প্রত্যক্ষদর্শীর চোখে দৌলতদিয়া বাসডুবি: ফেরি আসামাত্র বাসটি চলতে শুরু করে সরাসরি নদীতে পড়ে যায়
![]() |
| ডুবে যাওয়া বাসের যাত্রীদের উদ্ধারে ডুবুরিদলের তৎপরতা। বুধবার রাতে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
ঢাকায় যেতে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে ৩০০ টাকা ভাড়া দিয়ে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসে উঠেছিলেন আবদুস সালাম। কিন্তু ঘাটে ফেরি আসতে দেরি হওয়ায় তিনি বাস থেকে নেমে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। দুর্ঘটনার পর রাতে দৌলতদিয়ার সৈদাল পাড়ার বাসিন্দা আবদুস সালামকে ফেরিঘাটে পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ফেরিঘাটের পন্টুনে ওঠার সড়কে গাড়িটি দাঁড়িয়ে ছিল। এ সময় ফেরি এসে ঘাটে ভেড়ামাত্র হঠাৎ বাসটি চলতে শুরু করে সরাসরি নদীতে চলে যায়। চালক অনেক চেষ্টা করেও গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি।
বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে দৌলতদিয়া ঘাটে নদী পারাপারের জন্য অপেক্ষা করছিল ঢাকাগামী যাত্রীবাহী বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। এ সময় বাসটিতে বেশ কিছু যাত্রী ছিলেন। দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
ঘটনাস্থলে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার সাংবাদিকদের জানান, বাস ডুবে যাওয়ার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফোন করে খোঁজ-খবর নিয়েছেন। তিনি দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন এবং জেলা প্রশাসককে বিষয়টি অবহিত করতে বলেছেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, বাসটিতে প্রায় ৪০ জন যাত্রী ছিলেন। এর মধ্যে ছয়-সাতজন ঘাটে বাস থেকে নেমে গেছেন। এছাড়া চারজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এর মধ্যে দুইজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়, অন্য দুইজন চিকিৎসাধীন। ধারণা করা হচ্ছে, আরও ৩০ জনের মতো যাত্রী নিখোঁজ থাকতে পারেন।
দুর্ঘটনার বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের কাজ চলছে। কমিটিতে জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি, বিআইডব্লিউটিএ, বিআইডব্লিউটিসি এবং পুলিশের প্রতিনিধি থাকবেন।
মারা যাওয়া ব্যক্তিদের একজন রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের অবসরপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী রেহেনা আক্তার। তার বাড়ি রাজবাড়ীর ভবানীপুর এলাকায়। তিনি বাসে করে ঢাকার মিরপুরের বাসায় যাচ্ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন মেয়ে স্বাভা, ছোট ছেলে রাইয়ান তোতন এবং একমাত্র নাতি (বড় ছেলের সন্তান)। স্বাভা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক, আর রাইয়ান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। তারা সবাই বাসের ভেতরে বসে ছিলেন। পরে বাসের জানালা ভেঙে মেয়ে স্বাভা তার মাকে নিয়ে বের হয়ে যান। কিন্তু রেহেনা আক্তারকে বাঁচানো যায়নি।
![]() |
| ফেরির অপেক্ষায় থাকা বাসটি পন্টুন থেকে নদীতে পড়ে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। আজ বুধবার বিকেলে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে | ছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহীত |
রেহেনা আক্তারের ভাই, কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক আউয়াল আনোয়ার বলেন, ‘ঈদের ছুটি শেষে আমার বোন, ছেলে, মেয়ে ও নাতিকে নিয়ে ঢাকার বাসায় যাচ্ছিলেন। বাসটি নদীতে পড়ে গেলে জানালা ভেঙে আমার বোন ও ভাগনি বের হতে পারলেও অন্যদের বের করা সম্ভব হয়নি। পরে আমার ভাগনি স্বাভা তার মাকে নিয়ে গোয়ালন্দ হাসপাতালে গেলে চিকিৎসক রেহেনাকে মৃত ঘোষণা করেন।’
রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মদাপুর থেকে বাসটিতে উঠেছিলেন তরুণ আশরাফুল আলম। নদীতে বাস পড়ে যাওয়ার খবর পেয়ে ঘাটে ছুটে আসেন তার বাবা। সেখানে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ছেলে আমার ঈদের ছুটিতে বাড়ি আসছিল। সে ঢাকার একটি অনলাইনে কাজ করতেন। ছেলে বাড়ি থেকে বিদায় নিলেও, এই বিদায় যে তার শেষ বিদায় হবে, তা তো জানতাম না।’
![]() |
| বাসযাত্রী ছেলে আশরাফুল আলমের খোঁজে এসে বিলাপ করছেন রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মদাপুর এলাকার এই ব্যক্তি। বুধবার রাতে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবহনের ঘাট তত্ত্বাবধায়ক মো. মনির হোসেন জানান, বিকেল পাঁচটার কিছু পর সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসটি দৌলতদিয়ার তিন নম্বর ঘাটে পৌঁছায়। তখন ঘাটে থাকা একটি ফেরি যানবাহন মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ার দিকে রওনা দেয়। অল্পের জন্য ওই ফেরিতে উঠতে না পারায় বাসটি অন্য ফেরির জন্য অপেক্ষা করছিল। সোয়া পাঁচটার দিকে ‘হাসনা হেনা’ নামের একটি ছোট ফেরি পন্টুনে আঘাত করলে বাসটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়।
মনির হোসেন আরও বলেন, ‘চোখের সামনে বাসটি পন্টুন থেকে নদীতে পড়ে গেল, আমরা কিছু করতে পারিনি। এ সময় বাসে নারী-শিশুসহ অন্তত ৪০ জন যাত্রী ছিলেন। কিছু যাত্রী উদ্ধার হয়ে ওপরে উঠতে পারলেও, অধিকাংশ যাত্রী বাসের ভেতরে আটকা পড়েছেন।’



Comments
Comments