তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতার
| আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদ্য বিদায়ী চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম | গ্রাফিক্স: পদ্মা ট্রিবিউন |
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদ্য বিদায়ী চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বেসরকারি সেলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী মোহাম্মদ সম্রাট রোবায়েত। তাঁর অভিযোগ, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি, সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীকে রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছিল। তাজুল ইসলাম ফজলে করিমের ছেলে ফারাজ করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হতে দেননি।
সম্রাট রোবায়েত এই অভিযোগটি ট্রাইব্যুনালের বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের কাছে জানিয়েছেন। তিনি ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া মামলার অভিযোগকারী। এর আগে সম্রাট রোবায়েত চট্টগ্রামের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখ্য সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
![]() |
| রাউজানের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী | ছবি: সংগৃহীত |
সম্রাট রোবায়েত বলেন, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে গিয়ে তিনি আমিনুল ইসলামের কাছে এ অভিযোগ দিয়েছেন।
সম্রাট রোবায়েতের অভিযোগ, তাজুল ইসলাম এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম, মো.মিজানুল ইসলাম ও তারেক আবদুল্লাহ মিলে একটি চক্র গড়ে চিহ্নিত অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা চালান। তাজুল ইসলাম আসামি ফজলে করিমের ছেলে ফারাজ করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হতে দেননি।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে চট্টগ্রাম-৬ আসনে (রাউজান) আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরী বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। সোমবার এ মামলায় ট্রাইব্যুনালে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল, তবে তা হয়নি। নতুন দিন ধার্য করা হয়েছে ১২ এপ্রিল।
![]() |
| আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে বিদায় নেওয়ার দিন সাংবাদিকদের মুখোমুখি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | ফাইল ছবি |
চট্টগ্রামের সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীকে জামিন পাইয়ে দিতে এক কোটি টাকা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে। তিনি এই মামলার দায়িত্বে ছিলেন।
একটি বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, জামিন করিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের কাছে ওই মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেছিলেন সাইমুম রেজা তালুকদার।
প্রতিবেদন প্রকাশের দিনই ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি ‘তথ্য অনুসন্ধান কমিটি’ গঠন করা হয়। চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের উদ্যোগে গঠিত এই কমিটি ইতিমধ্যে দুটি বৈঠক করেছে। সাইমুম রেজা তালুকদার এরই মধ্যে প্রসিকিউটরের পদ ছেড়েছেন।
তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা সম্রাট রোবায়েতের করা অভিযোগের বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রামের ওই মামলার বিষয়ে তাঁদের তদন্ত চলছে। তাই বিষয়টি নিয়ে বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়। যিনি অভিযোগ দিয়েছেন এবং কী অভিযোগ দিয়েছেন—এ সম্পর্কেও এখন কিছু প্রকাশ করা হবে না। কমিটি বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে, এবং সবকিছুই তাদের প্রতিবেদনে উঠে আসবে।
চিফ প্রসিকিউটরের কাছে দেওয়া সম্রাট রোবায়েতের লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম, মো. মিজানুল ইসলাম ও তারেক আবদুল্লাহ মিলে একটি চক্র গড়ে চিহ্নিত অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করেছেন।
অভিযোগে বলা হয়, চট্টগ্রামের ঘটনায় ট্রাইব্যুনালের তদন্তে ৫৫ জনের বেশি সাক্ষী সরাসরি ফারাজ করিমের নাম উল্লেখ করলেও তাজুল ইসলাম বিশেষ আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে ফারাজের নাম গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থেকে বাদ দেন। পারিবারিক সম্পর্কের কারণে তিনি ফারাজের মায়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন।
ফারাজের মা রিজওয়ানা ইউসুফ সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীর সাবেক স্ত্রী। ট্রাইব্যুনালের এই মামলায় তিনি সাবেক স্বামীর হয়ে লড়ছেন।
সম্রাট রোবায়েত আরও অভিযোগ করেছেন, ফজলে করিমের শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক থাকা এবং প্রিজনের আইজির ভাষ্যমতে অসুস্থতা ‘সিজনাল’ হওয়ার পরও তাঁকে জামিন দেওয়ার ষড়যন্ত্র হয়েছে।
এই অভিযোগের বিষয়ে সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এখন দায়িত্বে নেই, তাই কোথায় কে অভিযোগ করছে, সে বিষয়ে আমার ধারণা নেই। তবে বোঝা যায়, বিচারপ্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ করার হীন উদ্দেশ্যে এ ধরনের ভিত্তিহীন ও মিথ্যা প্রচারণা চালানো হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন নিজেদের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করেছে। প্রাথমিক তদন্তে যাঁদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, তাঁদেরকেই আসামি করা হয়েছে। কাউকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে আসামি করা হয়নি এবং অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত কাউকে বাদও দেওয়া হয়নি। চট্টগ্রামের মামলার তদন্ত রিপোর্ট এখনও গৃহীত হয়নি। আমার সময়ে বিষয়টি আরও তদন্তের জন্য বিবেচনাধীন ছিল।’
তাজুল ইসলাম বলেন, ‘জামিন দেওয়ার ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত বক্তব্য সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমার সময়ে উল্লিখিত ব্যক্তির কোনো জামিনের দরখাস্ত কোর্টে উপস্থাপিত হয়নি। অস্তিত্বহীন বিষয়ে কল্পিত অভিযোগ এনে গণহত্যাকারীদের বিচার প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে এসব মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও পরিকল্পিত অভিযোগ তোলা হচ্ছে।’
তদন্ত চলমান। তাই এ নিয়ে বেশি কিছু বলার সুযোগ নেই। সব বিষয় তাঁদের কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসবে।
আমিনুল ইসলাম, চিফ প্রসিকিউটর
চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে সৎভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে দাবি করে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাই গণহত্যাসহ গুম ও অন্যান্য অপরাধের বিচারে আমি ছিলাম আপসহীন, যা গোটা জাতি জানে। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, দুর্নীতির ন্যূনতম কোনো প্রমাণও কেউ দেখাতে পারবে না। শুধুমাত্র অবান্তর ও মিথ্যা অভিযোগের ধোঁয়া তুলে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা এবং সর্বশেষে গণহত্যাকারী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার প্রশ্নবিদ্ধ করার অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এসব মিডিয়া ট্রায়াল করা হচ্ছে। আমি সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ ধরনের হীন চেষ্টা থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করছি।’
![]() |
| আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল | ফাইল ছবি |
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তাজুল ইসলামকে চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ করেছিল।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর ২৩ ফেব্রুয়ারি তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করা হয় এবং এই পদে বসানো হয় আমিনুল ইসলামকে।
এর আগে তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছিলেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ। তাঁর অভিযোগ, চিফ প্রসিকিউটরের পদকে টাকা আয়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল তাজুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন ‘সিন্ডিকেট’। তবে তাজুল ইসলাম সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম ও মিজানুল ইসলামের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগে সম্রাট রোবায়েত বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি যে বৃহৎ অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তামীম ও মিজান যেকোনো মূল্যেই ফারাজ ও ফজলে করিমকে রক্ষা করার শপথ নিয়েছেন। এ ধরনের কলঙ্কজনক ঘটনা ট্রাইব্যুনালের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধ্বংস করছে।’
অভিযোগ অস্বীকার করে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন বলেন, ‘চট্টগ্রামের মামলার সঙ্গে আমি প্রথম থেকেই জড়িত নই। এই মামলার ঘটনা বা আসামি সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই।’
অভিযোগকারী সম্রাট রোবায়েতকে চেনেন না বলে দাবি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামের মামলার সঙ্গে আমি কখনো সংশ্লিষ্ট ছিলাম না। অভিযোগ করার অধিকার সবারই আছে। এটুকু বলতে পারি, আমার সঙ্গে কারও এ বিষয়ে কোনো কথা হয়নি। আমার জীবনে এক পয়সাও অবৈধ আয় হয়নি।’
প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহর বিষয়ে অভিযোগে উল্লেখ আছে, তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদন দাখিল করতে চাইলেও ‘এই চক্রটি’ বারবার সময়ক্ষেপণ করেছে। তদন্ত অফিসে এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ তাঁদের সঙ্গে অত্যন্ত বাজে আচরণ করেছেন।
এ মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ। তবে সম্রাট রোবায়েতের সঙ্গে একবার দেখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তারেক আবদুল্লাহ বলেন, ২০২৫ সালের শেষের দিকে একদিন সম্রাটসহ চার–পাঁচজন ট্রাইব্যুনালে আসেন। চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের কনফারেন্স কক্ষে বসেছিলেন তাঁরা। সেখানে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও মো. সহিদুল ইসলাম সরদার, তদন্ত সংস্থার কো-অর্ডিনেটর মুহাম্মদ শহীদুল্যাহ চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন প্রসিকিউটর ও তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন।
তারেক আবদুল্লাহ বলেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে সম্রাট বলছিলেন, ‘আমরা ১৫ জনের নামে ওয়ারেন্ট দিতে বলেছি, আপনারা ১৪ জনের নামে কেন ওয়ারেন্ট দিয়েছেন?’ জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করতে দেখে তিনি জানান, ট্রাইব্যুনাল কয়জনের নামে ওয়ারেন্ট দেবেন, তা তাঁদের কথা অনুযায়ী হবে। কথাগুলো তিনি উচ্চস্বরে বলেছিলেন; এর বাইরে তিনি কিছু জানেন না।



Comments
Comments