ড. ইউনূস ও সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে এত অভিযোগের নেপথ্যে কী?
![]() |
| মুহাম্মদ ইউনূস | গ্রাফিক্স: পদ্মা ট্রিবিউন |
সদ্য বিদায় নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর উপদেষ্টা পরিষদের অধিকাংশ সদস্যের বিরুদ্ধে প্রতিদিন নতুন নতুন দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা হস্তান্তরের পর এই অভিযোগের সংখ্যা বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পর্যন্ত সবখানেই অভিযোগের বন্যা দেখা যাচ্ছে।
অভিযোগ কেবল প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের বিরুদ্ধে নয়; সাবেক সংবাদ সচিব (প্রেস সচিব) শফিকুল আলম, সাবেক উপ-সংবাদ সচিব মোহম্মদ আবুল কালাম আজাদ মজুমদার, সাবেক প্রধান কৌঁসুলি (চিফ প্রসিকিউটর) তাজুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুরের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে।
এর আগে ১৯৯০, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৭ সালে বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করা বিভিন্ন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও তাঁদের উপদেষ্টা পরিষদ সাধারণত নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন। সেসব সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ততটা ওঠেনি। সদ্য বিদায় নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে কেন এত অভিযোগ উঠছে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব পালনকালে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজের প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ টেলিকমের ৬৬৬ কোটি টাকার কর (রাজস্ব) মাফ করিয়ে নিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টা নিজের স্বার্থে ক্ষমতা ব্যবহার করে আর্থিক সুবিধা নিতে শুরু করলে, অন্যান্য উপদেষ্টারাও একই সুযোগ নিয়েছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। এ ছাড়া একের পর এক রাজনৈতিক নেতা, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে অনেক উপদেষ্টা যুক্ত ছিলেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের তালিকায় নাম রয়েছে ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে উপদেষ্টার দায়িত্ব পাওয়া আসিফ মাহমুদেরও। দুদক সূত্রে জানা গেছে, তাঁর বিরুদ্ধে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ১১ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার এবং বেআইনি বিটকয়েন লেনদেনের অভিযোগও করা হয়েছে।
সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধে এক ব্যক্তি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমতি (লাইসেন্স) দেওয়ার বিনিময়ে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ করেছেন। দুদক বর্তমানে এসব অভিযোগ যাচাই-বাছাই করছে।
সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে এক ডজনের বেশি দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে মামলা-বাণিজ্য, জামিন-বাণিজ্য, বিচারক নিয়োগ ও অন্যান্য অনৈতিক লেনদেন। বলা হচ্ছে, আসিফ নজরুল জামিন-বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকার অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে অন্তত আটটি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অন্যতম। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে অন্যের সম্পত্তি জোরপূর্বক দখলের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ক্ষমতায় থাকাকালে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ঘটেছে। এ ছাড়া জানা গেছে, রিজওয়ানার স্বামী আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সম্পত্তি দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন।
সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ জমা পড়েছে, যার মধ্যে সামিট গ্রুপের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির সঙ্গে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের বিরুদ্ধে দরপত্র (টেন্ডার) জালিয়াতি, হাসপাতালের কেনাকাটায় অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তাঁর বিরুদ্ধে ৯ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগও করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সংবাদ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শফিকুল আলমের বিরুদ্ধে ২ হাজার কোটি টাকার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
একই সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি (চিফ প্রসিকিউটর) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে এক হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুরের বিরুদ্ধেও বিদেশে ৪৫ কোটি টাকা খরচ করে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনার অভিযোগ রয়েছে।
তবে দায়িত্ব ছাড়ার পরই যে উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, বিষয়টি এমন নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ৯ আগস্ট প্রশাসন ক্যাডারদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত এক সেমিনারে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আব্দুস সাত্তার, ড. ইউনূস সরকারের আট উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ তুলে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন।
সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের (পলিটব্যুরো) সদস্য রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, যে সরকারপ্রধান ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে নিজের স্বার্থমতো সুবিধা গ্রহণ করেন এবং দুর্নীতির আশ্রয় নেন, সেই সরকারের অন্যান্য সদস্যরাও এ কাজে জড়িত হবেন—এটাই স্বাভাবিক। অভিযোগ রয়েছে, তাঁরা ১৮ মাসে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন। এসব অভিযোগ তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া জানিয়েছেন, তিনি আয়-ব্যয়ের হিসাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিয়েই পদত্যাগ করেছেন।
জানতে চাইলে সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, তাঁর আয়-ব্যয়ের হিসাব সরকারের কাছে জমা আছে। টাকা পাচারের অভিযোগটি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সদ্য সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অভিযোগের সত্যতা পেলে দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। যদি প্রাথমিক দুর্নীতির তথ্য পাওয়া যায় এবং তা আমলে নেওয়ার মতো হয়, তবে তা তদন্ত করা প্রয়োজন। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

Comments
Comments