেন, “ভর্তি পরীক্ষা ভালো কোনো সমাধান নয়, এমনকি লটারিরও প্রয়োজন নেই। আসলে যা প্রয়োজন তা হলো—শিক্ষা খাতে বাজেট বাড়িয়ে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া এবং বিদ্যালয়গুলোর পরিবেশ উন্নত করা।” একই সঙ্গে তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অষ্টম শ্রেণি এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ রাখার পরামর্শ দেন।

শিক্ষাবিদদের মতে, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে শিশুদের নিজ নিজ এলাকার স্কুলে ভর্তি করার নিয়ম চালু আছে। এতে অল্প বয়সে শিশুদের ওপর কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার চাপ পড়ে না এবং শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্যও অনেক কম থাকে। বড়দের জন্য মেধা যাচাইয়ের পরীক্ষা থাকলেও শিশুদের ক্ষেত্রে তা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ জানান, শিশুদের জন্য ভর্তি পরীক্ষা একটি বৈষম্যমূলক পদ্ধতি। এ ধরনের পরীক্ষায় সাধারণত তারাই ভালো করে, যারা কোচিং বা প্রাইভেট পড়ার সুযোগ পায়। তাঁর মতে, মূলত উচ্চবিত্ত বা উচ্চাভিলাষী মধ্যবিত্তদের একটি অংশই এই পরীক্ষা প্রথা চালুর দাবি জানায়, কারণ তাদের সন্তানদের কোচিং করানোর সামর্থ্য আছে। বর্তমান অবস্থায় লটারি পদ্ধতিই শিশুদের জন্য তুলনামূলক ভালো, তবে এই প্রক্রিয়াটি যেন পুরোপুরি স্বচ্ছ হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া তিনি প্রতিটি এলাকায় মানসম্মত বিদ্যালয় গড়ে তোলার ওপর জোর দেন, যাতে ভর্তি নিয়ে বাড়তি প্রতিযোগিতার প্রয়োজন না হয়।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী এ বিষয়ে জানান, পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে এখনো অনেক সময় বাকি। তাই এত দ্রুত এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হয়নি। সরকারের উচিত ছিল বিষয়টি নিয়ে আরও গবেষণা ও আলোচনা করে এর ভালো-মন্দ দিকগুলো গভীরভাবে বিবেচনা করা। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন