[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

ঘটনাস্থলে আজও যাচ্ছে উৎসুক মানুষ, পড়ে আছে চুষনি-জুতা, টুকরা কাচ

প্রকাশঃ
অ+ অ-
দুর্ঘটনাস্থলে এখনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে মাইক্রোবাস আরোহীদের ব্যবহার্য বিভিন্ন জিনিস। আজ শুক্রবার সকালে খুলনা-মোংলা মহাসড়কে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন 

পাকা সড়কের ঢালজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য কাচের টুকরো। গাড়ির দুমড়েমুচড়ে যাওয়া খণ্ড খণ্ড অংশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক জোড়া জুতা-স্যান্ডেল। আর এই ধ্বংসস্তূপের মাঝেই পড়ে আছে শিশুদের একটি চুষনি। শুক্রবার সকালে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকার খুলনা-মোংলা মহাসড়কে দেখা যায় এমনই এক মর্মান্তিক দৃশ্য।

বিয়ে শেষে গন্তব্য থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে থাকতে বর-কনেবাহী মাইক্রোবাসটি এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। মুহূর্তেই বিয়ের আনন্দযাত্রা বিষাদে রূপ নেয়। বৃহস্পতিবার বিকেলে নৌবাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ৪টি শিশু রয়েছে, যাদের মধ্যে দুজনের বয়স দুই বছরের কম। নিহত হয়েছেন তাদের মায়েরাও।

হয়তো গাড়িতে শিশুকে শান্ত রাখতে মায়েরা চুষনি মুখে তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ সেই মা কিংবা সন্তান—কেউই আর বেঁচে নেই। দুর্ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা সেই চুষনিটি যেন এই করুণ পরিণতির এক নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

দুর্ঘটনার প্রায় ১৬ ঘণ্টা পর আজ সকালেও ঘটনাস্থলে ভিড় জমান স্থানীয় বাসিন্দা ও উৎসুক জনতা। ধ্বংসাবশেষ দেখে শিউরে উঠছিলেন অনেকে। দুর্ঘটনাস্থলের কাছেই বাসিন্দা রফিকুল ইসলামের বাড়ি। সকালে রাস্তার ওপর ছড়িয়ে থাকা কাচ আর জুতাগুলো দেখে তিনি বলেন, ‘জীবনে এত বড় দুর্ঘটনা দেখিনি। মাঠে গরু রেখে ঘরে ফিরছিলাম, হঠাৎ বিকট শব্দ শুনি। প্রথমে ভেবেছিলাম গরুটা বোধহয় বাসের নিচে পড়ল। পরে এসে দেখি দুই গাড়ির সংঘর্ষ। চারদিকে শুধু রক্ত আর আহত মানুষ। একসঙ্গে এত মানুষকে এভাবে শেষ হতে আগে দেখিনি।’

ঘটনাস্থলে রফিকুল ইসলামের পাশাপাশি স্থানীয় অনেকেই এসে শোক প্রকাশ করছেন। নিজের শিশুসন্তানকে সঙ্গে নিয়ে সকালে সেখানে আসা শান্তি রানী বিশ্বাস বলেন, ‘রাতে খবরে দেখেছি কী ভয়াবহ দুর্ঘটনা হয়েছে, তাই সকালে দেখতে এলাম।’ মহাসড়ক দিয়ে চলাচলকারী অনেক যানবাহনের চালককেও গাড়ি থামিয়ে দুর্ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তবে দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি দুটি রাতেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

কাটাখালী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাফর আহমেদ জানান, পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

গতকাল সন্ধ্যার আগেই নববধূকে নিয়ে মোংলার শেলাবুনিয়া গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর কথা ছিল বরপক্ষের। স্বজন ও প্রতিবেশীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলেন তাঁদের বরণ করতে। আজ সকালে যে বাড়িটি নতুন বউকে ঘিরে হাসি-আড্ডা আর শিশুদের কোলাহলে মুখর থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন কেবলই শোকের মাতম। বাড়ি ও আশপাশে শত শত মানুষ জড়ো হলেও পরিবেশ ভারী হয়ে আছে অনাকাঙ্ক্ষিত বিষাদে।

নিহত ১৪ জনের মধ্যে বরের পরিবারের ৯ জনের মরদেহ নেওয়া হয়েছে মোংলায়, কনের পরিবারের ৪ জনের মরদেহ কয়রায় এবং মাইক্রোবাসচালকের মরদেহ নেওয়া হয়েছে রামপালে। এখন কেবল শেষ বিদায়ের অপেক্ষা।

নিহত বর আহাদুর রহমান ছাব্বির ছিলেন মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবদুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় রাজ্জাকের দুই ছেলে, এক মেয়ে, এক পুত্রবধূ ও চার নাতি প্রাণ হারিয়েছেন। স্বজনদের হারিয়ে বিলাপ করছেন রাজ্জাকের স্ত্রী, জীবিত তিন ছেলে ও অন্য স্বজনেরা।

দুর্ঘটনায় স্ত্রী, এক ছেলে, দুই মেয়ে, দুই ভাই, বাবা ও বোনকে হারিয়েছেন আশরাফুল আলম জনি। শোকে পাথর হয়ে যাওয়া জনি শুধু বললেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমি একা হয়ে গেলাম।’ এর বেশি আর কোনো কথা বলতে পারেননি তিনি।

একসঙ্গে এতগুলো মরদেহ দেখে নির্বাক হয়ে পড়েছেন প্রতিবেশী ও আত্মীয়রা। প্রতিবেশী জাহিদুল ইসলাম জানান, মরদেহগুলোর গোসল সম্পন্ন হয়েছে। জুমার নামাজের পর জানাজা শেষে তাঁদের দাফন করা হবে। 

দুর্ঘটনায় বর-কনেসহ নিহত ১৪
Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন