বগুড়ায় ভেজাল মসলার রমরমা কারবার
![]() |
| ভেজাল জিরা প্রস্তুতের দায়ে কারখানার মালিককে তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। সোমবার বগুড়া সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর পূর্বপাড়ায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
বগুড়ার আমদানিকারকদের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ মসলা দেশের বাজারে আসে। রাজাবাজারের পাইকারি আড়ত থেকে ব্যবসায়ীরা সারা দেশে এই মসলা সরবরাহ করেন। জেলায় উৎপাদিত মরিচ ও হলুদেরও বেশ সুনাম রয়েছে। কিন্তু বগুড়ার এই বিশাল বাজারকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলছে ভেজাল মসলার জমজমাট কারবার। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মসলা গুদামে নিয়ে ভেজাল মিশিয়ে নামী প্রতিষ্ঠানের নামে প্যাকেটজাত করে বাজারে ছাড়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জেলা প্রশাসন, ভোক্তা অধিকার ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানা দিলেও এই অসাধু কাজ থামছে না। এতে আমদানিকারকেরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, ভেজাল কারবারিদের কারণে মসলার মান ঠিক থাকছে না এবং সারা দেশের ব্যবসায়ীরা বগুড়ার আমদানিকারকদের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং র্যাব-১২–এর অপরাধ দমন বিশেষ শাখার সদস্যরা মঙ্গলবার দুপুরে একটি যৌথ অভিযান চালায়। শহরের ফতেহ আলী বাজারের দুটি অনুমোদনহীন মসলা কারখানায় অভিযান চালিয়ে ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। পচা ও নিম্নমানের মরিচের সঙ্গে ধানের তুষ মিশিয়ে গুঁড়া মরিচ তৈরি করায় ‘দোলন মসলা মিল’-এর মালিক মো. দোলনকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া ‘বগুড়া হলুদ মিল’ নামে একটি কারখানায় নষ্ট ও নিম্নমানের হলুদ মিশিয়ে ভালো হলুদ হিসেবে রাখার দায়ে মালিক রোকনুজ্জামানকে ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
অভিযানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসান এবং কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক ফজিলাতুন্নেসা ফৌজিয়া উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে, আমদানি করা জিরার সঙ্গে নিম্নমানের বীজ মিশিয়ে বিদেশি নামি ব্র্যান্ডের প্যাকেটে ভরার খবর পেয়ে গত সোমবার সদর উপজেলার এরুলিয়া এলাকায় আরেকটি অভিযান চালায় জেলা প্রশাসন, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও র্যাব। ওই গুদামে জিরার সঙ্গে ভেজাল মেশানোর হাতেনাতে প্রমাণ পেয়ে শাহিদ আলম নামে এক ব্যবসায়ীকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এ সময় ৪২ বস্তা জিরা এবং ১৯২ বস্তা ভেজাল বীজ জব্দ করা হয়। জব্দ করা মালামাল নিয়ম অনুযায়ী বিক্রির জন্য বগুড়া আমদানিকারক ও মসলা ব্যবসায়ী সমিতিকে নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফয়সাল আহমাদ।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বগুড়া কার্যালয়ের কর্মকর্তা মো. রাসেল বলেন, আমদানি করা জিরার পাইকারি দাম প্রতি কেজি ৫৬০ থেকে ৫৮০ টাকা। অন্যদিকে, সুগন্ধযুক্ত এক ধরনের বীজ (ক্যারাওয়ে সিড), যা দেখতে জিরার মতো, সেটির পাইকারি দাম প্রতি কেজি মাত্র ২৪০ টাকা। এরুলিয়া এলাকার একটি গুদামে দীর্ঘদিন ধরে জিরার সঙ্গে এই কম দামি বীজ মিশিয়ে ভারতীয় ব্র্যান্ডের প্যাকেটে ভরে বিক্রির কারবার চলছিল। এটি ক্রেতাদের সঙ্গে বড় ধরনের প্রতারণা। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালিয়ে ৩ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
