[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

মুহূর্তের এক আঘাতেই ছিন্নভিন্ন কয়েকটি জীবন, শোকাতুর জনপদ

প্রকাশঃ
অ+ অ-
ছিন্নভিন্ন মরদেহগুলো উদ্ধার করে পুলিশ। শুক্রবার রাতে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার ধলাটেঙ্গুরে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন  

‘আগামী মাসের ৭ তারিখ বেতন পাব, তারপর তোরে আর তোর মারে আমার কাছে নিয়ে আসুম’—মুঠোফোনে মেয়েকে এই কথাগুলো বলছিলেন সুলতান। ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার পথে বাস ছাড়ার অপেক্ষায় মুঠোফোনে কথা বলতে বলতে রেললাইনের ওপর হাঁটছিলেন তিনি। কথার মাঝখানেই আচমকা ট্রেনের শব্দ, তারপর চিৎকার। মুহূর্তের মধ্যেই সুলতানসহ আরও কয়েকজন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলেন।

গতকাল শুক্রবার রাতে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার ধলাটেঙ্গুরে ট্রেনের নিচে পড়ে পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেছেন প্রত্যক্ষদর্শী নূর ইসলাম। নিহত ব্যক্তিরা সবাই গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলার পূর্ব নিজপাড়া গ্রামের বাসিন্দা।

নূর ইসলামের বাড়ি গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায়। ঈদের ছুটি কাটিয়ে সুলতানসহ তাঁরা কয়েকজন মিলে একই বাসে কর্মস্থল টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার গোড়াই শিল্প এলাকায় ফিরছিলেন।

সকাল ১০টার দিকে সাদুল্যাপুর থেকে বনশ্রী পরিবহনের একটি বাসে রওনা হন তাঁরা। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সন্ধ্যার পর বাসটি যমুনা সেতু অতিক্রম করে কালিহাতীতে পৌঁছায়। কিন্তু ধলাটেঙ্গুর এলাকায় এসে বাসের জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে বাস থামিয়ে চালকের সহকারী তেল আনতে যান। যাত্রীরা এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করতে থাকেন, সন্ধ্যার অন্ধকারে।

গরমে বাসের ভেতর থাকা কষ্টকর হয়ে উঠায় নূর ইসলাম বলেন, কেউ কেউ বাস থেকে নেমে রাস্তার পাশে দাঁড়ান, কেউ বসেন পাশের রেললাইনে। এ সময় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা সিরাজগঞ্জগামী ‘সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি দ্রুতগতিতে এলে তার নিচে কাটা পড়ে ঘটনাস্থলেই মা–ছেলেসহ পাঁচজন নিহত হন।

নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে সুলতান ছাড়াও আছেন নার্গিস (৩৫), তাঁর ছেলে নিরব (১২), নার্গিসের বড় ছেলের শাশুড়ি দোলা (৩৫) ও রিফা (২৩)। তাঁরা সবাই মির্জাপুর উপজেলার গোড়াই শিল্প এলাকার বিভিন্ন কারখানার শ্রমিক।

নার্গিসের খালাতো বোন মুন্নী বেগম বলেন, সকালে রওনা দেওয়ার পর কয়েকবার নার্গিসের সঙ্গে তাঁর মুঠোফোনে কথা হয়। দুপুরে নার্গিস তীব্র যানজটের কথা জানিয়েছিলেন। সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে শেষবার ফোনে জানান, তারা যমুনা সেতুর কাছে পৌঁছেছেন। এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। পরে ফোন আসে দুর্ঘটনার খবর নিয়ে।

খবর পেয়ে রাত নয়টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে মুন্নী দেখেন চারপাশে কান্না আর স্বজনদের বিলাপ। চোখের সামনে সহযাত্রীদের হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে পড়েন অন্য যাত্রীরা।

একই বাসের যাত্রী মায়া বেগম বলেন, তারা সবাই একই এলাকার মানুষ, একই এলাকায় কর্মস্থল। তাই ভাড়া করা গাড়িতে একসাথে ফিরছিলেন। রাস্তায় অনেক গাড়ি চলছিল, গাড়ির শব্দে কেউ ট্রেনের শব্দ শুনতে পারেনি। তাই রেললাইনে বসে থাকা সহযাত্রীরা চোখের পলকে ট্রেনের নিচে কাটা পড়েন।

এ দুর্ঘটনার জন্য বাসটির চালক ও তাঁর সহকারীকে দায়ী করে নার্গিসের স্বামীর ভাগনি রিয়া আক্তার বলেন, পর্যাপ্ত তেল ছাড়া গাড়ি কীভাবে রওনা হয়? তাঁদের বিচার দাবি করেন তিনি।

টাঙ্গাইল রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান বলেন, বাসটি জব্দ করা হয়েছে। তবে চালক ও তাঁর সহকারী পলাতক রয়েছেন। স্বজনদের আবেদনের ভিত্তিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। শনিবার ভোরে স্বজনেরা মরদেহ নিয়ে গ্রামের পথে রওনা হয়েছেন।

নার্গিসের প্রতিবেশী আবদুল মোমিন বলেন, ভোর চারটার দিকে তারা মরদেহ নিয়ে রওনা হয়েছেন। সকাল আটটার দিকে গ্রামে পৌঁছে দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন