যুদ্ধের প্রভাবে অনিশ্চয়তায় মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর শ্রমবাজার
প্রকাশঃ
বিদেশে যেতে ছাড়পত্র নেওয়া কমছে
২০২৫
২০২৬
সূত্র : বিএমইটি
৪৭৬৮
২৩২৮
১ মার্চ
৩৪৯৯
৩৩৮৫
২ মার্চ
৪৩৯৯
২৬০৭
৩ মার্চ
৫৭৫৩
২৩৯৯
৪ মার্চ
৬৩৯৭
২৬৬৪
৫ মার্চ
৬৪৪০
৮৭০
৬ মার্চ
২৯
৩৫৯
৭ মার্চ
৪৬০৩
১৪৭০
৮ মার্চ
৬৪৩৯
২৯২৮
৯ মার্চ
৪০৯৩
২২৩২
১০ মার্চ
বিদেশে বাংলাদেশের মানুষের কাজের সুযোগ মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মী যান সৌদি আরবে। তবে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিমান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে প্রবাসীরা যেমন ঝুঁকিতে পড়েছেন, তেমনি তাঁদের কাজ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ছুটিতে দেশে এসে অনেকে আটকা পড়েছেন, আবার অনেক নতুন কর্মী সময়মতো যেতে পারছেন না। সব মিলিয়ে বিদেশের শ্রমবাজার এখন ঝুঁকির মুখে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে গত বছরের তুলনায় এই সময়ে কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশ যাত্রা কমেছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি মার্চ মাসের প্রথম ১০ দিনে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বিদেশ যাওয়ার অনুমতি বা ছাড়পত্র নেওয়ার হার প্রায় অর্ধেক কমে গেছে।
বিদেশে কর্মী পাঠানোর সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প বাজার তৈরি করা গেলে এই সংকট হতো না। দীর্ঘ সময় পার হলেও মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বড় কোনো শ্রমবাজার গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে দক্ষ জনবল তৈরি করতে না পারায় ইউরোপ ও জাপানের মতো সম্ভাবনাময় দেশগুলোতে আশানুরূপ কর্মী পাঠানো যাচ্ছে না। এর পাশাপাশি প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে কর্মী পাঠানোর তালিকায় ১৬৮টি দেশের নাম থাকলেও গত বছর বাংলাদেশ থেকে কর্মীরা গিয়েছেন ১৪১টি দেশে। তবে এর মধ্যে ৯০ শতাংশ কর্মীই গিয়েছেন মাত্র ৫টি দেশে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৩টি দেশে মাত্র ১ জন করে এবং ৩৪টি দেশে ২ থেকে ১০ জন করে কর্মী গিয়েছেন। ২০২৫ সালে মোট ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মী বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, যার মধ্যে ৬৭ শতাংশেরই গন্তব্য ছিল সৌদি আরব।
অভিবাসন খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশের শ্রমবাজার কেবল মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে সৌদি আরবনির্ভর হওয়ায় যুদ্ধের প্রভাবে এখন বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিকল্প বাজার না থাকায় কর্মী পাঠানো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়া ও মানবপাচারের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই মুহূর্তে আটকে পড়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো এবং প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। উল্লেখ্য, চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত সৌদি আরবে দুজন এবং বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে একজন করে বাংলাদেশি প্রবাসী প্রাণ হারিয়েছেন।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, যুদ্ধকবলিত প্রবাসীদের সহায়তায় সার্বক্ষণিক জরুরি যোগাযোগ নম্বর ও নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ও আটকে পড়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়াতে ৯ মার্চ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিহত প্রবাসীর মরদেহ দাফন করা হয়েছে এবং বাকিদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।
সরকার এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে উল্লেখ করে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীরা ফিরে এলে তাঁদের পুনর্বাসনে সহায়তা করা হবে। যাঁরা যেতে পারছেন না, তাঁদের ভিসার মেয়াদ বাড়াতে দূতাবাসকে অনুরোধ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে আবেদনের ভিত্তিতে কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ৩১ মার্চ পর্যন্ত ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সরকারের মূল লক্ষ্য হলো নতুন শ্রমবাজার তৈরি করা। এজন্য দক্ষ কর্মী গড়ে তোলায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জাপান ও ইউরোপের মতো সম্ভাবনাময় বাজারগুলো নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গেও আলোচনা চলছে।
ওমান থেকে গত ২১ জানুয়ারি দেশে বেড়াতে এসেছেন কুমিল্লার মোবারক হোসেন। তিনি জানান, মার্চের শুরুতে তাঁর কর্মস্থলে ফেরার কথা ছিল এবং তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকেও যোগাযোগ করা হয়েছে। কিন্তু নিয়মিত বিমান চলাচল না থাকায় তিনি যেতে পারছেন না। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তাঁর আর কিছু করার নেই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে বিমান চলাচল শুরু হলে তিনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে আবার ফিরে যেতে চান।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এরপর যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ১৪টি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মোট ৩৯১টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে গত বুধবারই ২৪টি ফ্লাইট বাতিল হয়। ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা বন্ধ রেখেছে।
