ধর্মের দোহাই দিয়ে পাশবিকতার এক কালো অধ্যায়
![]() |
| ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী দেশব্যাপী গণহত্যা চালিয়েছিল | ছবি: সংগৃহীত |
শুরু হয়েছে অগ্নিঝরা মার্চ। এই মাস আমাদের জাতীয় জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জনের সূচনালগ্ন, আবার একই সঙ্গে শোক ও দহনের স্মৃতিবাহী। ১৯৭১ সালের মার্চে বাংলার মানুষ যখন স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর, ঠিক তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এক পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে। তাদের এই পাশবিকতার সবচেয়ে করুণ দিকটি ছিল ধর্মের দোহাই দিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষের ওপর আক্রমণ। যে পাকিস্তানি শাসকেরা ‘ইসলাম রক্ষা’র বুলি আওড়ে এদেশের মানুষের ওপর চড়াও হয়েছিল, তাদের হাতেই সবচেয়ে বেশি লাঞ্ছিত ও অবমানিত হয়েছে ইসলাম ধর্ম এবং পবিত্র ধর্মীয় স্থাপনাগুলো। একাত্তরের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোতে মসজিদ, মাদ্রাসা ও পবিত্র কোরআন শরিফও তাদের পৈশাচিকতা থেকে রেহাই পায়নি।
পাকিস্তানি বাহিনী দেশজুড়ে গণহত্যার যে নীল নকশা বাস্তবায়ন করেছিল, তাতে বাংলার বহু মসজিদ ও মাদ্রাসার মতো পবিত্র স্থানগুলো হয়ে উঠেছিল বধ্যভূমি। গবেষক ড. আহম্মেদ শরীফের লেখা মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার প্রকৃতি ও স্বরূপ: ১৯৭১ গ্রন্থে এমন কিছু ঘটনার বিবরণ উঠে এসেছে। নাটোর সদর উপজেলার বনবেলঘরিয়ার মসজিদে ১০৫ বছরের বৃদ্ধ সৈয়দ আলী মুন্সিকে ইবাদত করা অবস্থায় টেনে বের করে হত্যা করে হানাদার বাহিনী। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সালামপুর মসজিদে নামাজ পড়া অবস্থায় গুলি করে হত্যা করা হয় দুজনকে।
লালমনিরহাটের ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের সাকোয়া জামে মসজিদে ৬৪ জনকে আটকে রেখে আগুন ধরিয়ে দেয় পাকিস্তানি সৈন্যরা। আগুনের লেলিহান শিখায় ভস্মীভূত হয় ৬৪টি প্রাণ। একইভাবে পঞ্চগড়ের দুইপাড়া মাদ্রাসায় আশ্রয় নেওয়া মানুষদের টেনেহিঁচড়ে বের করে হত্যা করা হয়। কোরআনের হাফেজ আসিকুল্লাহকেও তারা গুলি করে হত্যা করতে দ্বিধা করেনি।
ফতেঙ্গাপাড়া গণহত্যায় শহীদ আব্দুস সালাম সরকারের বুকের ওপর পাওয়া গিয়েছিল রক্তভেজা কোরআন শরিফ। ঠাকুরগাঁওয়ে পুলিশ লাইন সংলগ্ন মাদ্রাসায় পবিত্র কোরআন শরিফ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, তাদের কাছে ধর্মের কোনো প্রকৃত মর্যাদা ছিল না। ধর্ম ছিল তাদের কাছে কেবল একটি রাজনৈতিক অস্ত্র।
মসজিদ থেকে ১১ তরুণীকে উদ্ধার
তপন কুমার দে তাঁর বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও নারী ধর্ষণ গ্রন্থে একাত্তরে নারী নির্যাতনের প্রামাণ্য সব তথ্য তুলে এনেছেন। তাঁর বইতেই মসজিদ থেকে ১১ তরুণীকে উদ্ধার করার ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়।
১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর। দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র কয়েক দিন বাকি। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন বিক্রম সিং তখন সাতক্ষীরার দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। সঙ্গে আছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মুসা সাদিকসহ একদল মুক্তিযোদ্ধা। মাহমুদপুর ঘোনার কাছে তিন কৃষক ও দুজন কিশোর তাঁদের গাড়ি থামান। গাড়ি থামানোর পর সেই পাঁচজন কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁদের কাছ থেকে যা জানা গেল, তা শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন সবাই। কাছের একটি মসজিদে পাকিস্তানি হানাদাররা গত কয়েক মাস ধরে এলাকার ১১ জন তরুণীকে আটকে রেখেছিল।
মসজিদটি দখলমুক্ত করে দেখা যায় এক অবর্ণনীয় দৃশ্য। মসজিদের ভেতরে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন ১১ জন নারী। তাঁদের প্রত্যেকের শরীর ছিল সম্পূর্ণ বিবস্ত্র। নয় মাস ধরে এই পবিত্র ইবাদতের স্থানটিকে পাকিস্তানি সেনারা তাদের লালসা মেটানোর জায়গা হিসেবে ব্যবহার করেছে। যে সেনারা নিজেদের ইসলামের সৈনিক দাবি করত, তারা মসজিদের পবিত্রতা নষ্ট করে সেখানে নির্যাতনের আস্তানা গেড়েছিল।
একাত্তরের গণহত্যা কেবল ভূখণ্ড দখলের লড়াই ছিল না। এটি ছিল একটি জাতির সংস্কৃতি, বিশ্বাস এবং মানবিকতার ওপর চরম আঘাত। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা ধর্মের দোহাই দিয়ে যে পৈশাচিকতা চালিয়েছে, তা মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পর আজ যখন আমরা অগ্নিঝরা মার্চকে স্মরণ করি, তখন এই সত্যটি বারবার আমাদের সামনে আসে যে—ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা কোনো দিন হত্যা বা নির্যাতনকে প্রশ্রয় দেয় না।
মসজিদের পবিত্র আঙিনায় যারা রক্ত ঝরিয়েছে, যারা মা-বোনদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছে, তারা ইসলামের রক্ষক নয়। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই সত্যগুলো তুলে ধরা জরুরি, যাতে ধর্মের অপব্যবহার করে আর কেউ কোনো দিন এমন মানবতাবিরোধী অপরাধ করতে না পারে।
তথ্যসূত্র:
১. মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার প্রকৃতি ও স্বরূপ: ১৯৭১ — ড. আহম্মেদ শরীফ।
২. বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও নারী ধর্ষণ — তপন কুমার দে।

Comments
Comments