অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসে দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক
![]() |
| মানবাধিকার সহায়তা সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) সংবাদ সম্মেলন। জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
রাজনৈতিক সহিংসতা
নিহত: ১৯৫ জন
আহত: ১১,০০০ জন
মব ভায়োলেন্স ও গণপিটুনি
মোট ঘটনা: ৪১৩টি
নিহত: ২৫৯ জন
আহত: ৩১৩ জন
সাংবাদিক নির্যাতন ও হামলা
মোট হামলা: ৪২৭টি
নিহত: ০৬ জন
নির্যাতন: ৮৩৪ জন
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসে (২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত) দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি দুশ্চিন্তার মতো ছিল বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সহায়তা সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংস্থাটি বলছে, এই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি (মব ভায়োলেন্স), সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা, সীমান্তে হত্যা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ নানাভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে।
বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী মানবাধিকার পরিস্থিতি ও প্রাক্-নির্বাচনী সহিংসতা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম।
সংবাদ সম্মেলনে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘গণপিটুনি বা মব ভায়োলেন্স এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো এ বিষয়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারেনি। দলবদ্ধভাবে সন্ত্রাস করে বিভিন্ন কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়েছে।’
নূর খান লিটন আরও বলেন, ‘এই সময়ে কিছু অদৃশ্য শক্তির উপস্থিতি দেখা গেছে। এর মাধ্যমে গণ-অভ্যুত্থানের যে ধরন, সক্রিয়তা ও আদর্শ ছিল, তা ম্লান হয়েছে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার উন্নয়নে কিছু উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম ছিল। গণপিটুনি (মব ভায়োলেন্স) নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় নাগরিক নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে জনমনে হতাশা ও দুশ্চিন্তা বেড়েছে।
রাজনৈতিক ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ মাসে দেশে ১ হাজার ৪১১টি রাজনৈতিক সহিংসতায় কমপক্ষে ১৯৫ জন নিহত ও ১১ হাজার ২১৯ জন আহত হয়েছেন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধ, সমাবেশ ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত, চাঁদাবাজি ও স্থাপনা দখল এসব ঘটনার প্রধান কারণ। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিএনপি। দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৭০৪টি ঘটনায় ১২১ জন নিহত এবং ৭ হাজার ১৩১ জন আহত হয়েছেন।
একই সময়ে সন্ত্রাসী হামলার ২৩৬টি ঘটনায় ১৫৬ জন নিহত ও ২৪৯ জন আহত হন। এ ছাড়া ৩০০-এর বেশি মানুষ গুলিবিদ্ধ হন এবং শতাধিক রাজনৈতিক কার্যালয় ও ১৩০টির বেশি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহনে ভাঙচুর এবং আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ১৫৫টি নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় ৭ জন নিহত ও ১ হাজার ৪০৩ জন আহত হয়েছেন। উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে পল্টনে গুলিবিদ্ধ হয়ে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় মনোনয়ন নিয়ে বিরোধে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
গণপিটুনি ও সাংবাদিক নির্যাতন
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১৭ মাসে গণপিটুনি ও মব ভায়োলেন্সের ৪১৩টি ঘটনায় ২৫৯ জন নিহত ও ৩১৩ জন আহত হন। সাংবাদিকদের ওপর ৪২৭টি হামলায় ৬ জন নিহতসহ ৮৩৪ জন নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন। এ সময়ে ৪৯টি মামলায় ২২২ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া দৈনিক পত্রিকা কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
সাইবার নিরাপত্তা আইন ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের আওতায় ৪১টি মামলায় ৬৯ জন অভিযুক্ত ও ৩৩ জন গ্রেপ্তার হন। অধিকাংশ মামলা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিষয়বস্তুকে (কনটেন্ট) কেন্দ্র করে হওয়ায় আইনের অপব্যবহারের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে এইচআরএসএস।
বিচারবহির্ভূত হত্যা ও সংখ্যালঘু নির্যাতন
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, হেফাজতে থাকা অবস্থায় ও নির্যাতনে ১৭ মাসে ৬০ জন নিহত হয়েছেন। কারাগারে মৃত্যু হয়েছে ১২৭ জন আসামির, যার মধ্যে ৪৪ জন কয়েদি ও ৮৩ জন হাজতি। সাবেক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনসহ কয়েকজনের মৃত্যু নিয়ে পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ তুলেছে তাঁদের পরিবার।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫৬টি হামলায় ১ জন নিহত ও ২৭ জন আহত হয়েছেন। এ সময় ১৭টি মন্দির, ৬৩টি প্রতিমা ও ৬৫টি বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
মাজার ও সীমান্ত হত্যা
দেশজুড়ে শতাধিক মাজারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। সীমান্তে ১১০টি ঘটনায় ৪৩ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে হামলায় ৩ জন নিহত হন।
একই সময়ে ২ হাজার ৬১৭ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ১ হাজার ১৬ জন এবং শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ৪৭৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া শ্রমিক নির্যাতন ও দুর্ঘটনায় শত শত শ্রমিক নিহত ও আহত হয়েছেন।
এইচআরএসএস জানিয়েছে, দেশের ১৫টি জাতীয় দৈনিক ও নিজস্ব উপায়ে সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতে সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে মনিরুজ্জামানসহ সংগঠনের অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Comments
Comments