জ্বালানি তেলের লাগামহীন চাহিদা, নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম কর্তৃপক্ষ
![]() |
| জ্বালানি তেলের জন্য যানবাহনের সারি | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
জ্বালানি তেলের চাহিদা খুবই বেশি, কিন্তু তা কোনোভাবেই পূরণ করা যাচ্ছে না। দুই সপ্তাহ ধরে ঢাকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির লম্বা লাইন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা কমার পরিবর্তে বজায় আছে। রেশনিং ব্যবস্থা তুলে নেওয়ার পর ডিপো থেকে স্বাভাবিক বরাদ্দের চেয়ে তেল সরবরাহ বেড়েছে, তবে ফিলিং স্টেশনগুলোয় তেল পাওয়া যাচ্ছে না। স্টেশনে যত তেল পৌঁছায়, তা গ্রাহকেরা দ্রুতই নিয়ে নিচ্ছেন।
জ্বালানি তেল আমদানি ও বিক্রির দায়িত্বে আছে সরকারি সংস্থা পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বিপিসির হয়ে ডিলার ও ফিলিং স্টেশনে তেল সরবরাহের কাজ পরিচালনা করে তিনটি সরকারি তেল কোম্পানি—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা। দেশের বিভিন্ন স্থানে এই তিন কোম্পানির ডিপো রয়েছে। এসব ডিপো থেকে তেল সংগ্রহ করে প্রায় আড়াই হাজার ফিলিং স্টেশন।
বিপিসি গত রোববার একটি অফিস আদেশ জারি করেছে, যা ১৫ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত দৈনিক তেল বিক্রির সীমা নির্ধারণ করেছে। আদেশে বলা হয়েছে, ১৬ থেকে ১৮ মার্চ সময়ে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ডিজেল ১০ শতাংশ এবং পেট্রল ও অকটেন ১৫ শতাংশ বেশি সরবরাহ করা যাবে। এই সময় দৈনিক বরাদ্দ হবে—ডিজেল ১৪ হাজার ৫৫ টন, পেট্রল ১ হাজার ৭২০ টন এবং অকটেন ১ হাজার ৩৭২ টন।
১৯ থেকে ২২ মার্চ পর্যন্ত ন্যূনতম প্রয়োজন অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হবে। তবে পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন ও পরদিন ডিপো বন্ধ থাকবে। ২৩ থেকে ২৫ মার্চ তেল সরবরাহ করা হবে গত বছরের চাহিদা অনুযায়ী। এই সময় দৈনিক বরাদ্দ হবে—ডিজেল ১২ হাজার ৭৭৭ টন, পেট্রল ১ হাজার ৪৯৬ টন এবং অকটেন ১ হাজার ১৯৩ টন।
বিপিসি সূত্র জানাচ্ছে, বিপিসি সরবরাহ করা জ্বালানি তেলের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশই ডিজেল। এটি মূলত কৃষি, শিল্প কারখানা এবং গণপরিবহনে ব্যবহার হয়। দিনে এর চাহিদা গড়ে ১২ হাজার টন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আতঙ্কে তেল বিক্রি বেড়ে যায়। ১ থেকে ৪ মার্চের মধ্যে দিনে গড়ে প্রায় ২৫ হাজার টন ডিজেল বিক্রি হয়। এর ফলে সরকার বাধ্য হয়ে ২৫ শতাংশ সরবরাহ কমিয়ে ৯ হাজার টনে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেন। পরে রোববার এই রেশনিং প্রত্যাহার করা হয়। সেদিন ডিজেল বিক্রি হয় ১৬ হাজার ১৬৪ টন, এবং পরদিন বিক্রি হয় ১৭ হাজার ৫৯৮ টন।
ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলে ব্যবহৃত হয় অকটেন ও পেট্রল। রোববার অকটেন বিক্রি হয় ১ হাজার ৬৯৮ টন, আর গতকাল বিক্রি হয় ২ হাজার ৩৪৯ টন। পেট্রল বিক্রি হয় রোববার ১ হাজার ৭১২ টন এবং গতকাল ২ হাজার ৩১৬ টন।
