[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

উপদেষ্টাদের নিজেদের স্তুতি কেন নিজেদেরই গাইতে হচ্ছে?

প্রকাশঃ
অ+ অ-
মুহাম্মদ ইউনূস | গ্রাফিক্স: পদ্মা ট্রিবিউন 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। এই নির্বাচনেই প্রথমবারের মতো সংসদে বিরোধী দল হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর, এর আগের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের কেউ কেউ তাদের ১৮ মাসের শাসনামলে নেওয়া পদক্ষেপ, কৌশল ও চুক্তি নিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনে বক্তব্য দিচ্ছেন। বলে রাখা দরকার, ওই সরকারের আমলেই ঘটে গেছে ভয়ঙ্কর সব ‘মব’-এর ঘটনা। দেশের দুটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার, সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের ভবন ও উদীচীর কার্যালয়, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি বারবার জ্বালিয়ে দেওয়া ছাড়াও অসংখ্য মাজার পুড়িয়ে দেওয়া, কবর থেকে লাশ তুলে এনে পোড়ানো, ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মানুষ হত্যা ও মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার সাক্ষী এই দেশের মানুষ। সেই আলাপ দেওয়ার জন‍্য এই লেখা নয়। আমাদের মূল আগ্রহ—সাবেক উপদেষ্টারা নিজেদের দায় কীভাবে দেখছেন এবং ব্যাখ্যা করছেন।

প্রথম আলো তাদের পুড়িয়ে দেওয়া ভবনে ‘আলো’ নামে এক বিশেষ প্রদর্শনী আয়োজন করে। মূলত হামলার ধরন এবং বীভৎসতা প্রদর্শন করাই এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সেই প্রদর্শনী দেখতে সেখানে যান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। তিনি সেই প্রদর্শনী দেখে সংবাদকর্মীদের কাছে মন্তব্য করেছেন, “সরকারে থাকা অবস্থায় প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের ওপর হামলা ঠেকাতে না পারাকে নিজেদের অনেক বড় ব্যর্থতা মনে করি।” ২৮ ফেব্রুয়ারির প্রথম আলোতেই তার বক্তব্যের আরও অনেকখানি উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, “সেই রাতের ঘটনা মনে পড়ে। ওই রাতে প্রায় ৫০-৬০ বার প্রথম আলোর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি। উৎকণ্ঠা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করেছি। ঠিক বোঝানো যাবে না কী রকম অসহায় অবস্থা একটি সরকারের লোকের হতে পারে। অবশ্যই আমরা এটা ঠেকাতে পারিনি সরকারে থাকা অবস্থায়। এটি আমাদের অনেক বড় ব্যর্থতা। কিন্তু প্রথম আলোর মানুষজন জানে আমাদের কী প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা ছিল।” এখানে যেটি হাজির করা হয়েছে তা হলো—‘তিনি চেষ্টা করেছেন, কিন্তু পারেননি।’ কিন্তু কেন পারেননি? কে বা কারা বাধা দিয়েছে? কারা চেয়েছে সেই আক্রমণ চলতে থাকুক? সরকারের কী সমস্যা ছিল? তিনি তার এই বক্তব্য থেকে এটি একবারও জানাননি। অথচ সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে তার দায়িত্ব কেন সেই হামলা রুখতে পারেননি, সেটি জনগণের কাছে পরিষ্কার করে বলা। তিনি বিভিন্ন জায়গায় ফোন করেছেন, কিন্তু কেন সেই ফোন কাজে লাগেনি? এত বড় আক্রমণের পর সেখানে এসে তিনি এসব কথা বলছেন কীভাবে?

আসিফ নজরুলের পর সরকারের আরেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার অন্তর্বর্তী সরকারের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি বিষয়ে বলতে গিয়ে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আওতায় সস্তায় মাংস, পোলট্রি ও অন্যান্য প্রাণিজ পণ্য আমদানির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। একটি দৈনিকে প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী তিনি বলেন, “শেষ দিন পর্যন্ত এই চুক্তির বিরুদ্ধে লড়েছি, সরকারের ভেতরে থেকেও আমরা চুক্তি ঠেকাতে পারিনি।” চুক্তির গোপনীয়তা নীতির সমালোচনা করে ফরিদা আখতার বলেন, “নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে এই চুক্তি হয়নি, বরং প্রক্রিয়াটি আগে থেকেই চলছিল। একটি দেশের সঙ্গে আরেকটি দেশের চুক্তি হচ্ছে, সেখানে আমরা গোপন রাখার কথা মেনে নিয়েছি। এমনকি সরকারের ভেতরেও সবাই সবটুকু জানতে পারবে না।” (দৈনিক কালের কণ্ঠ, ১৫ মার্চ ২০২৬)