বগুড়া জেলা মসলা আমদানিকারক ও মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এবং ওম এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিমল প্রসাদ (রাজ) বলেন, বগুড়ায় বছরে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি মসলা আমদানি হয়। এই বিশাল বাজারকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই একদল অসাধু ব্যক্তি ভেজাল মসলার কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। এই ভেজাল মসলা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে, যার ফলে মসলার সঠিক মান বজায় থাকছে না। এতে সারা দেশের ব্যবসায়ীরা বগুড়ার আমদানিকারকদের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন। অসাধু ব্যবসায়ীদের রুখতে প্রশাসনের অভিযান আরও জোরদার করা দরকার।
শুধু সাম্প্রতিক সময়েই নয়, এর আগেও বিভিন্ন সময় ভেজাল মসলা ঠেকাতে প্রশাসন অভিযান চালিয়েছে। গত দেড় বছরে অন্তত ১০টি বড় অভিযানের খবর পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে বগুড়ার পাইকারি আড়ত রাজাবাজারে কাপড়ের রং, পশুখাদ্য ও ধানের তুষ ব্যবহার করে হলুদ ও মরিচের গুঁড়া তৈরির অপরাধে ‘আল-আমিন মসলা মিল’-কে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা কাজিপাড়া এলাকায় কাপড়ের রং ও পচা উপাদান মিশিয়ে ভেজাল মসলা তৈরির দায়ে ‘আরএসি ইন্ডাস্ট্রি’ নামে এক অনুমোদনহীন কারখানায় অভিযান চালিয়ে ৩ লাখ টাকা জরিমানা ও একজনকে এক মাসের কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। বগুড়া শহরের মগলিশপুর এলাকায় বুনো ফল ‘তারাগোটা’য় খয়েরের প্রলেপ, রাসায়নিক ও রং মিশিয়ে নকল কালো এলাচ তৈরির অপরাধে এক ব্যবসায়ীকে বড় অঙ্কের জরিমানা করা হয়।
এছাড়া বগুড়া শহরের বাদুড়তলা এলাকার ‘মেসার্স আলী এন্টারপ্রাইজ’-এর গুদামে জিরার সঙ্গে মৌরি জাতীয় মসলা ও বালু মিশিয়ে ওজন বাড়ানোর অপরাধে মালিক আলী আহম্মেদকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। পশুখাদ্যে রং মিশিয়ে গুঁড়া মসলা তৈরির দায়ে রাজাবাজারের ‘মুন্সি হলুদ মিল’ নামের একটি কারখানা সিলগালা করে দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় সেনাবাহিনীর একটি অভিযানে রাজাবাজার এলাকায় মেয়াদোত্তীর্ণ ও খাওয়ার অনুপযোগী মসলা রাখার দায়ে ‘জাহাঙ্গীর স্টোর’-কে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া ইটের গুঁড়া, তুষ ও কাঠের রং মিশিয়ে মসলা তৈরির অপরাধে সুলতান বাদশাহ নামে এক ব্যবসায়ীকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। শহরের চেলোপাড়ায় কালো এলাচে পানি দিয়ে ওজন বাড়ানো ও মেয়াদোত্তীর্ণ মসলা রাখার দায়ে ব্যবসায়ী জগদীশ প্রসাদকেও ১ লাখ টাকা জরিমানা করেছে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর।
বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের কিডনি রোগ বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক এহসানুল করিম বলেন, যেকোনো ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক মানুষের শরীরের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে। মসলায় এসব রাসায়নিক মেশানো হলে তা হৃৎপিণ্ড ও লিভার অকেজো করে দিতে পারে। এছাড়া ভেজাল মসলার বিষাক্ত রং বা রাসায়নিক থেকে ক্যানসার হওয়া ছাড়াও কিডনি ও যকৃৎ বিকল হয়ে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

Comments
Comments