[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে বিএনপি–জামায়াতের রহস্যময় নীরবতা

প্রকাশঃ
অ+ অ-
বিএনপি–জামায়াত | প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘জাতীয় স্বার্থ’ শব্দটি প্রায়ই দাবার ঘুঁটির মতো ব্যবহার করা হয়। রাজপথের উত্তপ্ত স্লোগান থেকে শুরু করে টেলিভিশনের আলোচনা সভা—সবখানেই দেশপ্রেমের খই ফোটে। কিন্তু যখন সত্যি সত্যিই জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পরীক্ষা আসে, তখন অনেক বড় রাজনৈতিক দলের আসল চেহারা বেরিয়ে পড়ে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু যে রাজনৈতিক দলগুলো ছোটখাটো ইস্যুতেও রাজপথ কাঁপিয়ে তোলে, সেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এই চুক্তির বিষয়ে ‘রহস্যময়ভাবে চুপ’ রয়েছে।

বিএনপি-জামায়াতের এই নীরব থাকার রহস্য ফাঁস করে দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, যিনি অন্তর্বর্তী সরকারেরও উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি জানিয়েছেন, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে জানিয়েই এই চুক্তি করা হয়েছে। চুক্তিটি করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবে বলা হচ্ছে, খলিলুর রহমানের উদ্যোগেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে, গত ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার তড়িঘড়ি করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তিটি সই করে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই চুক্তির শর্তগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থী। মূলত এই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের আমদানি বাণিজ্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একপ্রকার আটকা পড়ে যাবে। বাংলাদেশ চাইলেই যেকোনো দেশ থেকে যেকোনো পণ্য আমদানি করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি-রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশকেও কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

অর্থনীতিবিদরা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করেছেন, এই চুক্তির প্রতিটি ছত্রে বাংলাদেশের স্বার্থকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে। মেধাস্বত্ব আইন, শুল্ক কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দোহাই দিয়ে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকে এক নিখুঁত ফাঁদে ফেলা হয়েছে।

একটি গণতান্ত্রিক দেশে জনগুরুত্বপূর্ণ যেকোনো চুক্তির আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা, সংসদে বিতর্ক এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযোগ উঠেছে, অন্তর্বর্তী সরকার গোপনে এই চুক্তি সম্পন্ন করেছে। কিন্তু সেটি যে একেবারে গোপনে হয়নি, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যেই সেই সত্য বেরিয়ে এসেছে।

পেছনের দিকে তাকালে রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিমুখী আচরণের একটি পরিষ্কার ছবি ফুটে ওঠে। গত বছরের শুরুতে যখন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মানবিক সংকটে সহায়তা দেওয়ার জন্য একটি ‘মানবিক পথ’ বা করিডোর তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তখন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল এর বিরোধিতা করেছিল। তাদের যুক্তি ছিল, এই পথ ছেড়ে দিলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখেও সেদিন রাজনৈতিক দলগুলোর অনড় অবস্থানের কারণে অন্তর্বর্তী সরকার সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিল।

অথচ এখন যখন একটি অসম বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়েছে, তখন বিএনপি-জামায়াত একেবারেই নিশ্চুপ। অর্থনীতিবিদরা এই চুক্তির কড়া সমালোচনা করলেও রাজনৈতিক দলগুলোর এই মৌনতা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে খলিলুর রহমানের বক্তব্যের কোনো বিরোধিতা করেনি বিএনপি কিংবা জামায়াতে ইসলামী। এ নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ তাহের বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের করা বাণিজ্য চুক্তিতে বেশ কয়েকটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। জামায়াতে ইসলামী চুক্তির ভালো দিকগুলোর প্রতিবাদ করবে না। তবে দেশের স্বার্থে আঘাত লাগে এমন কিছু থাকলে জামায়াত বা বিরোধী দল তা মানবে না বলেও জানান তিনি। যদিও জামায়াতকে জানিয়েই এই চুক্তি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

সরকারি ও বিরোধী পক্ষের কথাতেই এটি পরিষ্কার যে, খলিলুর রহমান যা বলেছেন তা সঠিক। তাঁর এই তথ্যফাঁস বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক রূঢ় সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পাওয়ার আশায় এবং ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সহজ করতেই বিএনপি ও জামায়াত এই চুক্তিতে সায় দিয়েছে।

বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের রাজনীতিকে ‘জাতীয়তাবাদী’ ও ‘ইসলামী মূল্যবোধের’ রক্ষক হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—বহিঃশক্তির অন্যায্য চাপের কাছে মাথানত না করা। মানবিক করিডোর ইস্যুতে যে তীব্র অবস্থান তারা নিয়েছিল, বাণিজ্য চুক্তির প্রশ্নে সেই অবস্থান আর দেখা যায়নি।

সমালোচকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে তদবির ও তোষামোদের রাজনীতি। বিএনপি–জামায়াত মনে করে, ক্ষমতায় যেতে হলে ওয়াশিংটনের সমর্থন জরুরি। সেই হিসাব থেকেই তারা দেশের কৃষক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থের প্রশ্নে নীরব থেকেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট রাখলে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সহজ হবে—এমন রাজনৈতিক হিসাব থেকেই দল দু’টি জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপস করেছে। তাদের এই অবস্থানে দেশের অর্থনীতিই যেন রাজনৈতিক লেনদেনের উপকরণ হয়ে উঠেছে। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন