পাবনায় সক্রিয় ভেজাল দুধ তৈরির চক্র, অভিযানেও থামছে না কারবার
![]() |
| পাবনার ফরিদপুর উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে জব্দ করা ভেজাল দুধ ফেলে দেওয়া হচ্ছে। গত সোমবার উপজেলার ডেমরা বাজারে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
রমজান মাসে দুধের চাহিদা বাড়ার সুযোগ নিয়ে পাবনার বিভিন্ন এলাকায় ভেজাল দুধ তৈরির চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অসাধু দুধ ব্যবসায়ীরা ভেজাল দুধ তৈরি করে স্থানীয় দুগ্ধ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানের কিছু অসাধু কর্মকর্তার মাধ্যমে বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে সেই ভেজাল দুধ খামারিদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা ভালো দুধের সঙ্গে মিশিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হচ্ছে।
তবে প্রশাসনের অভিযান যে বন্ধ আছে, তা নয়। পাবনার দুধ উৎপাদনকারী উপজেলা বেড়া, ফরিদপুরসহ কয়েকটি এলাকায় সম্প্রতি অভিযান চালিয়ে জরিমানা ও দণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। পাশাপাশি জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও অভিযান চালাচ্ছে। এরপরও বন্ধ হচ্ছে না ভেজাল দুধের কারবার। অন্যদিকে সাঁথিয়া, ভাঙ্গুড়াসহ কয়েকটি উপজেলায় দৃশ্যমান অভিযান না থাকায় সেখানে অসাধু ব্যবসায়ীদের তৎপরতা বেড়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
গত সোমবার ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও পাবনার ফরিদপুর উপজেলা প্রশাসন ডেমরা বাজারের তিনটি দুগ্ধ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে হাতেনাতে ভেজাল দুধ তৈরির প্রমাণ পায়। এ সময় ডেমরা বাজারের কেয়া ডেইরিকে ৩ লাখ, আমিনা ডেইরিকে ৩০ হাজার ও প্রিমিয়াম ফুডকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযানে বিপুল পরিমাণ ভেজাল দুধ, বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য ও অন্যান্য সামগ্রী জব্দ করা হয়।
এর আগে গত ২৮ জানুয়ারি বেড়া উপজেলার নাকালিয়া বাজারের দুটি দোকানে অভিযান চালিয়ে ভেজাল দুধ তৈরির প্রমাণ পান কর্মকর্তারা। তবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের উপস্থিতি টের পেয়ে দোকানের মালিকেরা পালিয়ে গেলে তাঁদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা হয়। তার আগে ১২ জানুয়ারি বেড়ার পেঁচাকোলা বাজারে অভিযান চালিয়ে ভেজাল দুধ তৈরির সঙ্গে জড়িত থাকায় জয়দেব ঘোষ নামের এক ব্যবসায়ীকে হাতেনাতে ধরা হয়। তিনি স্বীকার করেন, ১২ বছর ধরে ভেজাল দুধ তৈরি করে বিভিন্ন দুগ্ধ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান ও মিষ্টির দোকানে সরবরাহ করে আসছিলেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত তাঁকে ২ লাখ টাকা জরিমানা ও এক বছরের কারাদণ্ড দেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া, জগন্নাথপুর, পেঁচাকোলা, মোহনগঞ্জ, নাকালিয়া; সাঁথিয়া উপজেলার সোনাতলা, সেলন্দা, নাগডেমরা, মটকা, ক্ষিদিরগ্রাম, চকমধুপুর, শিবরামপুর, তেতুলিয়া, ফেচুয়ান, তালপট্টি এবং ফরিদপুর উপজেলার ডেমরাসহ বিভিন্ন গ্রামে অর্ধশতাধিক দুধ ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে ভেজাল দুধ তৈরি করছেন। সাধারণত ভোর থেকে সকাল ৯টা এবং সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এসব এলাকায় ভেজাল দুধ তৈরির কাজ চলে। যেসব বাড়িতে ভেজাল দুধ তৈরি করা হয়, সেখানে প্রায়ই ব্লেন্ডার মেশিনের শব্দ শোনা যায়। এই মেশিন ব্যবহার করেই নকল ননি তৈরি করা হয়।
ভেজাল দুধ তৈরিতে জড়িত কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ভেজাল দুধ তৈরির জন্য প্রথমে আসল দুধ থেকে ননি তুলে নেওয়া হয়। এরপর ননিবিহীন দুধে পানি মেশানো হয়। অন্যদিকে পাম তেল বা সয়াবিন তেল দিয়ে তৈরি করা হয় নকল ননি। নকল ননি তৈরির জন্য আধা লিটার ভালো দুধের সঙ্গে সমান পরিমাণ পাম তেল বা সয়াবিন তেল মিশিয়ে ব্লেন্ডার মেশিনে দীর্ঘক্ষণ ফেটানো হয়। সেই কৃত্রিম ননি পরে ননিবিহীন দুধের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া কোনো কোনো ভেজালকারী ছানার পানির সঙ্গে কাপড় কাচার সাবান (ডিটারজেন্ট), হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ও রাসায়নিক মিশিয়ে একেবারে নকল দুধ তৈরি করেন।
নাম প্রকাশ না করে কয়েকজন দুগ্ধ ব্যবসায়ী জানান, দুধে ননির পরিমাণের ওপর সাধারণত দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দাম নির্ধারণ করে। তাই ননির পরিমাণ বাড়িয়ে দেখিয়ে বেশি দাম পেতেই এই ভেজাল করা হয়। এভাবে তৈরি করা দুধের বড় একটি অংশ স্থানীয় কয়েকটি দুগ্ধ সংগ্রহকেন্দ্রে সরবরাহ করা হয় বলে অভিযোগ আছে।
পাবনার বেড়া, সাঁথিয়া, ফরিদপুর, ভাঙ্গুড়া এবং সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলা নিয়ে গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম প্রধান দুধ উৎপাদনকারী অঞ্চল। এখান থেকে দুধ সংগ্রহ করে সরকারি প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটাসহ বেসরকারি বিভিন্ন দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান।
সাঁথিয়ায় বেসরকারি দুধ সংগ্রহকারী একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চারদিকে ভেজাল দুধ তৈরির মহোৎসব চলছে। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী খামারিদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে দুধ সংগ্রহের পর ননি তুলে নিয়ে তাতে ভেজাল মেশাচ্ছেন। এরপর সেই ভেজাল দুধ দেওয়া হচ্ছে কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। ওই অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে তারা সততার সঙ্গে ব্যবসা করেও টিকতে পারছেন না। প্রশাসন দ্রুত কঠোর না হলে এলাকার দুগ্ধশিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ভেজাল দুধের কারবারিদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযানে অংশ নিয়েছেন বেড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নুরেন মাইশা খান। তিনি বলেন, ‘অভিযানে গিয়ে ভেজাল ও নকল দুধ উৎপাদনের প্রমাণ পেয়েছি। বেশ কয়েকজনকে শাস্তিও দিয়েছি। আরও কয়েকটি এলাকার কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছি। তাঁদের হাতেনাতে ধরার জন্য আমাদের চেষ্টা চলছে।’
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পাবনার সহকারী পরিচালক মাহমুদ হাসান বলেন, ফরিদপুরে তিনটি দুধ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে ক্ষতিকর উপাদান দিয়ে ভেজাল দুধ তৈরির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ কারণে তাঁদের জরিমানা করা হয়েছে। এ ধরনের অভিযান আরও বাড়বে বলে তিনি জানান।
বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মিলন মাহমুদ বলেন, ভেজাল দুধ মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বিশেষ করে শিশু ও অসুস্থ মানুষের জন্য এটি বড় ঝুঁকি তৈরি করে। এ ধরনের কারবার বন্ধে নিয়মিত ও জোরালো অভিযান প্রয়োজন।

Comments
Comments