লিচুবাগানে মৌমাছির গুঞ্জন, ফলন ও আয়ে নতুন সম্ভাবনা
| কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার ঐতিহ্যবাহী মঙ্গলবাড়িয়া লিচু গ্রামে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত মৌচাষিরা। গত শনিবার | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামে প্রায় ১০ হাজার লিচুগাছ আছে। এক বর্গকিলোমিটারের এ এলাকায় গ্রামের প্রতিটি বাড়ির উঠান, সামনের অংশ, পুকুরপাড় ও খেতের আলে লিচুগাছ দেখা যায়। তাই গ্রামটি দেশে ‘লিচুগ্রাম’ নামে পরিচিত। বর্তমানে এসব গাছে লিচুর মুকুল ভরে গেছে।
চাষিরা লিচুবাগানের নিচে মৌচাষের বাক্স স্থাপন করে মধু সংগ্রহ করছেন। আনসার মাহমুদ নামের এক ব্যক্তি নিজের লিচুগাছের নিচে ১২০টি মধুর বাক্স বসিয়েছেন। এ বাক্স তিনি শেরপুরের ‘খাঁটি দানা মৌ খামার’-এর সাহায্যে স্থাপন করেছেন। এতে তাঁর গাছসহ আশপাশের লিচুগাছে মৌমাছির মাধ্যমে ভালো পরাগায়ন হচ্ছে।
একইভাবে গাজীপুর থেকে মনির হোসেনের ‘মৌচাক এগ্রো’ খামারও কিছু মধুর বাক্স স্থাপন করেছে। এছাড়া সাভার থেকে আসা মুয়াজ্জিনের মোল্লা খামার ও স্থানীয় বাসিন্দা সফির উদ্দিনের খামার মিলিয়ে দুই শতাধিক বাক্স স্থাপন করা হয়েছে। চারটি খামারে মোট তিন শতাধিক বাক্সে এখন মধু সংগ্রহ চলছে।
কয়েকজন মৌচাষি বলেন, গাছের নিচে মধুর বাক্স রাখলে মৌমাছির মাধ্যমে ফুলের পরাগায়ন সহজ হয়। এতে লিচুর উৎপাদন বাড়ছে এবং মধুও পাওয়া যাচ্ছে। সমন্বিত এই চাষে লিচুচাষি ও মৌচাষি—উভয়েই লাভবান হচ্ছেন। মধু ও মৌমাছি বিক্রি করে আর্থিকভাবে সচ্ছলও হচ্ছেন। মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামে ঢুকলেই শোনা যায় মৌমাছির ভনভন। প্রতিটি বাক্সে আটটি মৌচাক ও একটি করে রানি মৌমাছি থাকে। চাষিরা সেগুলোর পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
মৌচাষি আনসার মাহমুদ বলেন, ‘মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর খ্যাতি দেশজুড়ে। লিচুর মৌসুমে মৌমাছির মাধ্যমে মধু সংগ্রহ সুবিধাজনক হওয়ায় প্রতিবছর এ সময় এখানে মৌচাষ করা হয়। এতে আর্থিক সচ্ছলতা আসে। ১২০টি বাক্স থেকে আমি দুই টন লিচুর মধু সংগ্রহের আশা করছি। এতে সাত থেকে আট লাখ টাকার আয়ের সুযোগ আছে।’
গত শনিবার সরেজমিন দেখা গেছে, গ্রামের প্রতিটি লিচুগাছ মুকুলে ভরে আছে। চাষিরা বাম্পার ফলনের আশা করছেন। মৌচাকের আশপাশে অসংখ্য মৌমাছি ভনভন করছে। গাছের নিচের সারিবদ্ধ বাক্স থেকে মৌমাছি উড়ে গিয়ে লিচুর ফুলে বসছে, মধু সংগ্রহ করে আবার ফিরে আসছে।
লিচুচাষি তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর লিচুগাছ মুকুলে ভরপুর। আবহাওয়া ভালো থাকলে বাম্পার ফলনের আশা আছে। লিচু চাষের পাশাপাশি মৌমাছির মাধ্যমে মধু উৎপাদন করে মৌচাষিরাও লাভবান হবেন।’
গাজীপুর থেকে আসা মধুচাষি মনিরুজ্জামান বলেন, ‘মঙ্গলবাড়িয়ার লিচু ফুলের মধু স্বাদে ভালো। সারা দেশে এর চাহিদা আছে। পাইকার ও আশপাশের মানুষ সরাসরি মৌ নিয়ে যান। প্রতি কেজি মধু ৬০০–৭০০ টাকায় বিক্রি হয়।’
পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুর-ই-আলম বলেন, ‘মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামে প্রায় ১০ হাজার লিচুগাছ আছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে এই লিচুর খ্যাতি আছে। এবারের আবহাওয়া ভালো থাকায় প্রতিটি গাছে ফুল ও মুকুল ভরে গেছে। মৌমাছিরা লিচু ফুলে বসে মধু সংগ্রহ করছে। এতে সহজে পরাগায়ন হচ্ছে এবং পোকামাকড়ের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ফলন বাড়ছে। তাই লিচুবাগানের পাশে মৌচাষের বাক্স রাখলে লিচুর ফলন বাড়ছে এবং মৌচাষিরাও লাভবান হচ্ছেন। এ বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
Comments
Comments