একইভাবে দেশে বেড়াতে এসে আটকা পড়েছেন কুমিল্লার ফরহাদ হোসাইন। তিনি ওমানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসির কাজ করেন। ফরহাদ জানান, এই সময়ে সেখানে কাজের অনেক চাপ থাকে। মাত্র ১৫ দিনের ছুটিতে দেশে এলেও এখন তিনি আটকা পড়ে আছেন। ওমান থেকে তাঁর প্রতিষ্ঠান দ্রুত ফেরার জন্য তাগিদ দিলেও বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় তিনি যেতে পারছেন না।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, গত মাসেও বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন ৬৫ হাজার ৬১৩ জন। এর মধ্যে মাসের প্রথম ১০ দিনেই গিয়েছিলেন প্রায় ৩৮ হাজার কর্মী। তবে চলতি মার্চ মাসের ১ থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত বিদেশ যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছেন মাত্র ২১ হাজার ১২২ জন। গত বছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৪৬ হাজার ৭৪৪। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর পর বিদেশ যাওয়ার হার কমে অর্ধেকে নেমেছে। সৌদি আরবে কিছু বিমান চলাচল চালু থাকায় সীমিত সংখ্যক কর্মী যেতে পারছেন, তবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনেকেই এখন ভয়ে যেতে চাইছেন না।
তৃণমূল অভিবাসীদের সংগঠন অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ৪৫ থেকে ৫০ লাখ কর্মী কাজ করছেন। তাঁদের ভবিষ্যৎ কী হবে বা সবার চাকরি থাকবে কি না—সেসব বিষয় নিয়ে এখন থেকেই ভাবতে হবে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। যাঁরা টাকা দিয়েও যেতে পারছেন না, সরকার তাঁদের একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করতে পারে, যাতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তাঁরা যাওয়ার সুযোগ পান।
অভিবাসন খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অনেকেই বিদেশে যেতে ঋণ করেন। এখন যেতে না পারায় তাঁরা ঋণের টাকা শোধ করতে পারছেন না, যার ফলে পরিবারগুলো চাপে পড়ছে। এ অবস্থায় ঋণগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।
একটি বিশেষ চক্র গড়ে তুলে ব্যবসা করার অভিযোগে ২০২৪ সালের জুন থেকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই বাজার চালু করা সম্ভব হয়নি। গত বছর ওমান ও বাহরাইনসহ বেশ কিছু বন্ধ শ্রমবাজারও উন্মুক্ত করা যায়নি। এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাজারও এখন পর্যন্ত সেভাবে খোলেনি। তবে শ্রমবাজার বড় করতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও সৌদি আরবের সঙ্গে মোট সাতটি চুক্তি সই হয়েছে। এই চুক্তিগুলো কাজে লাগানো গেলে বিদেশে দক্ষ কর্মী পাঠানো সম্ভব হবে।
বিদেশে কর্মী পাঠানোর ব্যবসায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বায়রা’র সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, শ্রমবাজার মূলত সৌদি আরবকেন্দ্রিক। দেশটির জেদ্দা ও রিয়াদে বিমান চলাচল চালু থাকায় কিছু কর্মী যাচ্ছেন, তবে সেখানেও আগের চেয়ে কর্মী যাওয়া কমেছে। ভিসা নেওয়া নিয়ে কারও কারও মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। যাঁরা এখনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাননি, তাঁরা বিদেশ যাওয়ার ছাড়পত্র নিচ্ছেন না। বর্তমান পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে কোনো চক্রের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার বাজার খোলা ঠিক হবে না।
অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরু জানায়, বর্তমানে রাশিয়া বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন শ্রমবাজার হয়ে উঠছে। গত বছর দেশটিতে গিয়েছেন ৪ হাজার ৬৬৩ জন, যা আগের বছর ছিল মাত্র ৯৯৩ জন। তবে ভালো বেতন ও রাশিয়ার নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কর্মী সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে একটি চক্র। এই চক্রের একাংশ রাশিয়ার অসাধু চক্রের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশি কর্মীদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে পাঠিয়ে দিচ্ছে।