অতিরিক্ত চাহিদা মেটাতে তেলের মজুত ধরে রাখার বিষয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। দ্রুত আমদানি করতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) তেল কিনতে সরকারের সিদ্ধান্ত রয়েছে। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থির। প্রতিদিন পরিশোধিত জ্বালানির দাম বেড়ে চলেছে। তার চেয়েও বেশি হারে বেড়েছে জাহাজ ভাড়া ও বিমা খরচ। এজন্য সরবরাহ পেতে বিলম্ব হচ্ছে।
তেল কোম্পানি ও ফিলিং স্টেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, স্বাভাবিক চাহিদার পরিস্থিতি এখন নেই। কয়েকদিন টানা রেশনিং থাকায় অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়েছে। রোববার বেশি তেল পাওয়ায়ও চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়নি। সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হলে ভোগান্তি আরও বাড়বে। ঢাকার বাইরে ফিলিং স্টেশনের বাইরে কিছু ডিস্ট্রিবিউটর ডিজেল পাননি। এতে সেচের জন্যও কৃষকরা ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নিচ্ছেন।
ফিলিং স্টেশনের মালিকদের সংগঠন পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম বলেন, চাহিদা অনুসারে তেল পাচ্ছে ফিলিং স্টেশন। তবে কোনো স্টেশনে বেশি দেওয়ার পর দিনের সীমা মেনে অন্য স্টেশনকে তেল দেওয়া হচ্ছে না। বাজারে অস্বাভাবিক চাহিদা থাকায় তেল মুহূর্তের মধ্যে চলে যাচ্ছে ভোক্তাদের কাছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারি। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর বৈশ্বিকভাবে তেলের সরবরাহ কমায় দেশে সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়। আতঙ্কের কেনাকাটাকে কমাতে সরকার ৬ মার্চ থেকে তেল সরবরাহে সীমা বেঁধে দেয়, যা রোববার সকালে তুলে নেওয়া হয়।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ম. তামিম বলেন, রেশনিং তুলে নেওয়ার পরও মানুষের আস্থা বাড়েনি। অনেকে এখনো ভীত হয়ে তেল কিনছে। তিনি মনে করান, জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য দেশে দেশে ছুটি বাড়ানো হচ্ছে। বাংলাদেশেও এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। তেলের আমদানি বাড়ানো প্রয়োজন, সঙ্গে ব্যবহারও কমাতে হবে।
পবিত্র ঈদুল ফিতরের সাত দিনের সরকারি ছুটি শুরু হয়েছে। রাজধানীর আসাদ গেট, বিজয় সরণি, পরীবাগ, মতিঝিল, রাজারবাগ ও মগবাজারের ১০টি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, ছুটির প্রথম দিনেও এখানে তেলের জন্য গাড়ির দীর্ঘ সারি লেগে আছে। কোথাও আগের নিয়ম অনুযায়ী রেশনিং চলছে, আবার কোথাও তেল শেষ হওয়ায় বিক্রি বন্ধ রয়েছে।
রাজারবাগ ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা ও প্রাইভেট কারে ৫০০ টাকার বেশি অকটেন দেওয়া হচ্ছে না। কর্মচারী মো. ইমন জানান, ‘ডিপো থেকে এই বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে, আমাদের কিছু করার নেই।’
মতিঝিলের করিম অ্যান্ড সন্স পাম্পে ২০–২৫ মিনিটের অপেক্ষার পর গ্রাহক চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন। মতিঝিলের পূবালী ফিলিং স্টেশনেও একই অবস্থা। তবে দৈনিক বাংলা মোড়ের নাভানা পাম্পে বেলা একটায় তেল সরবরাহ বন্ধ ছিল। এখানে অনেক মোটরসাইকেলচালক ও প্রাইভেট কার গাড়ি তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছিল।
পাম্পের কর্মচারী খোকন শেখ জানান, সকাল থেকে গাড়ির চাপ বেশি ছিল, তাই দুপুরের দিকে তেল শেষ হয়ে গেছে।

Comments
Comments