ময়মনসিংহে ফুটপাত থেকে বিপণিবিতান, সব জায়গায় কেনাকাটার ধুম
![]() |
| ময়মনসিংহ নগরের বিপণিবিতানগুলোতে কেনাকাটায় দম ফেলার ফুসরত নেই। মঙ্গলবার দুপুরে বারী প্লাজায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
ময়মনসিংহ নগরীর গাঙ্গীনারপাড় এলাকাকে সবচেয়ে ব্যস্ততম এলাকা হিসেবে ধরা হয়। এই এলাকাই ব্যবসা-বাণিজ্যে সমৃদ্ধ। বিপণিবিতান থেকে ফুটপাত—এখানে এলে মানুষ নিজের সামর্থ্যের মধ্যে চাহিদা অনুযায়ী জিনিস কিনে বাড়ি ফিরতে পারেন। তাই ঈদ এলেই এলাকাটিতে পা ফেলার জায়গা থাকে না। রয়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার তীব্র জট। এর মধ্যে দরদাম করে চলছে সমানে বেচাকেনা। মঙ্গলবার দুপুরে গাঙ্গীনারপাড় মোড় এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
দিনের বেলায় বিপণিবিতানগুলোতে ক্রেতা কিছুটা কম থাকলেও মধ্যরাত পর্যন্ত চলে ঈদের কেনাকাটা। শহরের জিলা স্কুল মোড় এলাকা থেকে স্টেশন রোড এবং চরপাড়া মোড় এলাকায় থাকা বিপণিবিতানগুলোতে আলোকসজ্জা করা হয়েছে। কেনাকাটায় শত শত মানুষের ভিড়। মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর যত ঘনিয়ে আসবে, এই ভিড় হয়তো আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
মঙ্গলবার বেলা সোয়া দুইটার দিকে গাঙ্গীনারপাড় মোড় এলাকায় ফুটপাতের দোকানিরা ‘একদাম ১০০, একদাম ২০০, একদাম ৩০০, একদাম ৪০০’ বলে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করছিলেন। ফুটপাতে শিশু থেকে বড়, নারী-পুরুষ—সবার জন্য পোশাক, জুতা, টুপি, প্রসাধন সামগ্রীসহ নানা পণ্য নিয়ে ভ্যানে করে বসে থাকতে দেখা যায় বিক্রেতাদের। নিম্ন আয়ের, মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষই ফুটপাতের মূল ক্রেতা।
ফুটপাতে পাঞ্জাবি দেখছিলেন হোসাইন মো. সোহরাওয়ার্দী। তাঁর বাড়ি জেলার মুক্তাগাছা উপজেলায়। তিনি বলেন, ‘আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের যাঁরা, তাঁদের জন্য ফুটপাত হচ্ছে সেরা জায়গা। আমাদের পক্ষে বড় বিপণিবিতানে বাহারি নকশার পণ্য কেনা কঠিন। তার সঙ্গে বর্তমান সময়ে দ্রব্যমূল্যের যে বাজার, তাতে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য করা কঠিন। সে জন্য আমরা ফুটপাতে কেনাকাটা করছি।’
![]() |
| ময়মনসিংহ নগরের গাঙ্গীনারপাড় মোড় এলাকার ফুটপাতের দোকানগুলোকে কেনাকাটা চলছে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
সদর উপজেলার চরআনন্দিপুর গ্রামের খোরদেশা বেগমের স্বামী মারা গেছেন। নগরের বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে বড় করছেন। বড় ছেলের জন্য ৪০০ টাকায় একটি পাঞ্জাবি কেনেন তিনি। খোরদেশা বেগম বলেন, ‘বড় বাজারে গিয়ে অত দামে পাঞ্জাবি কেনার ক্ষমতা নেই। সন্তানরা আছে, তাদের তো কিনে দিতে হবে। চার সন্তান থাকলেও বড় ছেলে অসুস্থ, তার জন্য একটা পাঞ্জাবি কিনেছি।’
ফুটপাতে শিশুদের জামা বিক্রি করছিলেন মো. সুমন মিয়া। তিনি বলেন, ‘গতবারের চেয়ে এবার বেচাকেনার চাপ বেশি। আগে ১৫-২০টা জামা বিক্রি করলেও এখন দিনে ৩০-৪০টা বিক্রি করছি। মানুষ ১৫০ টাকায় শিশুদের জামা কিনছে। এখানে সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষই বেশি আসে।’
