মেট্রোরেলের নেতৃত্বে বদল: নেপথ্যে কী বার্তা দিচ্ছে সরকার?
![]() |
| মেট্রোরেল | ফাইল ছবি |
মেট্রোরেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) পদ থেকে ফারুক আহমেদকে সরিয়ে দিয়েছে সরকার। বিভিন্ন দেশে মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ফারুক আহমেদকে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ডিএমটিসিএলের প্রধান পদে তিনিই ছিলেন প্রথম বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি। এর আগে এই পদে শুধু সরকারি কর্মকর্তারাই দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনছে বর্তমান সরকার। তবে কিছু ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তার মধ্যে একটি হলো ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ। গত সোমবার ফারুক আহমেদকে এই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁকে এমন এক সময়ে বাদ দেওয়া হলো, যখন তিনি মেট্রোরেল প্রকল্পের খরচ কমানোর লক্ষ্যে ঋণদাতা সংস্থা, ঠিকাদার ও পরামর্শকদের ওপর চাপ তৈরি করছিলেন।
মেট্রোরেল বাংলাদেশে প্রথম। এ জন্যই আমলাতন্ত্রের বাইরে গিয়ে বাস্তব কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন একজনকে এমডি নিয়োগ দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এর ফলও পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু এর মধ্যে নিয়োগ বাতিল পুরোনো ধারায় ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও বড় প্রকল্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সামছুল হক
ফারুক আহমেদ গত বছর ফেব্রুয়ারিতে তিন বছরের জন্য নিয়োগ পেয়েছিলেন। এক বছর পর ফারুক আহমেদের নিয়োগ বাতিল করে সরকার। ডিএমটিসিএলের এমডি পদে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আনিসুর রহমানকে মঙ্গলবার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ নিয়োগের মাধ্যমে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে ডিএমটিসিএলের মতো একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান আবারও আমলাদের দিয়ে পরিচালনা করা হবে।
মেট্রোরেল স্থাপনা তৈরি ও মেট্রোরেল পরিচালনার উদ্দেশ্যে ২০১৩ সালে কোম্পানি হিসেবে ডিএমটিসিএল প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরু থেকেই ডিএমসিটিএলের প্রধান পদে আমলাদের বসাতে শুরু করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ফারুক আহমেদের আগে ভারপ্রাপ্ত এমডি ছিলেন অতিরিক্ত সচিব আবদুর রউফ এবং প্রায় আট বছর দায়িত্ব পালন করেন সাবেক সচিব এম এ এন সিদ্দিক। যদিও ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরুর সময় জাপানি পরামর্শকেরা সুপারিশ করেছিলেন কমপক্ষে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা ও কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন পেশাদারকে এমডি নিয়োগ করা উচিত, কিন্তু বাস্তবে সেই সুপারিশ দীর্ঘদিন উপেক্ষিত ছিল।
মেট্রোরেলের মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশে রেললাইন, বৈদ্যুতিক ও সংকেতব্যবস্থা স্থাপনসহ অন্যান্য কাজে ঠিকাদার নিয়োগ দর-কষাকষি করে ফারুক আহমেদ ব্যয় ৪৬৫ কোটি টাকায় নামাতে সমর্থ হন। সাশ্রয় হয় ১৬৯ কোটি টাকা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, অন্তর্বর্তী সরকার ডিএমটিসিএলে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এমডি নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছিল। ওই সময় দেশ-বিদেশ থেকে মোট ৭৬ জন প্রার্থী আবেদন করেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপাচার্যের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল যাচাই-বাছাই শেষে ফারুক আহমেদকে এই পদের জন্য নির্বাচিত করে।
ডিএমটিসিএলের এমডি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে ফারুক আহমেদ দীর্ঘ ৩৭ বছর বিভিন্ন দেশে বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে ২৫ বছরই তিনি কাজ করেছেন মেট্রোরেল ও পরিবহন অবকাঠামো খাতে। তাঁর অস্ট্রেলিয়া, ভারত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও হংকংয়ের মতো দেশগুলোতে কাজের ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে।
গণ-অভ্যুত্থানের সময় মেট্রোরেলের মিরপুর-১০ ও কাজীপাড়া স্টেশন দুটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার জানিয়েছিল, এই দুটি স্টেশন চালু করতে এক বছর সময় এবং প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা খরচ হতে পারে।
তবে অন্তর্বর্তী সরকার এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার আগেই ফারুক আহমেদের পরামর্শ নেয়। তাঁর পরামর্শে অন্য স্টেশন থেকে কিছু সরঞ্জাম এনে এবং স্থানীয়ভাবে কিছু পণ্য কিনে মাত্র তিন মাসে এবং দুই কোটি টাকারও কম খরচে স্টেশন দুটি চালু করা সম্ভব হয়। এছাড়া মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশে বিভিন্ন কাজে দর-কষাকষির মাধ্যমে তিনি ৪৬৫ কোটি টাকায় কাজ সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করেন, যা আগের তুলনায় ১৬৯ কোটি টাকা সাশ্রয় করেছে।
ফারুক আহমেদের নেতৃত্বাধীন ডিএমটিসিএল উত্তরা থেকে মতিঝিল লাইনে ৪৫ ধরনের ত্রুটি ও ঘাটতি খুঁজে পায়। জাপানি ঠিকাদারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে কিছু ত্রুটি সারিয়ে তোলা হয় এবং শর্ত অনুযায়ী না দেওয়া সরঞ্জামগুলো আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঠিক এই পরিস্থিতির মধ্যেই সরকার ডিএমটিসিএলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনল।
বাংলাদেশে অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিক বেশি—এমন সমালোচনা দীর্ঘদিনের। আওয়ামী লীগ সরকারের শুরু করা দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পে অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৯৩ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা। কিন্তু ঠিকাদারদের প্রস্তাব অনুযায়ী কাজ করলে এই ব্যয় দাঁড়াত ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই অস্বাভাবিক ব্যয় কমানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ফারুক আহমেদকে। তিনি জাইকা ও ঠিকাদারদের সঙ্গে দর-কষাকষির মাধ্যমে ব্যয় কমানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
ফারুক আহমেদের নিয়োগ বাতিল প্রসঙ্গে বুয়েটের অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সামছুল হক বলেন, "মেট্রোরেলের মতো কারিগরি প্রকল্পে আমলাতন্ত্রের বাইরে বিশেষজ্ঞ নিয়োগের ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছিল। এখন তাঁকে সরিয়ে দেওয়া পুরোনো ধারায় ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।"
অধ্যাপক সামছুল হক আরও প্রশ্ন তোলেন যে, মানহীন পণ্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানো এবং ত্রুটি সারানোর জন্য ঠিকাদার ও জাইকার ওপর চাপ তৈরি করার কারণেই ফারুক আহমেদকে পদ হারাতে হলো কি না।

Comments
Comments