২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭৬ জন বাংলাদেশি সমুদ্রপথে ইতালির উপকূলে পৌঁছেছেন। এই সংখ্যা গত বছর ইতালিতে যাওয়া বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এবং আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এখন নিয়মিতভাবে বিদেশ যাওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে আসায় অনিয়মিত বা অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, অবৈধ পথে অনিয়মিত অভিবাসনের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ইতালি যাওয়ার জন্য অনেকে লিবিয়া বা রাশিয়াভিত্তিক চক্রের ফাঁদে পড়তে পারেন। এ মুহূর্তে কেউ যেন কোনো ধরনের প্রলোভনে পা না দেন, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। যুদ্ধকবলিত দেশগুলোতে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে এখন আরও সক্রিয় হতে হবে এবং প্রতিদিন দেশের কাছে তথ্য পাঠানো উচিত। একই সঙ্গে প্রবাসীদের জরুরি কল্যাণ নিশ্চিত করা দরকার। নতুন শ্রমবাজার তৈরির জন্য এই সময়ে দক্ষ জনবল গড়ে তোলায় সরকারকে আরও জোর দিতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে গত বছরের তুলনায় এই সময়ে কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশ যাত্রা কমেছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি মার্চ মাসের প্রথম ১০ দিনে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বিদেশ যাওয়ার অনুমতি বা ছাড়পত্র নেওয়ার হার প্রায় অর্ধেক কমে গেছে।
বিদেশে কর্মী পাঠানোর সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প বাজার তৈরি করা গেলে এই সংকট হতো না। দীর্ঘ সময় পার হলেও মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বড় কোনো শ্রমবাজার গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে দক্ষ জনবল তৈরি করতে না পারায় ইউরোপ ও জাপানের মতো সম্ভাবনাময় দেশগুলোতে আশানুরূপ কর্মী পাঠানো যাচ্ছে না। এর পাশাপাশি প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে কর্মী পাঠানোর তালিকায় ১৬৮টি দেশের নাম থাকলেও গত বছর বাংলাদেশ থেকে কর্মীরা গিয়েছেন ১৪১টি দেশে। তবে এর মধ্যে ৯০ শতাংশ কর্মীই গিয়েছেন মাত্র ৫টি দেশে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৩টি দেশে মাত্র ১ জন করে এবং ৩৪টি দেশে ২ থেকে ১০ জন করে কর্মী গিয়েছেন। ২০২৫ সালে মোট ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মী বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, যার মধ্যে ৬৭ শতাংশেরই গন্তব্য ছিল সৌদি আরব।
অভিবাসন খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশের শ্রমবাজার কেবল মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে সৌদি আরবনির্ভর হওয়ায় যুদ্ধের প্রভাবে এখন বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিকল্প বাজার না থাকায় কর্মী পাঠানো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়া ও মানবপাচারের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই মুহূর্তে আটকে পড়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো এবং প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। উল্লেখ্য, চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত সৌদি আরবে দুজন এবং বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে একজন করে বাংলাদেশি প্রবাসী প্রাণ হারিয়েছেন।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, যুদ্ধকবলিত প্রবাসীদের সহায়তায় সার্বক্ষণিক জরুরি যোগাযোগ নম্বর ও নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ও আটকে পড়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়াতে ৯ মার্চ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিহত প্রবাসীর মরদেহ দাফন করা হয়েছে এবং বাকিদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।
সরকার এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে উল্লেখ করে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীরা ফিরে এলে তাঁদের পুনর্বাসনে সহায়তা করা হবে। যাঁরা যেতে পারছেন না, তাঁদের ভিসার মেয়াদ বাড়াতে দূতাবাসকে অনুরোধ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে আবেদনের ভিত্তিতে কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ৩১ মার্চ পর্যন্ত ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সরকারের মূল লক্ষ্য হলো নতুন শ্রমবাজার তৈরি করা। এজন্য দক্ষ কর্মী গড়ে তোলায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জাপান ও ইউরোপের মতো সম্ভাবনাময় বাজারগুলো নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গেও আলোচনা চলছে।
ওমান থেকে গত ২১ জানুয়ারি দেশে বেড়াতে এসেছেন কুমিল্লার মোবারক হোসেন। তিনি জানান, মার্চের শুরুতে তাঁর কর্মস্থলে ফেরার কথা ছিল এবং তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকেও যোগাযোগ করা হয়েছে। কিন্তু নিয়মিত বিমান চলাচল না থাকায় তিনি যেতে পারছেন না। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তাঁর আর কিছু করার নেই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে বিমান চলাচল শুরু হলে তিনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে আবার ফিরে যেতে চান।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এরপর যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ১৪টি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মোট ৩৯১টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে গত বুধবারই ২৪টি ফ্লাইট বাতিল হয়। ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা বন্ধ রেখেছে।