ফুটপাতে যেমন মানুষের উপচে পড়া ভিড়, তেমনি বড় বিপণিবিতানগুলোর চিত্রও একই। নগরের বারী প্লাজা, আসাদ মার্কেট, উত্তরা কেনাকাটা কেন্দ্র ও নূরজাহান কমপ্লেক্স ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি দোকানেই ক্রেতা ঠাসা। এ ছাড়া বিভিন্ন নামী ব্র্যান্ডের দোকান, জুতা ও প্রসাধনীর দোকান—সবখানেই কমবেশি মানুষের ভিড়। অনেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একসঙ্গে বাজারে এসেছেন। সঙ্গে আছে পরিবারের ছোট শিশুরাও। সবাই মিলে যাঁর যাঁর পছন্দের পোশাক কেনার চেষ্টা করছেন। শুধু শহরের মানুষই নন, জেলার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল থেকেও অনেকেই এসেছেন কেনাকাটা করতে।
আসাদ মার্কেটের সামনে কথা হয় ঈশ্বরগঞ্জ থেকে ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে কেনাকাটা করতে আসা রুহুল আমিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এবার সব জিনিসের দাম গতবারের চেয়ে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেশি। মানুষের ভিড় ঠেলে কেনাকাটা শেষে ইফতারের আগে বাড়ি ফিরতে পারছি, এটাই শান্তি।’
![]() |
| ময়মনসিংহ নগরের বিপণিবিতানগুলোতে কেনাকাটায় দম ফেলার ফুসরত নেই। মঙ্গলবার দুপুরে বারী প্লাজায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
বারী প্লাজা বিপণিবিতানের রাজধানী পোশাক ঘরের কর্মী আনন্দ আহমেদ জানান, এবার গারারা, সারারা, ফারসি, আভিয়া ও পাকিস্তানি জামা বেশি বিক্রি হচ্ছে। অনেকে সুতি ও জর্জেট থ্রি-পিসও কিনছেন। বেচাকেনা মোটামুটি হলেও গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম। কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন, মানুষের কাছে হয়তো টাকা নেই। দেশের পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে প্রবাসীরাও ঠিকমতো টাকা পাঠাতে পারছেন না।
নার্সিংয়ের শিক্ষার্থী হুমায়রা ইসলাম তাঁর বান্ধবীকে নিয়ে জামা কিনতে এসে বাজেটের কারণে হিমশিম খাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের সামর্থ্যের তুলনায় জামার দাম কিছুটা বেশি। কাপড়ের মানের তুলনায় দাম খুব বেশি না হলেও আমাদের জন্য কেনাকাটা করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানি জামাগুলো আমাদের নাগালের বাইরে। আমাদের ৫-৬ হাজার টাকার মধ্যে জামা-জুতা সব কিনতে হবে, কিন্তু একটি জামার দামই ৪ হাজার টাকা চাওয়া হচ্ছে।’
বেচাকেনায় সন্তুষ্টির কথা জানিয়ে নিলয় কর্নারের মালিক রাসিন খান বলেন, ‘এবার ছোট-বড় সবাই ফারসি নামের পোশাকের প্রতি বেশি আগ্রহী। পাশাপাশি সারারা, পাকিস্তানি থ্রি-পিস, লেহেঙ্গা ও আনারকলির চাহিদাও রয়েছে। ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে এসব জামা বিক্রি হচ্ছে। শেষের দিকে বেচাকেনা কিছুটা বেড়েছে এবং দামও নাগালে রয়েছে।’
নারী ও শিশুদের দোকানে ভিড় থাকলেও পুরুষদের পোশাকের দোকানগুলোতে ক্রেতার অভাব দেখা গেছে। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, স্ত্রী-সন্তানদের কেনাকাটা শেষ করে পুরুষেরা নিজের জন্য কেনাকাটা শুরু করবেন। এম ফ্যাশনের কর্মী আরমান ইসলাম বলেন, ‘গতবারের তুলনায় এবার আমাদের বেচাকেনা কিছুটা কম, জিনিসের দামও বেড়েছে। এখন শিশু ও নারীদের পোশাক বেশি বিক্রি হচ্ছে। পুরুষেরা সাধারণত স্ত্রী-সন্তানদের কেনাকাটা শেষে নিজেদের কথা ভাবেন, তাই ২০ রোজার পর হয়তো আমাদের বেচাকেনা বাড়বে।’



Comments
Comments