স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা আবার চালুর আলোচনা, শিক্ষাবিদরা কী বলছেন
![]() |
| প্রতীকী ছবি |
বিদ্যালয়ে প্রাথমিক স্তরে শিশুদের ভর্তির ক্ষেত্রে আবারও ভর্তি পরীক্ষা চালুর বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। গতকাল রোববার বিষয়টি জাতীয় সংসদেও উত্থাপিত হয়। তবে শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, লটারির পরিবর্তে পরীক্ষা পদ্ধতি ফিরে এলে শিশুদের ওপর মানসিক চাপ বাড়বে এবং কোচিং ও প্রাইভেট পড়ার প্রবণতা আবার জেঁকে বসবে। এতে শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য তৈরি হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে।
সংসদে কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, বিগত সরকারের চালু করা লটারি ব্যবস্থা তাঁর কাছে খুব একটা যুক্তিসঙ্গত মনে হয়নি। তাই আগামী শিক্ষাবর্ষে ভর্তি পদ্ধতি কী হবে, তা নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর (অংশীজন) সঙ্গে আলোচনা করে সবার মতামত নেওয়া হবে।
তবে শিক্ষাবিদদের মতে, ভর্তি পরীক্ষা চালুর এই আলোচনা শিক্ষা ক্ষেত্রে পুরোনো সংকটগুলোকেই আবার ফিরিয়ে আনতে পারে। তাঁদের মতে, লটারি প্রথা বাদ দিয়ে পরীক্ষায় ফিরে যাওয়ার আগে বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। অন্যথায় শিশুদের ওপর অতিরিক্ত চাপ, কোচিং-নির্ভরতা এবং ভর্তিকে কেন্দ্র করে অনিয়মের মতো পুরোনো সমস্যাগুলো আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।
অধ্যাপক কামরুল হাসানের মতে, সরকারের প্রতিটি বিদ্যালয় মানসম্মত হওয়া উচিত। সব বিদ্যালয় যদি সমমানের হয়, তবে লটারিরও প্রয়োজন পড়বে না; বরং যে এলাকার শিশু সেই এলাকার স্কুলেই পড়বে। এতে যাতায়াত সহজ হবে, যানজট কমবে এবং সামাজিক সম্পর্ক দৃঢ় হবে। তিনি আরও পরামর্শ দেন যে, শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়িয়ে ভালো শিক্ষক নিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নত করা জরুরি। সেই সাথে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে অষ্টম শ্রেণি এবং মাধ্যমিকগুলোকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করা প্রয়োজন।
একসময় ভর্তি পরীক্ষার কারণে শিশুদের কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হতো এবং কোচিং-প্রাইভেট ছিল অবধারিত। নামী বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া বা স্বজনপ্রীতির অভিযোগও ছিল প্রচুর, যার ফলে দরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিশুদের জন্য ভালো স্কুলে ভর্তি হওয়া কঠিন হয়ে পড়ত।
এসব সমস্যা দূর করতে ২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে লটারি পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করা হয়। পরের বছর বেসরকারি হাসপাতালেও এই নিয়ম চালু হয়। তবে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষা তখনো বহাল ছিল। পরবর্তী সময়ে করোনা মহামারির কারণে ২০২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে সব শ্রেণিতেই লটারির মাধ্যমে ভর্তি শুরু হয়, যা এখন পর্যন্ত কার্যকর রয়েছে।
ভর্তি পরীক্ষা মানেই হলো শিশুর মেধার যাচাই করা। এতে ফেল করা মানেই শিশুকে 'ট্যাগ' দেওয়া যে সে পারে না। এভাবে শিশুকে ট্রমার মধ্যে দেওয়া উচিত না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন
শিক্ষাবিদদের মতে, বিশ্বের অনেক দেশে শিশুদের নিজ নিজ এলাকার বিদ্যালয়ে ভর্তি করার নিয়ম অনুসরণ করা হয়। এতে অল্প বয়সেই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রয়োজন পড়ে না এবং শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্যও কম থাকে। বড়দের ক্ষেত্রে মেধা যাচাইয়ের পরীক্ষা থাকতে পারলেও শিশুদের জন্য তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, শিশুদের জন্য ভর্তি পরীক্ষা একটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা। এই পরীক্ষায় মূলত তারাই এগিয়ে থাকে যারা কোচিং বা প্রাইভেট পড়ার সুযোগ পায়। তাঁর মতে, মূলত উচ্চবিত্ত বা উচ্চাভিলাষী মধ্যবিত্তদের একটি অংশই এই পরীক্ষা পদ্ধতি ফিরে পেতে আগ্রহী, কারণ তাদের সন্তানকে আলাদাভাবে পড়ানোর সামর্থ্য আছে। বর্তমান অবস্থায় লটারি পদ্ধতিই তুলনামূলকভাবে ভালো, তবে এই প্রক্রিয়াটি যেন স্বচ্ছ হয় তা নিশ্চিত করা জরুরি।
সেই সঙ্গে তিনি প্রতিটি এলাকায় মানসম্মত বিদ্যালয় গড়ে তোলার ওপর বিশেষ জোর দেন। তাঁর মতে, সব এলাকায় শিক্ষার মান সমান হলে শিশুদের ভর্তি নিয়ে আর এমন অসম প্রতিযোগিতার প্রয়োজন পড়বে না।

Comments
Comments