একইভাবে দেশে বেড়াতে এসে আটকা পড়েছেন কুমিল্লার ফরহাদ হোসাইন। তিনি ওমানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসির কাজ করেন। ফরহাদ জানান, এই সময়ে সেখানে কাজের অনেক চাপ থাকে। মাত্র ১৫ দিনের ছুটিতে দেশে এলেও এখন তিনি আটকা পড়ে আছেন। ওমান থেকে তাঁর প্রতিষ্ঠান দ্রুত ফেরার জন্য তাগিদ দিলেও বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় তিনি যেতে পারছেন না।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, গত মাসেও বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন ৬৫ হাজার ৬১৩ জন। এর মধ্যে মাসের প্রথম ১০ দিনেই গিয়েছিলেন প্রায় ৩৮ হাজার কর্মী। তবে চলতি মার্চ মাসের ১ থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত বিদেশ যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছেন মাত্র ২১ হাজার ১২২ জন। গত বছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৪৬ হাজার ৭৪৪। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর পর বিদেশ যাওয়ার হার কমে অর্ধেকে নেমেছে। সৌদি আরবে কিছু বিমান চলাচল চালু থাকায় সীমিত সংখ্যক কর্মী যেতে পারছেন, তবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনেকেই এখন ভয়ে যেতে চাইছেন না।
তৃণমূল অভিবাসীদের সংগঠন অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ৪৫ থেকে ৫০ লাখ কর্মী কাজ করছেন। তাঁদের ভবিষ্যৎ কী হবে বা সবার চাকরি থাকবে কি না—সেসব বিষয় নিয়ে এখন থেকেই ভাবতে হবে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। যাঁরা টাকা দিয়েও যেতে পারছেন না, সরকার তাঁদের একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করতে পারে, যাতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তাঁরা যাওয়ার সুযোগ পান।
অভিবাসন খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অনেকেই বিদেশে যেতে ঋণ করেন। এখন যেতে না পারায় তাঁরা ঋণের টাকা শোধ করতে পারছেন না, যার ফলে পরিবারগুলো চাপে পড়ছে। এ অবস্থায় ঋণগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।
একটি বিশেষ চক্র গড়ে তুলে ব্যবসা করার অভিযোগে ২০২৪ সালের জুন থেকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই বাজার চালু করা সম্ভব হয়নি। গত বছর ওমান ও বাহরাইনসহ বেশ কিছু বন্ধ শ্রমবাজারও উন্মুক্ত করা যায়নি। এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাজারও এখন পর্যন্ত সেভাবে খোলেনি। তবে শ্রমবাজার বড় করতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও সৌদি আরবের সঙ্গে মোট সাতটি চুক্তি সই হয়েছে। এই চুক্তিগুলো কাজে লাগানো গেলে বিদেশে দক্ষ কর্মী পাঠানো সম্ভব হবে।
বিদেশে কর্মী পাঠানোর ব্যবসায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বায়রা’র সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, শ্রমবাজার মূলত সৌদি আরবকেন্দ্রিক। দেশটির জেদ্দা ও রিয়াদে বিমান চলাচল চালু থাকায় কিছু কর্মী যাচ্ছেন, তবে সেখানেও আগের চেয়ে কর্মী যাওয়া কমেছে। ভিসা নেওয়া নিয়ে কারও কারও মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। যাঁরা এখনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাননি, তাঁরা বিদেশ যাওয়ার ছাড়পত্র নিচ্ছেন না। বর্তমান পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে কোনো চক্রের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার বাজার খোলা ঠিক হবে না।
অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরু জানায়, বর্তমানে রাশিয়া বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন শ্রমবাজার হয়ে উঠছে। গত বছর দেশটিতে গিয়েছেন ৪ হাজার ৬৬৩ জন, যা আগের বছর ছিল মাত্র ৯৯৩ জন। তবে ভালো বেতন ও রাশিয়ার নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কর্মী সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে একটি চক্র। এই চক্রের একাংশ রাশিয়ার অসাধু চক্রের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশি কর্মীদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে পাঠিয়ে দিচ্ছে।
২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭৬ জন বাংলাদেশি সমুদ্রপথে ইতালির উপকূলে পৌঁছেছেন। এই সংখ্যা গত বছর ইতালিতে যাওয়া বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এবং আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এখন নিয়মিতভাবে বিদেশ যাওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে আসায় অনিয়মিত বা অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, অবৈধ পথে অনিয়মিত অভিবাসনের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ইতালি যাওয়ার জন্য অনেকে লিবিয়া বা রাশিয়াভিত্তিক চক্রের ফাঁদে পড়তে পারেন। এ মুহূর্তে কেউ যেন কোনো ধরনের প্রলোভনে পা না দেন, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। যুদ্ধকবলিত দেশগুলোতে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে এখন আরও সক্রিয় হতে হবে এবং প্রতিদিন দেশের কাছে তথ্য পাঠানো উচিত। একই সঙ্গে প্রবাসীদের জরুরি কল্যাণ নিশ্চিত করা দরকার। নতুন শ্রমবাজার তৈরির জন্য এই সময়ে দক্ষ জনবল গড়ে তোলায় সরকারকে আরও জোর দিতে হবে।
Comments
Comments