দক্ষিণাঞ্চলে ডিজেল সংকট, ঘাটে আটকা শত শত মাছ ধরার ট্রলার
![]() |
| ডিজেল সংকটের কারণে সাগরে যেতে পারছে না দক্ষিণাঞ্চলের অসংখ্য ট্রলার। অলস সময়ে জেলেরা জাল মেরামত করে সময় কাটাচ্ছেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে বরগুনার পাথরঘাটার বাদুড়তলার খাল এলাকায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের সমুদ্রগামী মৎস্য খাতে। ডিজেল সংকটের কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে হাজার হাজার ট্রলার মাছ ধরতে সাগরে যেতে পারছে না। এর ফলে কয়েক লাখ জেলে, ট্রলারমালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ী চরম বিপাকে পড়েছেন।
ট্রলারমালিক ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, যুদ্ধের অজুহাতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ডিজেলের দাম বাড়ানোর লক্ষ্যে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। এতে বরগুনা, পাথরঘাটা, পটুয়াখালীর আলীপুর, মহিপুর এবং ভোলার লালমোহন ও মনপুরাসহ বিভিন্ন মৎস্যবন্দরে শত শত ট্রলার আটকা পড়ে আছে। কাজ না থাকায় জেলেরা অলস সময় পার করছেন।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্যবন্দর বরগুনার পাথরঘাটায় ৩০০-এর বেশি ট্রলার ডিজেল না পেয়ে সাগরে যেতে পারছে না। গত পাঁচ দিন ধরে অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে বন্দরে ব্যবসায়িক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ঈদের আগমুহূর্তে এমন পরিস্থিতিতে মৎস্যজীবী পরিবারগুলোর মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে। বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী ও শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক দুলাল হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাসুম আকন জানান, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার খবরে ব্যবসায়ীরা তেল মজুত করে গোপনে চড়া দামে বিক্রি করছেন। পাথরঘাটার মৎস্য ব্যবসায়ী জাকির বিশ্বাস জানান, দোকানে ডিজেল নেই বলা হলেও লিটারে ২০ টাকা বেশি দিলে গোপনে তেল পাওয়া যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে তিনি পিরোজপুরের তুষখালী থেকে তেল সংগ্রহ করেছেন।
বিএফডিসি ঘাটের এক মাঝি জানান, তিন দিন ধরে তেলের অপেক্ষায় ঘাটে বসে থাকলেও ব্যবসায়ীরা তেল দিচ্ছেন না, অথচ গোপনে বাড়তি দামে দু-একটি ট্রলারকে তেল দেওয়া হচ্ছে।
মৎস্যজীবী নেতা গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, দোকানে পর্যাপ্ত তেল থাকলেও বেশি লাভের আশায় তা আটকে রাখা হয়েছে। প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ছাড়া এই পরিস্থিতির সমাধান সম্ভব নয়। মাছেরখাল এলাকার জেলে জাফর হাওলাদার আক্ষেপ করে বলেন, সামনে ঈদ, পরিবারের সবাই নতুন কাপড় আর ভালো খাবারের আশায় আছে। কিন্তু এখন যে অবস্থা, তাতে ঈদের আনন্দ তো দূরে থাক, দুমুঠো ভাত জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
পাথরঘাটার জ্বালানি তেল ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ গাজী জানান, সেখানে মাত্র দুজন সরকারি ডিলার থাকলেও অন্তত ৮ থেকে ১০ জন ব্যবসায়ী অবৈধভাবে খুলনা ও বরিশাল থেকে তেল এনে ব্যবসা করছেন। লাইসেন্সবিহীন এসব ব্যবসায়ী নিজেদের ইচ্ছামতো তেল বাজারে ছাড়া বা বন্ধ রাখা নিয়ন্ত্রণ করেন, যার ফলে বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে এবং সরকারি ডিলাররা চাপে পড়ছেন।
একই কথা স্বীকার করে 'ফারুক ব্রাদার্স'-এর মালিক ফারুক হাওলাদার বলেন, বর্তমানে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ডিপো থেকে কোটা মেনে তেল দেওয়া হচ্ছে। পাথরঘাটায় প্রতি সপ্তাহে তেলের চাহিদা যেখানে দুই থেকে আড়াই লাখ লিটার, সেখানে এখন পাঁচটি ফিলিং স্টেশনে আসছে মাত্র পাঁচ হাজার লিটার। ফলে বড় ট্রলারগুলোতে তেল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে যাদের লাইসেন্স নেই, তারাই মূলত বাজার অস্থির করে রেখেছে।
ডিজেলের এই সংকট শুধু বরগুনা বা পাথরঘাটায় নয়, পটুয়াখালীর মহিপুর, আলীপুর এবং ভোলার লালমোহন ও মনপুরাসহ পুরো দক্ষিণাঞ্চলেই দেখা দিয়েছে। এর ফলে সমুদ্রগামী ট্রলারগুলো সাগরে যেতে পারছে না।
মহিপুরের ট্রলারমালিক মজনু গাজী জানান, দোকানগুলোতে ডিজেল মজুত থাকলেও বেশি দামের আশায় ব্যবসায়ীরা তা বিক্রি করছেন না। তাঁরা সর্বোচ্চ ২০০ লিটার পর্যন্ত তেল দিতে চান, যা দিয়ে সাগরে যাওয়া অসম্ভব। কারণ একেকটি ট্রলারে দুই থেকে আড়াই হাজার লিটার তেলের প্রয়োজন হয়। ফলে জেলেরা ঘাটে অলস সময় কাটাচ্ছেন এবং ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ভোলার মনপুরার ট্রলারমালিক নাসির উদ্দিনও একই অভিযোগ করে বলেন, এক সপ্তাহ ধরে এই সংকটে তাঁদের ব্যবসা স্থবির হয়ে পড়েছে।
বরগুনার জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার এ বিষয়ে বলেন, কোনো অসাধু ব্যবসায়ী যদি তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন, তবে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Comments
Comments