‘চোখের সামনে স্বামীকে হত্যার দৃশ্য ভুলতে পারছি না’
![]() |
| সন্ত্রাসীদের ছুরিকাঘাতে স্বামী নিহত হওয়ার ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছেন নেপালী দে। গত সোমবার বিকেলে কক্সবাজার শহরের পল্লানকাটা গ্রামে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
টিনশেডের ঘরের উঠানে দাঁড়িয়ে ছিলেন গৃহবধূ নেপালী দে (৩৭)। পরনে সাদা শাড়ি। সন্ত্রাসীদের ছুরিকাঘাতে স্বামী গণেশ পাল (৪০) নিহত হওয়ার ঘটনার বর্ণনা দিতে দিতে বিলাপ করছিলেন তিনি। গত সোমবার বিকেলে কক্সবাজার শহরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বিজিবি ক্যাম্প-সংলগ্ন পল্লানকাটা গ্রামে গিয়ে নেপালী দের সঙ্গে কথা হয়।
নেপালী দে যে জায়গায় দাঁড়িয়ে ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন, ৭ মার্চ দুপুরে সেখানেই ছুরিকাঘাতে নিহত হন তাঁর স্বামী। নেপালী দে বলেন, ‘পুরো পল্লানকাটাতে আমার স্বামীর মতো ভালো ও ভদ্র স্বভাবের মানুষ দ্বিতীয়টি নেই। অথচ এক লাখ টাকা চাঁদার জন্য সন্ত্রাসী জিদান ও বাদশা আমার স্বামীকে খুন করল। চোখের সামনে স্বামীকে এভাবে হত্যার দৃশ্য ভুলতে পারছি না।’
নেপালী দে আরও বলেন, ‘কয়েক দিন আগেও আমার সাজানো সংসার ছিল। তিন সন্তান নিয়ে সুখেই কাটছিল জীবন। এখন স্বামী নেই, পুরো সংসার তছনছ হয়ে গেল। তিন সন্তান নিয়ে এখন আমি কোথায় যাব? আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই, খুনিদের ফাঁসি চাই। খুনিদের বিচার হলে আমার স্বামীর আত্মা শান্তি পাবে।’
নিহত গণেশ পাল পল্লানকাটা গ্রামের বাসিন্দা বিশ্বনাথ পালের ছেলে। শহরের পৌরসভার সমবায় বিপণিবিতানে (সুপারমার্কেট) একটি মুদিদোকান করতেন তিনি। পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন জানান, শনিবার বেলা দেড়টার দিকে স্থানীয় সন্ত্রাসী জিদানের নেতৃত্বে কয়েকজন যুবক গণেশ পালের কাছে গিয়ে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। তাতে রাজি না হওয়ায় সন্ত্রাসীরা গণেশ পালকে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করেন। একপর্যায়ে গণেশের পেটে ছুরিকাঘাত করে তাঁরা চলে যান। স্থানীয় লোকজন গুরুতর আহত অবস্থায় গণেশ পালকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
৮ মার্চ নিহত গণেশ পালের স্ত্রী নেপালী দে বাদী হয়ে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় জিদান ওরফে জিসান ও জাকির হোসেন ওরফে বেলালকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলায় আরও তিন-চারজনকে নাম না জানা (অজ্ঞাতনামা) আসামি করা হয়। আসামি জিদান পল্লানকাটা গ্রামের জাকির হোসেন মিস্ত্রি এবং বেলাল একই গ্রামের আবদুস সাত্তারের ছেলে। মামলার বিবরণীতে (এজাহারে) বলা হয়, গণেশ পাল একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। বসতবাড়ির সংস্কার ও মলত্যাগের আধার (সেফটিক ট্যাংক) নির্মাণের কাজ করার সময় জিদান ও বাদশা ঘটনাস্থলে এসে গণেশের কাছ থেকে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় ছুরিকাঘাত করে গণেশকে হত্যা করা হয়। ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে জিদান ও বাদশাকে গ্রেপ্তার করেছে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ছমি উদ্দিন বলেন, ৭ মার্চ মধ্যরাতে পুলিশ পিএমখালীতে অভিযান চালিয়ে জিদান ও বাদশাকে গ্রেপ্তার করেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দুজনই হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। বর্তমানে তাঁরা কারাগারে বন্দী আছেন। দুজনের বিরুদ্ধেই থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন জানান, গ্রেপ্তার হওয়া জিদান ও বেলাল স্থানীয় কিশোর অপরাধী চক্রের (কিশোর গ্যাং) নেতা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলাম বলেন, জিদান বাহিনীকে চাঁদা না দিয়ে এলাকায় ঘরবাড়ি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা যায় না। গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ জিদান বাহিনীর কাছে জিম্মি ছিল। তাঁকে গ্রেপ্তারের পর মানুষের মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে।
গণেশ হত্যার দ্রুত বিচার এবং সব আসামির গ্রেপ্তারের দাবিতে গত শনিবার রাতে শহরের প্রধান সড়কে বিক্ষোভ মিছিল করেন ব্যবসায়ীরা। এতে পৌরসভার সাবেক মেয়র রাজ বিহারী দাশ বলেন, গণেশ হত্যার বিচার এবং গণেশের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

Comments
Comments