জ্বালানি তেলের সংকটে পাম্পে দীর্ঘ সারি, শিল্পোৎপাদন ব্যাহত
![]() |
| জ্বালানি তেলের জন্য রাজধানীর পাম্পের সামনের সড়কগুলোতে মোটরসাইকেল ও গাড়ির দীর্ঘ লাইন। মোহাম্মদপুর এলাকায়। গতকাল রোববার | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
রাজধানীসহ সারা দেশে জ্বালানি তেলের জন্য ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে গতকাল রোববারও যানবাহনচালকের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। অনেক স্টেশনে সকালে তেল না থাকলেও দুপুরে সরবরাহ আসার পর বিক্রি শুরু হয়। তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও বচসার ঘটনা ঘটছে।
সহজে জ্বালানি না পাওয়ায় বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোও বিপাকে পড়েছে। তারা জানিয়েছে, ডিপো থেকে পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব কারখানায় গ্যাস-সংযোগ নেই, সেখানে বয়লার ও জেনারেটর চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানাতে গতকাল বেশ কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কার্যালয়ে যান। একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জানান, তাঁদের তিন হাজারের বেশি ট্রাক পরিচালনার জন্য প্রতিদিন যে পরিমাণ ডিজেল প্রয়োজন, তার সামান্যই পাচ্ছেন।
এদিকে, গত শনিবার ঝিনাইদহে ফিলিং স্টেশনের কর্মচারীদের পিটুনিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা নীরব আহমেদ (২২) নিহতের ঘটনায় উত্তজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রতিবাদে দুটি ফিলিং স্টেশন ও তিনটি বাসে অগ্নিসংযোগ করা হয়। গতকাল সকাল থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত ঝিনাইদহ-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন বাসশ্রমিকেরা। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জ্বালানি স্থাপনা ও পরিবহনে নিরাপত্তা বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তেল-গ্যাসের সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও আতঙ্কিত মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল সংগ্রহ করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিপিসি গতকাল থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের সরবরাহ ২৫ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। সরকার বলছে, তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও সাশ্রয়ী হতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর মতিঝিলের করিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে গতকাল দুপুরে দেখা যায়, ‘অকটেন ও ডিজেল নেই’ লেখা বোর্ড ঝুলছে। পাম্প মালিক আবদুস সালাম জানান, গত বৃহস্পতিবারের আসা সব তেল বিক্রি হয়ে গেছে। পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির একাংশের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, সরবরাহ ২৫ শতাংশ কমলেও সমস্যা হতো না, কিন্তু মানুষের চাহিদা যেন ২৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। পাম্পগুলোতে পুলিশ মোতায়েন না করলে শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হবে।
জ্বালানি তেলের নিরাপত্তা ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গতকাল রোববার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দুটি পৃথক নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। প্রথম নির্দেশনায় তেল শোধনাগার, ডিপো, ফিলিং স্টেশন ও সংরক্ষণাগারের নিরাপত্তা জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি, অবৈধ মজুতদারি ও কালোবাজারি রোধে নিয়মিত তদারকি করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যাতে অবৈধভাবে তেল কেনাবেচা করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় নির্দেশনায় ডিপো ও রিফাইনারি থেকে তেল পরিবহনকালে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। তেলবাহী যানে নাশকতা, ছিনতাই বা যেকোনো ধরনের বাধা ঠেকাতে এবং পাচার রোধে মহাসড়কগুলোতে তল্লাশি ও নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, অবৈধভাবে তেল মজুতের অভিযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান শুরু হয়েছে। গতকাল কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় তেল মজুতের দায়ে রশিদুল ইসলাম নামের এক ব্যবসায়ীকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। যশোরের চৌগাছা উপজেলায় 'নিজাম স্টোর'-এর মালিক নিজাম উদ্দিনকে প্রায় ৬ হাজার লিটার জ্বালানি তেল অবৈধভাবে মজুত রাখার অপরাধে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, অভিযানের প্রথম দিনেই সারা দেশে কয়েক হাজার টন অবৈধ মজুত উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, অবৈধ মজুত বন্ধ করা গেলেই তেলের সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি আমদানি আরও বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ সোমবার থেকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটি শুরু হচ্ছে। এই ছুটি ঈদের পর প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষাপঞ্জিতে নির্ধারিত ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে শেষ হবে। গতকাল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা এক নির্দেশনায় এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানকে এই সিদ্ধান্ত সব বিশ্ববিদ্যালয়কে অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বাসস জানিয়েছে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখবে।
গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবের কবি কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি জানান, ইতিমধ্যে সমুদ্রে থাকা কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ বাংলাদেশে পৌঁছাতে শুরু করেছে। গতকাল বেলা ১১টার দিকে একটি জাহাজ নোঙর করেছে এবং আরও একটি জাহাজ বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এসব জাহাজ থেকে তেল খালাস শুরু হলে তেলের মজুত আরও বাড়বে।
মন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত সরকারের এখন পর্যন্ত নেই। তাই দাম বাড়ার আশঙ্কায় বা আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল মজুত না করার জন্য তিনি আহ্বান জানান।

Comments
Comments