গ্রামে যাত্রাপালার আসর
![]() |
| খুলনা দাকোপ উপজেলার সুতারখালী গ্রামে দোল উৎসব উপলক্ষে আয়োজন করা হয় যাত্রাপালা ‘ডাইনি বধূ’। বৃহস্পতিবার রাতে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
ফাল্গুনের শেষ বিকেল। সন্ধ্যা নামার আগমুহূর্তে বসন্তের নরম বাতাসে হালকা কুয়াশার ছোপ। সুন্দরবনের কোলঘেঁষা খুলনার দাকোপ উপজেলার সুতারখালী পূর্বপাড়ার ধুলামাখা পথে তখন মানুষের চলাচল বাড়ছে। কারও হাতে বসার চাটাই, কেউবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন অনুষ্ঠানস্থলের দিকে। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ।
গ্রামটিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস বেশি হলেও উৎসবের আনন্দে কোনো ভেদাভেদ নেই। সন্ধ্যার পর থেকেই যাত্রামঞ্চের সামনে ভিড় জমতে থাকে। রাতে আশপাশের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও এসে শামিল হন। গ্রামীণ জনপদের এই আয়োজন যেন এক অন্য রকম সম্প্রীতির ছবি ফুটিয়ে তোলে।
সুতারখালী গ্রামের সামাজিক সংগঠন ‘আগমনী সংঘ’ বসন্তবরণ ও দোল উৎসব উপলক্ষে বর্ণিল আয়োজনের পাশাপাশি গত বৃহস্পতিবার রাতে যাত্রাপালার আয়োজন করে। রাত ১০টার দিকে মাইকে ঘোষণা আসে—শুরু হতে যাচ্ছে পাইকগাছা সূর্যতরুণ নাট্যসংস্থার পরিবেশনা ‘ডাইনি বধূ’। ঘোষণা শেষ হতেই চারপাশের কোলাহল থেমে যায়। দর্শকদের সব মনোযোগ তখন মঞ্চের দিকে।
দলীয়ভাবে দেশাত্মবোধক গান ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার, শেষ বাংলাদেশ’-এর সুরের মধ্য দিয়ে শুরু হয় শক্তিপদ সিংহ রচিত পালা ‘ডাইনি বধূ’। মঞ্চের পাশেই বসে নির্দেশক (প্রম্পটার) সংলাপের খাতা থেকে সংলাপ পড়ে দিচ্ছিলেন। রাত যত গভীর হচ্ছিল, দর্শকদের মুগ্ধতাও তত বাড়ছিল। হালকা হিমেল বাতাস আর ঘন কুয়াশা উপেক্ষা করে দর্শকেরা গভীর মনোযোগ দিয়ে পুরো পরিবেশনা উপভোগ করেন।
যাত্রাপালার দর্শকসারিতে ছিল সব শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতি। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী, শিশু, নারী, কৃষক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে দর্শকদের মধ্যে নারীর সংখ্যাই ছিল বেশি। সুতারখালী ছাড়াও দাকোপের বিভিন্ন গ্রাম থেকে মানুষ এই যাত্রাপালা দেখতে ছুটে আসেন।
দর্শকসারিতে উপস্থিত থাকা খুলনা পিটিআইয়ের নির্দেশক (ইনস্ট্রাক্টর) সঞ্জয় মণ্ডল বলেন, ‘যাত্রার যে ঐতিহ্য একসময় হারিয়ে যেতে বসেছিল, তা আবার ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। আজকের পরিবেশনা সত্যিই চমৎকার হয়েছে। শিল্পীদের অভিনয় ও উপস্থাপনা দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।’
একটি অহংকারী পরিবারের আভিজাত্যের লড়াই কীভাবে দুটি পরিবারে অন্ধকার ডেকে আনে—সেই গল্পই ফুটে উঠেছে এই যাত্রাপালার কাহিনীতে। ঘাত-প্রতিঘাত, আবেগ আর রোমাঞ্চে ভরা গল্পটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দর্শকদের ধরে রাখতে সক্ষম হয়। নাটকীয় সংলাপ, সংগীত, নৃত্য ও অভিনয়ের চমৎকার সমন্বয়ে পুরো আয়োজনটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।
![]() |
| যাত্রাপালায় শিশু, নারী, কৃষক, শিক্ষক ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ—সব পেশার মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
দাকোপ উপজেলার শ্রীনগর গ্রাম থেকে যাত্রা দেখতে আসা দর্শক শচীন দেব গাঁতিদার বলেন, ‘এই গ্রামে একসময় নিয়মিত যাত্রাপালার আয়োজন হতো। কিন্তু অনেক বছর সেই পরিবেশ ছিল না। এলাকার তরুণেরা আবার সেই সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে, এ জন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই। আজকের পরিবেশনা সত্যিই অসাধারণ হয়েছে, আমরা মুগ্ধ হয়েছি।’
সুতারখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাসুম আলী ফকির বলেন, ‘শিল্পীরা চমৎকার অভিনয় করেছেন। দর্শকেরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো পুরো যাত্রাপালা উপভোগ করেছেন। বিশেষ করে নারী দর্শকদের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো—তাঁরা পুরোটা সময় একচুলও জায়গা ছেড়ে ওঠেননি। সব মিলিয়ে আয়োজনটি ছিল উৎসবমুখর ও প্রাণবন্ত।’


Comments
Comments