বড় নৌকা নিয়ে কড়াকড়ি, সুন্দরবনে গোলপাতা আহরণ অনিশ্চিত
সুন্দরবনে গোলপাতা সংগ্রহের মৌসুম শুরু হওয়া নিয়ে উপকূলীয় নদীতীরের জনপদগুলোতে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ছিল ব্যাপক ব্যস্ততা। কোথাও পুরোনো নৌকা মেরামত করা হয়েছে, কোথাও বসানো হয়েছে নতুন পাটাতন। বাওয়ালিদের প্রস্তুতিও ছিল শেষ পর্যায়ে। ৩ মার্চ থেকে তাঁদের সুন্দরবনে ঢুকে গোলপাতা কাটার কথা ছিল। তবে নৌকার মাপ নিয়ে বন বিভাগের আপত্তিতে শেষ মুহূর্তে পুরো প্রক্রিয়াটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
বন বিভাগ জানিয়েছে, ৩ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সুন্দরবন থেকে গোলপাতা সংগ্রহের অনুমতি দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি নৌকা সর্বোচ্চ ১৮৬ কুইন্টাল বা প্রায় ৫০০ মণ গোলপাতা বহন করতে পারবে। সেই হিসেবে সর্বোচ্চ এক হাজার মণ ধারণক্ষমতার নৌকা পর্যন্ত অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বন বিভাগ।
তবে পরিমাপের পর দেখা গেছে, গোলপাতা সংগ্রহের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া অধিকাংশ নৌকাই নির্ধারিত সীমার চেয়ে বড়। এই কারণে বড় মাপের ওই নৌকাগুলোকে আপাতত সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।
আমি নিজে ফিতা দিয়ে প্রতিটি নৌকার মাপ নিয়েছি। প্রায় সব নৌকাই এক হাজার মণ ধারণক্ষমতার চেয়ে বড় পাওয়া গেছে। প্রতিটি নৌকার পরিমাপ ও ছবি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
নাসির উদ্দীন, কর্মকর্তা , খুলনা রেঞ্জের কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশন
বন কর্মকর্তাদের মতে, অতীতে অনেক বাওয়ালি ৫০০ মণ গোলপাতার কর (রাজস্ব) দিলেও বড় নৌকায় করে দেড় থেকে দুই হাজার মণ পর্যন্ত পাতা নিয়ে আসতেন। এমনকি গোলপাতার নিচে সুন্দরবনের মূল্যবান গাছের গুঁড়ি লুকিয়ে পাচার করার প্রমাণও পাওয়া গেছে। এসব অনিয়ম বন্ধ করতেই এবার নৌকার ধারণক্ষমতার নিয়মটি কঠোরভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সুন্দরবন খুলনা অঞ্চলের কাশিয়াবাদ বন কার্যালয়ের কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন নদীতীরে গিয়ে গোলপাতা সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত করা নৌকাগুলো পরিমাপ করেন। তিনি বলেন, আমি নিজে ফিতা দিয়ে প্রতিটি নৌকার মাপ নিয়েছি। দেখা গেছে, প্রায় সব নৌকাই এক হাজার মণ ধারণক্ষমতার চেয়ে বড়। প্রতিটি নৌকার মাপ ও ছবি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
বন বিভাগ ও বাওয়ালিদের সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের ভেতরের নদী ও খালের পাড়ে প্রাকৃতিকভাবেই প্রচুর গোলপাতা জন্মে। প্রতি বছর এই মৌসুমে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার প্রায় ১০ হাজার মানুষ গোলপাতা কাটা, পরিবহন ও বিক্রির কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
বাওয়ালি আবদুল গনি আক্ষেপ করে বলেন, নৌকার পেছনে কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। মাঝি-শ্রমিক ঠিক করা থেকে শুরু করে বাজারসদাই—সব প্রস্তুতি শেষ। এখন বন বিভাগ বলছে নৌকা বড়, তাই অনুমতি মিলবে না। অথচ গত বছর এই নৌকা নিয়েই সুন্দরবনে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছিলাম।
