[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

অর্থসংকটে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, বেতন দিতে ঋণ নিতে হচ্ছে

প্রকাশঃ
অ+ অ-
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন | ফাইল ছবি

রাজধানীর নাগরিক সেবার দায়িত্বে থাকা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গত মাসে সংস্থাটিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও উৎসব ভাতা (বোনাস) দিতে ঋণ করতে হয়েছে। আগামী মাসে নিজস্ব আয় থেকে বেতন দেওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগে আছেন সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তারা।

সংস্থাটির প্রশাসক ও বিএনপি নেতা আবদুস সালাম ইতিমধ্যে এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চেয়েছেন। ৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, গত কয়েক মাসে প্রত্যাশিত হারে কর (রাজস্ব) আদায় হয়নি। অন্য বছরের তুলনায় এ বছর আয় কম হওয়ায় সিটি করপোরেশন অর্থসংকটে পড়েছে।

আবদুস সালাম বলেন, বিগত প্রশাসনের সময় যেভাবে ঢালাওভাবে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করলে সিটি করপোরেশন কার্যত ধসে পড়বে। কোনোভাবেই তা করা সম্ভব নয়।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির রাজস্ব বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর গত প্রায় দেড় বছরে সংস্থাটির আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এই সময়ের মধ্যে মাত্র দুই মাসে ১০০ কোটি টাকার বেশি আয় হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে, অর্থাৎ নির্বাচনের মাসে আয় হয়েছে মাত্র ৪২ কোটি টাকা। অথচ কয়েক বছর আগেও নিয়মিতভাবে মাসে ৭০ থেকে ১০০ কোটি টাকার বেশি আয় হতো বলে কর্মকর্তারা জানান।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আয় হয় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগের ওই বছরে সংস্থাটি ১ হাজার ৬১ কোটি টাকা আয় করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আয় না বাড়ায় ওই সময় জমা থাকা অর্থ থেকেই গত ১৮ মাস ধরে খরচ মেটাতে হয়েছে। ফলে তহবিলে চাপ বাড়ছে।

সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর তড়িঘড়ি করে বিপুল পরিমাণ উন্নয়নকাজের বিল মেটানো হয়েছে। সাবেক মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ও শেখ ফজলে নূর তাপসের সময় নানা অসংগতির অভিযোগে যেসব বিল আটকে রাখা হয়েছিল, সেগুলোর অনেকগুলোই পরে ঠিকাদারদের দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগের কিছু কর্মকর্তা অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে নিজস্ব তহবিল থেকে এই টাকা দিতে সহযোগিতা করেছেন।

সংস্থাটির হিসাব শাখার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনেক ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করে বিল তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও বলপ্রয়োগ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এমনকি বিশৃঙ্খল জটলা তৈরির অভিযোগও রয়েছে। তিনি বলেন, প্রকৌশল বিভাগের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে দ্রুত বিল আদায়ের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে স্বল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ তহবিল থেকে বেরিয়ে গেছে।

ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ মাসে উন্নয়নকাজের বিল হিসেবে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এর সবটাই দেওয়া হয়েছে সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে। তবে মাঠপর্যায়ে অনেক প্রকল্পে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলেও বিল দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর পাশাপাশি ইতিমধ্যে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব কাজ বাস্তবায়ন হলেও ঠিকাদারদের বিল দেওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা বর্তমানে সিটি করপোরেশনের নেই বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সংস্থাটির প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, শুধু করপোরেশনের টাকাই শেষ করা হয়নি, পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় কিছু কাজের কার্যাদেশ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। নানা কারণে আটকে থাকা বিলগুলো তড়িঘড়ি করে দেওয়ার ক্ষেত্রে করপোরেশনের কারও যোগসাজশ রয়েছে কি না, সেগুলো তদন্ত করে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং পরিচালন ব্যয় মিলিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ২৫ কোটি টাকা প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে সাধারণ তহবিলে আছে মাত্র ১৬ কোটি টাকা।

অবশ্য সিটি করপোরেশনের কাছে আরও কিছু খাতে অর্থ জমা রয়েছে। যেমন জামানত তহবিলের স্থায়ী আমানত (এফডিআর), অগ্রিম বাজার সেলামি, রাস্তা খনন তহবিলের স্থায়ী আমানতসহ কয়েকটি খাতে মোট প্রায় ৮৬৯ কোটি টাকা রয়েছে। তবে এসব অর্থ নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত থাকায় তা থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বা সাধারণ খরচ মেটানোর সুযোগ নেই। এই কারণে আগামী মাসের বেতন-ভাতা কীভাবে দেওয়া হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৩২০ কোটি টাকা। গত ৮ মাসে সংস্থাটির আয় হয়েছে ৬২৫ কোটি টাকা। একই সময়ে পরিচালন ব্যয় হয়েছে ৪১৮ কোটি টাকা এবং উন্নয়নকাজে ব্যয় হয়েছে ৫২০ কোটি টাকা।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সবচেয়ে বড় তিনটি আয়ের উৎস হলো—গৃহকর (হোল্ডিং ট্যাক্স), ব্যবসায়িক অনুমতিপত্র (ট্রেড লাইসেন্স) ফি এবং বাজার ও সম্পত্তি ইজারা। এর বাইরে বিজ্ঞাপন ও সাইনবোর্ড, গাড়ি রাখার স্থান (পার্কিং) ইজারা, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন ফি এবং বিভিন্ন ধরনের সনদ ফি থেকেও আয় করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এসব খাত থেকেও প্রত্যাশিত আয় আসছে না।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিটি করপোরেশনের আয় কমে গেলে তার প্রভাব সরাসরি নাগরিক সেবায় পড়ে। তাঁদের মতে, নগরের দৈনন্দিন সেবাগুলোর বড় অংশই নিজস্ব আয়ের ওপর নির্ভরশীল। ফলে আয় কমে গেলে মশা নিধন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রাস্তা ও ড্রেনের রক্ষণাবেক্ষণ, সড়কবাতি পরিচালনাসহ মৌলিক সেবাগুলো ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান অর্থসংকট শুধু আয় ঘাটতির ফল নয়; এর পেছনে প্রশাসনিক অদক্ষতা ও অস্বচ্ছ ব্যয় ব্যবস্থাপনাও বড় কারণ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বহু বছরের পুরোনো বকেয়া বিল, যার কিছু অনিয়মের কারণে আটকে ছিল—সেগুলো অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে অল্প সময়ে বিপুল অর্থ বেরিয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, গত দেড় বছর উন্নয়নকাজের বিল পরিশোধ নিয়ে বেশি তোড়জোড় হওয়ায় আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, যা এখন সেবা কার্যক্রমকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন