বেশি দামে জ্বালানি আমদানি, লক্ষ্য সংকট মোকাবিলা
![]() |
| এলএনজি গ্যাস | প্রতীকী ছবি |
যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট এড়াতে নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। এরই মধ্যে খোলাবাজার থেকে বেশি দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দুটি জাহাজ (কার্গো) কেনা হয়েছে। ব্যবসায়ীরাও বেশি দামে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি করছেন। একই সঙ্গে জ্বালানি সাশ্রয়ে মন্ত্রিসভা ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় কয়েক দফা নির্দেশনা দিয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্র বলছে, জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ফুরিয়ে যায়নি। যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় সরবরাহ ১০ শতাংশ কমানো হয়েছে। অনেকে ডিজেল কিনে মজুত করছেন। সংকটের আশঙ্কায় মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছে। তেল বিক্রয় কেন্দ্রগুলো (পেট্রোল পাম্প) তেল মজুত করে রাখতে পারে। কৃত্রিম সংকট তৈরি ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানায়, গত চার দিনে প্রায় ৯৮ হাজার টন ডিজেল বিক্রি হয়েছে। গত বছর একই সময়ে বিক্রি হয়েছিল ৫৫ হাজার টন। বর্তমানে ১ লাখ ৮১ হাজার টন ডিজেল মজুত আছে। তবে কিছুটা দেরি হলেও ডিজেলবাহী কয়েকটি জাহাজ আগামী সপ্তাহে এসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্র বলছে, জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ফুরিয়ে যায়নি। যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় ১০ শতাংশ সরবরাহ কমানো হয়েছে। অনেকে ডিজেল কিনে মজুত করছে। সংকটের শঙ্কায় মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছে। পেট্রল স্টেশনগুলো তেল মজুত করে রাখতে পারে। কৃত্রিম সংকট তৈরি ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
গত চার দিনে পেট্রল বিক্রি হয়েছে ৯ হাজার ৩৮০ টন, গত বছর একই সময়ে বিক্রি হয়েছিল ৬ হাজার ৪৮০ টন। অকটেন বিক্রি হয়েছে প্রায় ৮ হাজার টন, গত বছর যা ছিল ৫ হাজার ২৪৭ টন। অবশ্য পেট্রল ও অকটেনের মজুত নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই, কারণ এগুলো দেশেও উৎপাদন হয়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বৃহস্পতিবার জানান, দেশে এখন জ্বালানির সংকট নেই। বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আগাম সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। সরবরাহ কিছুটা কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাড়তি দামে হলেও বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি কেনা হচ্ছে। তিনি সবাইকে সাশ্রয়ী হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। বেসরকারি খাতকেও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানিতে সহায়তা করা হচ্ছে।
গ্যাস–সংকটের দুশ্চিন্তা থেকে সরবরাহ দিনে ২০ কোটি ঘনফুট কমানো হয়েছে। তবে গত বুধবার খোলাবাজার থেকে দুই কার্গো এলএনজি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সিঙ্গাপুরের ভিটল এশিয়া প্রতি ইউনিট সাড়ে ২৪ ডলার করে নিচ্ছে, যা ২০ মার্চ সরবরাহ করার কথা। আর গানভর দেবে প্রতি ইউনিট ২৮ ডলার করে, তাদের কার্গো ১৭ মার্চ আসার কথা রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে এটি কেনা হচ্ছিল ১০ ডলার করে।
বাংলাদেশ তৈল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র জানায়, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম প্রতিদিন বাড়ছে। চীন, জাপান ও ইউরোপের দেশগুলো জ্বালানি কিনতে প্রতিযোগিতা করছে। এর মধ্যেই কাতার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ১৫ ও ১৮ মার্চ কাতার থেকে দুটি জাহাজ (কার্গো) দেশে আসার কথা থাকলেও সেগুলো আসবে না। কারণ, কাতার এলএনজি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে।
গ্যাস সংকটের দুশ্চিন্তা থেকে সরবরাহ দিনে ২০ কোটি ঘনফুট কমানো হয়েছে। তবে গত বুধবার খোলাবাজার থেকে দুই জাহাজ এলএনজি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সিঙ্গাপুরের ভিটল এশিয়া প্রতি ইউনিট সাড়ে ২৪ ডলার করে নিচ্ছে, যা ২০ মার্চ সরবরাহ করার কথা। আর গানভর কোম্পানি দেবে প্রতি ইউনিট ২৮ ডলার করে, তাদের জাহাজটি ১৭ মার্চ আসার কথা রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে এটি কেনা হচ্ছিল ১০ ডলার করে। এতে করে এই মাসে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যাবে বলে মনে করছে পেট্রোবাংলা।
বাজারে আবারও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর আগে গত ডিসেম্বরে সরবরাহ কমে যাওয়ায় জানুয়ারিতে ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছিল। রান্নার কাজে ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজির সিলিন্ডার এক হাজার টাকা বেশি দামে বিক্রি হয়। এরপর বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে বাড়তি এলপিজি আমদানির অনুমতি দেয় সরকার। এতে বাজারে সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসে। এখন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এলপিজি আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩৪১ টাকা।
বৃহস্পতিবার এলপিজি আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী। বৈঠকে ব্যবসায়ীরা তাঁদের সমস্যার কথা জানালে তা সমাধানের আশ্বাস দেন মন্ত্রী।
ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, বাজারে যাতে এলপিজির সংকট তৈরি না হয়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে যাতে বিক্রি করা না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি করা যে এলপিজি রয়েছে, তাতে মার্চ পর্যন্ত সংকটের কোনো শঙ্কা নেই। আমাদের চিন্তা এপ্রিল থেকে। এরই মধ্যে আমাদের প্রতিষ্ঠান ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, চীনসহ বিকল্প উৎস থেকে আমদানির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল
কয়েকজন এলপিজি ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যুদ্ধের কারণে একটি কোম্পানির ১০ হাজার টন এলপিজি আটকে গেছে। এর মধ্যেও সবচেয়ে বেশি এলপিজি আনছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ‘ফ্রেশ’ ব্র্যান্ডের এলপিজি কোম্পানি। এই মাসে তারা ৩৫ হাজার টন এলপিজি আমদানি করছে। বিশ্ববাজারে এলপিজির দাম না বাড়লেও জাহাজভাড়া অনেক বেড়ে গেছে। এই মাসে তাদের প্রতি টন এলপিজি আনতে পরিবহন খরচ হচ্ছে ২৭৫ ডলার। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এলপিজির পরিবহন ভাড়া ১২০ ডলার ধরে মার্চের জন্য দাম নির্ধারণ করেছে। এই মাসে চাহিদা মেটানোর মতো এলপিজি আসবে। তবে এপ্রিলের জন্য এলপিজি কিনতে সমস্যা হচ্ছে। তাই এপ্রিলের মজুত ঠিক রাখার কথা ভেবে কেউ কেউ এই মাসে সরবরাহ কমিয়ে দিতে পারে। এমনটি হলে বাজারে সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল জানান, ‘বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি করা যে এলপিজি রয়েছে, তাতে মার্চ পর্যন্ত সংকটের কোনো ভয় নেই। আমাদের দুশ্চিন্তা এপ্রিল নিয়ে। এরই মধ্যে আমাদের প্রতিষ্ঠান ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া ও চীনসহ বিকল্প উৎস থেকে আমদানির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এপ্রিলের আগেই যাতে এসব দেশ থেকে জ্বালানি আনা যায়, সেই উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। দেশে যাতে এলপিজির সংকট না হয়, সে জন্য দাম বেশি পড়লেও বিকল্প উৎস থেকে আমরা আমদানি চালু রাখব।’
এলপিজি সরবরাহে বিপিসির তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি নেই। তাই হঠাৎ করে আমদানি করা অসম্ভব। এতে সময় লাগবে। তবে মার্চে এলপিজি চাহিদার ঘাটতি হবে না। যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এপ্রিলের জন্য বেসরকারি খাতে আমদানি নিশ্চিত করার কাজ চলছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম
এদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এলপিজি আমদানি করে ব্যবসায়ীদের সরবরাহ করার কথা। এরই মধ্যে কয়েকটি কোম্পানি তাদের কাছে আগ্রহ দেখিয়েছে। প্রতি টন জাহাজ ভাড়া ১৫০ ডলারে এলপিজি সরবরাহের কথা বলেছিল তারা। যদিও বিপিসির সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে পাওয়া প্রস্তাবগুলো এখন যাচাই করছে বিপিসি।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, এলপিজি সরবরাহে বিপিসির তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি নেই। তাই হঠাৎ করে আমদানি করা সম্ভব নয়, এতে সময় লাগবে। তবে মার্চে এলপিজি চাহিদার ঘাটতি হবে না। যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এপ্রিলের জন্য বেসরকারি খাতে আমদানি নিশ্চিত করার কাজ চলছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার কারণে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিন খাতে জ্বালানি সাশ্রয়ের নির্দেশনা দিয়ে বৃহস্পতিবার বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। গ্যাস খাতের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, রান্না ও অন্যান্য কাজে গ্যাসের সর্বোচ্চ সাশ্রয়ী পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। গ্যাসচালিত যন্ত্রপাতির অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। গ্যাসের পাইপলাইন ও চুলা (বার্নার) নিয়মিত পরীক্ষা করে অপচয় রোধ করা দরকার। অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
জ্বালানি তেল সাশ্রয়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত যানবাহনের পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার এবং সম্ভব হলে কয়েকজন মিলে এক যানবাহন ব্যবহারের (শেয়ারিং) ব্যবস্থায় উৎসাহ দিতে হবে। জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমাতে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত যতটা সম্ভব সীমিত বা বন্ধ করতে হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক খাতের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সব সরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে অফিস চলাকালীন এবং অফিসের পর জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নিতে হবে এবং অতিরিক্ত জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে গাড়ির ব্যবহার সীমিত করা, আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের (এয়ারকন্ডিশনার) তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে রাখাসহ ১১ দফা নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা ও করপোরেশনসহ সব অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

Comments
Comments