ঘণ্টেশ্বর গ্রামের বারুণী মেলা: এক জনপদে শত বছরের প্রাণের উৎসব
![]() |
| শতবর্ষী পুরোনো ইটের সেতুর পাশে বারুণী স্নানে নামেন পুণ্যার্থীরা। মঙ্গলবার দুপুরে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার ঘন্টেশ্বর গ্রামে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
ভোরের আলো ফুটতেই দূরদূরান্ত থেকে আসা পুণ্যার্থী ও বিক্রেতাদের ব্যস্ততায় জেগে উঠেছে শান্ত-সবুজ এক গ্রাম। মানুষের মনে জেগেছে বিশ্বাস, আচার ও প্রাচীন ঐতিহ্যের টান। বরিশালের উজিরপুর উপজেলার ঘন্টেশ্বর গ্রামে মঙ্গলবার সকাল থেকে শুরু হয়েছে বারুণী স্নান ও মেলা।
প্রতিবছর মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশীর ভোরে এই পুণ্যস্নান শুরু হয়। স্নানের সময় শেষ হয় রাতে ৮টা ৩৭ মিনিটে। এই স্নানকে কেন্দ্র করে এখানে তিন দিনব্যাপী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসছে এই মেলা ও পুণ্যস্নান। বারুণী স্নান কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলা; যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই উৎসবের আমেজে সমবেত হন।
উজিরপুর উপজেলার বামরাইল ইউনিয়নের ঘন্টেশ্বর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, আগত পুণ্যার্থীরা বারুণী খালের জলে নেমে স্নান করছেন। কেউ নীরবে প্রার্থনা করছেন, কেউ পুণ্যের আশায় ডুব দিচ্ছেন। কারও মুখে মন্ত্র, কারও চোখে জল—সব মিলিয়ে এক গভীর আধ্যাত্মিক পরিবেশ। স্নান শেষে ভক্তরা ছুটছেন সর্বজনীন শ্রীশ্রী গঙ্গা-বিষ্ণু-শিব-কালী-আদি অন্নপূর্ণা মন্দিরে। কেউ ফুল, কেউ ধূপ, আবার কেউ ফল নিয়ে পূজা দিচ্ছেন। বিশ্বাসের এই বিনিময় যেন মানুষের মনের সব ক্লান্তি ধুয়ে দেয়।
এই আধ্যাত্মিক পরিবেশের পাশেই রয়েছে আরেক জগত—ঘন্টেশ্বর মেলা। কয়েক শতাব্দীর পুরোনো এই মেলা যেন গ্রামের প্রাণ। এখানে ধর্ম আর জীবিকার এক অদ্ভুত সহাবস্থান দেখা যায়।
![]() |
| মেলায় পুণ্যার্থীদের ভিড়। মঙ্গলবার দুপুরে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার ঘন্টেশ্বর গ্রামে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
মেলার ভেতরে ঢুকলে চোখে পড়ে রঙের উৎসব। কাঠের তৈরি পিঁড়ি, রান্নার সরঞ্জাম, তালপাতার পাখা, শঙ্খ ও শিশুদের খেলনা—সব মিলিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতির এক চিরচেনা রূপ ফুটে উঠেছে। ধামুরা ও শিকারপুরের কাঠশিল্পীরা যেমন তাঁদের নিপুণ কাজ নিয়ে হাজির হয়েছেন, তেমনি বাটাজোরের শঙ্খশিল্পীরাও বহন করছেন শত বছরের ঐতিহ্য।
শঙ্খ ব্যবসায়ী আন্না বণিকের কথায় শোনা যায় সেই ইতিহাসের সুর। তিনি জানান, চার পুরুষ ধরে তাঁরা এই মেলায় আসছেন। তাঁদের কাছে এই মেলা কেবল ব্যবসাই নয়, বরং এটি তাঁদের পরিচয়েরও একটি অংশ।
একপাশে বিভূতি হালদার কাঠের পিঁড়ি সাজিয়ে বসেছেন। তাঁর হাতের কাজ যেন গ্রামীণ জীবনের সহজ-সরল রূপের প্রতীক। অন্য পাশে ছোট ছোট ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে বসেছেন বানারীপাড়ার আবুল কালাম। মেলার খাবারের আয়োজনও বেশ আকর্ষণীয়। জিলাপি, মুড়িমুড়কি ও নানা ধরনের পিঠা-মিষ্টির পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। সব মিলিয়ে পরিবারের সবাই এক আনন্দ উৎসবে মেতে উঠেছে।
![]() |
| কাঠের খেলনা ও নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। মঙ্গলবার দুপুরে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার ঘন্টেশ্বর গ্রামে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
এই মেলাকে ঘিরে একটি জনশ্রুতি রয়েছে। পুরাণের ভগীরথ যখন গঙ্গা দেবীকে পৃথিবীতে নিয়ে আসছিলেন, তখন তাঁর একটি ঘণ্টা এই স্থানে পড়ে গিয়েছিল। সেই থেকেই ‘ঘন্টেশ্বর’ নামের উৎপত্তি। মানুষের বিশ্বাস আর লোককথায় সেই গল্প আজও মেলার প্রতিটি কোণায় বেঁচে আছে। সময়ের বিবর্তনে মন্দিরটির রূপ বদলেছে; পুরোনো স্থাপনা ভেঙে সেখানে নতুন মন্দির তৈরি করা হয়েছে। তবে ঐতিহ্যের সেই ধারা থেমে থাকেনি, বরং সময়ের সঙ্গে আরও বড় হয়েছে।
স্থানীয়দের কাছে এই মেলা কেবল একটি উৎসব নয়, এটি তাঁদের স্মৃতিরও অংশ। স্থানীয় বাসিন্দা কবির মিয়া বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকেই তিনি এই মেলা দেখে আসছেন। মেলাটি ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছে তা তিনি জানেন না, তবে এই আয়োজন তাঁদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
![]() |
| মেলায় জিলাপি তৈরি করছেন এক মিষ্টান্ন বিক্রেতা। মঙ্গলবার দুপুরে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার ঘন্টেশ্বর গ্রামে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
ঘন্টেশ্বরের আরেকটি নীরব সাক্ষী হলো একটি প্রাচীন ইটের সেতু। সময়ের আবর্তে সেতুটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়লেও এটি এখনো বহন করে চলেছে শত বছরের ইতিহাস।
ঘন্টেশ্বরের বারুণী স্নান ও মেলা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঐতিহ্য কখনো কেবল অতীত নয়; বরং তা বর্তমানের মধ্যেই বেঁচে থাকে। মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও জীবিকার সঙ্গে মিশে এটি জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। দক্ষিণের এই জনপদের ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে ঘন্টেশ্বর গ্রাম।




Comments
Comments