বনজীবীদের সংগঠন সুন্দরবন বাওয়ালি ফেডারেশনের সভাপতি মীর কামরুজ্জামান জানান, প্রতিবছর সাধারণত দুই দফায় মোট ৫৬ দিনের জন্য গোলপাতা কাটার অনুমতি দেওয়া হয়। এবার অন্তত এক দফায় ২৮ দিনের অনুমতি দেওয়ার কথা জানিয়েছিল বন বিভাগ। সেই অনুযায়ী বাওয়ালিরা নৌকা মেরামতসহ সব প্রস্তুতি নিয়েছেন। তিনি বলেন, এখন নৌকার মাপের অজুহাতে আমাদের বনে যেতে দিচ্ছে না। গত জুন মাসেই বন বিভাগ এসব নৌকার অনুমতিপত্র নবায়ন করেছে। তখন যদি নৌকার মাপ নেওয়া হতো, তাহলে আমাদের এই বিপদে পড়তে হতো না।
মীর কামরুজ্জামানের দাবি, প্রতিটি নৌকা প্রস্তুত করতে গড়ে প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। সব মিলিয়ে বাওয়ালিদের বিনিয়োগের পরিমাণ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকারও বেশি। এখন অনুমতি না পেলে অনেকেই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন।
তবে বন বিভাগ বলছে, সুন্দরবন রক্ষার স্বার্থেই এবার নিয়ম কঠোরভাবে পালন করা হচ্ছে। পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, আমরা আগেই বাওয়ালিদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছিলাম। প্রতিবছর নৌকা মাপার জন্য তাঁদের আমাদের কার্যালয়ে আসতে হতো। এবার বাওয়ালিদের বাড়তি খরচ বাঁচাতে আমরা কর্মকর্তাদেরই নদীতীরে পাঠিয়েছি। এখন থেকে সুন্দরবন সুরক্ষায় নিয়মের বাইরে কিছুই করা হবে না।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, একসময় সুন্দরবন থেকে কাঠ, মাছ, কাঁকড়া, গোলপাতা ও মধুসহ ১২টি খাত থেকে কর (রাজস্ব) সংগ্রহ করা হতো। ১৯৮৯ সালে আইন করে গেওয়া ও গরান ছাড়া সব ধরনের গাছ কাটা বন্ধ করা হয়। পরে ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালের আইলার পর গেওয়া ও গরান সংগ্রহও বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে সুন্দরবন থেকে মাছ, কাঁকড়া, গোলপাতা, মধু ও পর্যটন খাত থেকেই মূলত আয় হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আমরা সুন্দরবনের ওপর চাপ কমাতে চাই এবং সম্পদ আহরণ ধীরে ধীরে সীমিত করতে চাই। এক হাজার মণের বেশি ধারণক্ষমতার নৌকা নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তটি একটি সাহসী পদক্ষেপ। আগে অনেক সময় রাজনৈতিক চাপের কারণে এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর করা কঠিন হতো। এবারও তেমন কোনো বাধা আসে কি না, সেই আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
পরিবেশবাদীরাও সুন্দরবন রক্ষার স্বার্থে এই কঠোর অবস্থানের পক্ষেই মত দিয়েছেন। নাগরিক সংগঠন ‘উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলন’-এর সভাপতি মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, বনজীবীদের বনের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে এবং তাঁদের জন্য বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। গুটিকয়েক বাওয়ালির স্বার্থ রক্ষার জন্য জাতীয় সম্পদ সুন্দরবনকে কোনোভাবেই ঝুঁকির মুখে ফেলা যাবে না।
সুন্দরবন খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মো. ইমরান আহমেদ বলেন, বন বিভাগ প্রথমে এ বছর গোলপাতা সংগ্রহ পুরোপুরি বন্ধ রাখার কথা ভেবেছিল। পরে বাওয়ালিদের অনুরোধে ৩ মার্চ থেকে ২৮ দিনের জন্য অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে শর্ত ছিল—নৌকার নির্ধারিত মাপ অবশ্যই মানতে হবে। এখন দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ নৌকাই সেই মাপের চেয়ে বড়। তাই আপত্তি জানানো হয়েছে। অতীতে কী হয়েছে সেটি বড় বিষয় নয়; এখন থেকে নিয়ম মেনে চললে একটি সঠিক ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

Comments
Comments