খুব স্বাভাবিকভাবে যে প্রশ্নটি সবার সামনে আসে, তা হলো—এই দুজন উপদেষ্টা বলছেন তারা সরকারে থেকেও অনেক হামলা-আক্রমণ ঠেকাতে পারেননি। কিন্তু কেন পারেননি? তাহলে সব সিদ্ধান্ত কি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসই নিয়েছেন? তাহলে যে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের দোহাই এতদিন তারা দিয়েছেন, তারা নিজেরাও কি সেটিরই চর্চা করেছেন? তা না হলে তাদের মতো উপদেষ্টাদের সিদ্ধান্ত আমলে না নিয়ে কারা এগুলো করেছেন? উপদেষ্টারা তখন পদত্যাগ না করে কি সেটি সেভাবে চলার বৈধতা দিয়েছেন? যদি শুধু প্রধান উপদেষ্টা বা কয়েকজন উপদেষ্টার সিদ্ধান্তেই সব হতো, তাহলে তারা সেই উপদেষ্টা পরিষদে বসে তখন শুধু সেগুলোকে বৈধতাই দিয়ে গিয়েছিলেন? তারা শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করেছেন বলে দাবি করলেও কেউ কিন্তু পদত্যাগ করেননি। কেন? আজকে যখন চুক্তি নিয়ে এত সমালোচনা হচ্ছে—বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে বছরে প্রায় ১,৩২৭ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)—তখন একজন সাবেক উপদেষ্টা বলছেন তিনি এটির বিপক্ষে ছিলেন, লড়াই করেছেন, কিন্তু ঠেকাতে পারেননি। এবং সেটি হতে দিয়েছেন, কোনো অবস্থান নেননি এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সেই লড়াইও তিনি চালিয়ে যাননি।

তাহলে কে সরকার চালিয়েছে? কাদের বিরুদ্ধে তাদের এত অভিযোগ? সেই অভিযোগ পুষেই তারা এতদিন ‘সরকার-সংসার’ করেছেন? সেখান থেকে বের হয়ে এসে জনগণকে এগুলো জানানোর প্রয়োজন বোধ করেননি? তাহলে জনগণের সঙ্গেও তারা প্রতারণা করেছেন। ‘আমি পারিনি’—এটি বলে শুধু নিজেকে ব্যক্তিগতভাবে ভালো হিসেবে হাজির করার চেষ্টাই করা যায়, কিন্তু আপনি যখন উপদেষ্টার মতো একটি পদ নিয়ে দায়িত্ব পালন করবেন, তখন আপনার এই ব্যক্তিগত স্তুতি জনগণ কেন গ্রহণ করবে?

উপদেষ্টাদের মধ্যে বিভেদ ছিল, গ্রুপিং ছিল। সবার সিদ্ধান্তে সরকার চলত না—বিষয়টি এমনই ছিল। একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, সে সময় সরকারের ‘বেশিরভাগ বড় সিদ্ধান্ত’ হতো উপদেষ্টা পরিষদের বাইরে এবং সেখানে তিনি ‘কিচেন কেবিনেটে’র অস্তিত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। তার মানে কি তাহলে এই দাঁড়ায় যে, যেসব সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়েছে, সেগুলোতে সব উপদেষ্টার সম্মতি ছিল না? কয়েকজন উপদেষ্টার বিরোধিতা ও অসম্মতি অগ্রাহ্য করা হয়েছিল? তাহলে সেই উপদেষ্টারা কি শুধুমাত্র পদ এবং ক্ষমতার জন্য উপদেষ্টা পরিষদে ছিলেন? এই উপদেষ্টাদের কথার সরল অর্থ করলে মনে হয় সব সিদ্ধান্তই ছিল প্রধান উপদেষ্টার? অন্যরা ‘পুতুল’ উপদেষ্টা ছিলেন। শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী আচরণকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলেই তারা ক্ষমতায় গেলেন এবং জানালেন—ক্ষমতা নয়, তারা দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু কী দায়িত্ব পালন করলেন সেটিও জনগণ জানতে পারেনি; কারণ জনগণকে শুধুই জানতে হলো—আপনারা ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করেছেন কিন্তু পারেননি।

কিন্তু কেন পারলেন না? মুহাম্মদ ইউনূস আপনাদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে কর্তৃত্ববাদী আচরণ করছেন—আপনারা লড়াই করেছেন বলে এখন নিজেদের বাঁচাচ্ছেন; অথচ সে সময় সেটি আপনাদের কাছে কর্তৃত্ববাদী মনে হয়নি। তাহলে আপনাদের জনগণকে জানাতে হবে—আপনাদের লড়াই বা চেষ্টা যখন সফল হয়নি, তখন আপনারা এগুলো ঘটতে দেওয়ার বিপরীতে আর কী করেছিলেন? হামলার সময় প্রথম আলোতে আপনি কয়বার ফোন করেছেন সেটি কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নয়; সেই ফোন এদেশের অনেকেই করেছেন। কিন্তু আপনি উপদেষ্টা হয়েও কেন সেটি ঠেকাতে পারলেন না, তা জানবার অধিকার এদেশের মানুষের আছে।

ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর নিজেকে ‘আন্তরিক’ প্রমাণের চেষ্টার আগে ক্ষমতায় থাকার সময়ই জনগণকে নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন ছিল। সরকারের গোপনীয়তা রক্ষার দায়িত্ব মানে এই নয় যে জনগণের বিরুদ্ধে যাওয়া। তাই আপনাদের এই ধরনের আলাপ জনগণ কতটা গ্রহণ করছে, তা নিশ্চয়ই আপনারা বুঝতে পারছেন।

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন