[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

এক বছর ধরে টেকনাফ স্থলবন্দর অচল, হাজার কোটি টাকার পণ্য আটকে

প্রকাশঃ
অ+ অ-
মিয়ানমারের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকার অচল টেকনাফ স্থলবন্দর। গত বুধবার দুপুরে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তার সংকটে এক বছর ধরে টেকনাফ স্থলবন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এতে দেড় শতাধিক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার পণ্য মিয়ানমারে আটকে আছে। অন্যদিকে, বাণিজ্য বন্ধ থাকায় সরকার প্রতি মাসে প্রায় ১২০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।

বন্দরকে কেন্দ্র করে ব্যবসা করা প্রায় ৪০০ আমদানি-রপ্তানিকারক এবং সংশ্লিষ্ট প্রায় ৩০ হাজার মানুষের জীবিকা এখন চরম সংকটে।

গত বুধবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, দেশের দক্ষিণের এই একমাত্র স্থলবন্দরটি প্রায় জনশূন্য। বন্দরে কোনো পণ্য নেই, নেই শ্রমিকদের ব্যস্ততা কিংবা ট্রাকের দীর্ঘ সারি। নাফ নদীর তীরের জেটিতেও কোনো পণ্যবাহী ট্রলার বা জাহাজ দেখা যায়নি। বন্দরের বাইরের সড়কের অধিকাংশ দোকানপাটও বন্ধ হয়ে গেছে।

অথচ একসময় কাঠের ট্রলার ও ছোট জাহাজে করে বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদী পাড়ি দিয়ে মিয়ানমার থেকে কাঠ, হিমায়িত মাছ, পেঁয়াজ, আদা, মরিচ ও সুপারিসহ নানা পণ্য আসত এই বন্দরে। প্রতিদিন জেটিতে ৩০ থেকে ৪০টি পণ্যবাহী জাহাজ ভিড়ত। সেসব পণ্য শত শত ট্রাকে করে চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হতো। প্রায় দুই হাজার শ্রমিকের কর্মব্যস্ততায় সব সময় মুখর থাকত পুরো বন্দর এলাকা।

বন্দর-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, মিয়ানমার থেকে পণ্য নিয়ে কোনো ট্রলার বা জাহাজ নাফ নদীতে ঢুকলে আরাকান আর্মি গুলি চালায় অথবা জাহাজ আটকে রাখে। এমন পরিস্থিতিতে গত বছরের ৩ মার্চ থেকে টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় এক বছর পার হয়ে গেলেও বাণিজ্য আর শুরু করা যায়নি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বন্দরের গুদামগুলো এখন তালাবদ্ধ। দু-একজন শ্রমিককে আশপাশে দেখা গেলেও তাদের কোনো কাজ নেই।

শ্রমিক নুর কামাল বলেন, আগে প্রতিদিন মাল খালাস করে প্রায় ৭০০ টাকা আয় হতো। সেই আয়েই পাঁচ সদস্যের সংসার চলত। এক বছর ধরে কাজ না থাকায় দুই ছেলের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে।

শ্রমিকদের দলপতি শামসুল আলম জানান, বন্দরে আগে দুই হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করতেন, যাদের ৯৫ শতাংশই এখন বেকার। রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ এখনো আরাকান আর্মির হাতে থাকায় বাণিজ্য কবে নাগাদ চালু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।

টেকনাফ স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এহতেশামুল হক বাহাদুর বলেন, দীর্ঘদিন বাণিজ্য বন্ধ থাকায় প্রায় ১৫০ ব্যবসায়ী চরম বিপাকে পড়েছেন। তাঁদের প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার পণ্য মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন ও সিত্তে বন্দরে আটকে আছে।

ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি মো. ওমর ফারুক জানান, আটকে থাকা পণ্যের মধ্যে কাঠ, সুপারি, বরই, তেঁতুল, হিমায়িত মাছ ও শুঁটকি রয়েছে। দীর্ঘদিন গুদামে পড়ে থাকায় শত কোটি টাকার পেঁয়াজ ও আদা ইতিমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে।

শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৩ মার্চ মিয়ানমার থেকে টেকনাফ স্থলবন্দরে ৬৭৫ দশমিক ৪৩ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি করা হয়েছিল। সেই সময় সরকার রাজস্ব পেয়েছিল প্রায় ৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ৩ হাজার ৪৫৫ মেট্রিক টন আলু, বিস্কুট, পানীয় ও প্লাস্টিক পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করা হয়।

শুল্ক বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, বাণিজ্য বন্ধ থাকায় সরকার প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। গত এক বছরে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকায়।

স্থলবন্দর পরিচালনাকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট লিমিটেড টেকনাফের মহাব্যবস্থাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এক বছর ধরে বাণিজ্য বন্ধ থাকায় তাঁদেরও মাসে ৩০ লাখ টাকা করে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও সীমান্তে চোরাচালান থেমে নেই। সীমান্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি এবং কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার অন্তত ৩৩টি পয়েন্ট দিয়ে নিয়মিত পণ্য পাচার হচ্ছে।

বাংলাদেশ থেকে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, সার, জ্বালানি, সিমেন্ট ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য মিয়ানমারে যাচ্ছে। বিনিময়ে মিয়ানমার থেকে আসছে ইয়াবা, বরফ-মাদক (আইস) ও অস্ত্রের চালান। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেল পাচারও বেড়েছে বলে সীমান্ত সূত্রে জানা গেছে।

বিজিবি ও কোস্টগার্ড জানায়, গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত দেড় মাসে নাফ নদী ও সীমান্ত এলাকায় প্রায় ৪৫টি অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে ৩০০ কোটি টাকারও বেশি মাদক ও চোরাই পণ্য জব্দ করা হয়েছে।

টেকনাফ ২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফট্যানেন্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান বলেন, সীমান্তে চোরাচালান, মাদক ও অস্ত্র পাচার ঠেকাতে বিজিবি দিনরাত কাজ করছে। ড্রোন, তাপ সংবেদনশীল ক্যামেরা, রাডার, আধুনিক নৌযান ও প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহার করে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। 

সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে মাদক চোরাচালান বন্ধ এবং টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে পুনরায় বাণিজ্য চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতির কারণে এত দিন বাণিজ্য বন্ধ ছিল। এখন এটি পুনরায় চালুর বিষয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবদুস শুক্কুর বলেন, সীমান্ত চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে দ্রুত টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে বাণিজ্য শুরু করা প্রয়োজন। এ জন্য মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গেও সমন্বয় করা জরুরি।

দুই দেশের সীমান্ত চোরাচালান বন্ধ করতে ১৯৯৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সীমান্ত বাণিজ্য চালু হয়েছিল। শুরুর কয়েক বছর চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও পরবর্তী সময়ে তা গতি হারিয়ে ফেলে।

এ প্রসঙ্গে কক্সবাজার-৪ আসনের (উখিয়া-টেকনাফ) সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, সীমান্ত চোরাচালান বন্ধ করতে তৎকালীন বিএনপি সরকার টেকনাফ স্থলবন্দর চালু করেছিল। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থলবন্দর অচল করতে চোরাইপথে মাদকসহ বিভিন্ন মালামাল আনা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও বন্দরের কার্যক্রম সীমিত করায় চোরাচালান কয়েক গুণ বেড়েছে। বিশেষ করে মাদকের বড় বড় চালান এনে দেশের যুবসমাজকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। চোরাচালান বন্ধ করতে অচল হয়ে পড়া সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালুর চেষ্টা চলছে। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন