সরকারি চা-বাগানে অস্তিত্বহীন শ্রমিকের নামে বরাদ্দ
![]() |
| মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার সরকারি নিউ সমনবাগ চা-বাগানের আয়তন ২ হাজার ৯৬ একর | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
সরকারি বেতন-ভাতা তোলার খাতায় নাম আছে, ভবিষ্যৎ তহবিলে (প্রভিডেন্ট ফান্ড) হিসাব আছে, নিয়মিত হাজিরা ও রেশন তোলার তালিকায় সইও আছে। কিন্তু বাস্তবে এসব শ্রমিকের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁদের কেউ বহু বছর আগে মারা গেছেন, কেউ অবসরে গেছেন, আবার কারও কোনো অস্তিত্বই নেই। অথচ পাঁচ বছর ধরে নিয়মিত তাঁদের নামে হাজিরা দেখানো হচ্ছে এবং বেতন-ভাতা তোলা হচ্ছে।
২১ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার সরকারি নিউ সমনবাগ চা-বাগানে সরাসরি গিয়ে শ্রমিকদের কাছ থেকে জানা গেছে, দ্বীপনারায়ণ, শচীন, সুজন ও কবিতা নামে বাগানের তালিকাভুক্ত এই চার শ্রমিক কয়েক বছর আগেই মারা গেছেন। কিন্তু সরকারি খাতায় তাঁরা এখনো সক্রিয় শ্রমিক হিসেবে নিবন্ধিত।
সরকারি চারটি চা-বাগানের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড়। এখানে কাজ করেন ১ হাজার ৮২০ জন শ্রমিক। এই বাগানেই এমন মৃত, অবসরপ্রাপ্ত ও অস্তিত্বহীন মিলিয়ে অন্তত ৪০ জন শ্রমিকের সন্ধান পেয়েছে চা বোর্ডের তদন্ত কমিটি। এ ছাড়া আরও ১৭০ জন ভুয়া নাম-ঠিকানায় বেতন তুলছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চা বোর্ডের ছয় সদস্যের একটি দল চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি থেকে ৯ দিন ধরে নিউ সমনবাগ চা-বাগানে অনুসন্ধান চালায়। ভবিষ্যৎ তহবিল (প্রভিডেন্ট ফান্ড), রেশন তালিকা ও নিয়োগপত্র মিলিয়ে দেখার সময় শ্রমিকদের তথ্যে বড় ধরনের অমিল ধরা পড়ে।
গত ১৩ জানুয়ারি তদন্ত শেষে ফেরার সময় বাগানের ‘ভুয়া’ শ্রমিকেরা সংঘবদ্ধ হয়ে তদন্ত দলের ওপর চড়াও হন। সেদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তাঁদের আটকে রাখা হয়।
তদন্ত দলের সদস্য মো. রাজিবুল হাসান জানান, তালিকা ধরে শ্রমিকদের খোঁজ নিতে গিয়ে এই ভুতুড়ে চিত্র সামনে আসে। শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের তালিকা ও রেশনের তালিকাসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরীক্ষা করার একপর্যায়ে ফেরার পথে অবৈধ শ্রমিকেরা তাঁদের গাড়িতে হামলা চালায়।
চা বোর্ড জানায়, এসব ভুয়া ও অবৈধ শ্রমিকের পেছনে প্রতি মাসে ভবিষ্যৎ তহবিল (প্রভিডেন্ট ফান্ড), রেশন, বাগানের জমি ভোগ করা এবং বোনাসসহ সরকারের প্রায় ১ কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে। বছরে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১২ কোটি টাকা।
তদন্ত দলের সদস্য রাজিবুল হাসান বলেন, ‘বাগানের শ্রমিক হিসেবে একবার নাম উঠে গেলে বেতন-ভাতা, রেশন, বিদ্যুৎ এবং বাগানের জমি দখল করে দোকানপাট বানিয়ে ভাড়া দেওয়া—এসবই তাঁদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা চেয়েছি, প্রকৃত শ্রমিকেরা যেন তাঁদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা পান।’
তদন্ত প্রতিবেদনে এসব অবৈধ শ্রমিককে মদদ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে বাগানের পঞ্চায়েত সমিতির বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে জানতে সমিতির সভাপতি মহনলাল রিকমুনকে মুঠোফোনে (মোবাইল) কল করা হলেও তিনি ধরেননি। এমনকি নিউ সমনবাগ চা-বাগানের ব্যবস্থাপকও এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নিউ সমনবাগ চা-বাগানের আয়তন ২ হাজার ৯৬ একর। এখানে শ্রমিকের সংখ্যা ১ হাজার ৮২০ জন। ২০২৪ সালে এই বাগানে ৭ লাখ ৯২ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। নিলামে এই চায়ের সর্বোচ্চ দাম উঠেছে ২১০ টাকা।
অন্যদিকে, হবিগঞ্জের বেসরকারি মধুপুর চা-বাগান মাত্র ৯৩০ একর জমি ও ৬৫৫ জন শ্রমিক নিয়ে ২০২৪ সালে উৎপাদন করেছে ৮ লাখ ৮৭ হাজার কেজি চা। নিলামে এই বাগানের চা বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি ২৭৭ টাকা দরে। অর্থাৎ, বেসরকারি বাগানটি অর্ধেকের কম জমি এবং তিন ভাগের এক ভাগ শ্রমিক নিয়ে সরকারি বাগানটির চেয়ে ৯৫ হাজার কেজি বেশি চা উৎপাদন করেছে। গত ১০ বছরে নিউ সমনবাগ চা-বাগানের গড় উৎপাদন ছিল ৮ লাখ ৭৪ হাজার ৫৯৭ টন।
উৎপাদন কম হওয়ার বিষয়ে নিউ সমনবাগ চা-বাগানের ব্যবস্থাপক শহিদ নেওয়াজ বলেন, ‘এর পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। যেমন—আমার শ্রমিক বেশি হলেও সবাইকে কাজে পাওয়া যায় না। কেউ অসুস্থ থাকে, আবার কেউ কাজে আসতে চায় না। তাদের সংগঠন আছে। এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইলে তারা ধর্মঘট ডেকে বসে থাকে।’
এ ছাড়া সরকারি বাগানে উৎপাদিত চায়ের মান কম হওয়ায় দামও কম পাওয়া যায়। এর জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতিকে দায়ী করে শহিদ নেওয়াজ জানান, চায়ের কুঁড়ি সংগ্রহ থেকে শুরু করে শুকানো এবং বিভিন্ন ধাপে প্রক্রিয়াজাত করতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিন্তু এখানে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না (লোডশেডিং হয়), যা চা পাতার মান ঠিক রাখার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করে।
চা বিক্রি থেকে আয় না হওয়ায় এই চারটি বাগানের শ্রমিকদের বেতন দিতে গত আট বছরে চা বোর্ডের স্থায়ী আমানত ভেঙে ৩৩ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বোর্ডের মোট স্থায়ী আমানতের পরিমাণ ১৫০ কোটি টাকা।
৩ হাজার ২৯৬ একর আয়তনের এই চারটি বাগান ২ হাজার ৫৬৮ জন শ্রমিক নিয়ে ২০২৪ সালে ১২ লাখ ৩২ হাজার কেজি চা উৎপাদন করেছে। অন্যদিকে, একই সময়ে মৌলভীবাজারের ডানকান ব্রাদার্সের মালিকানাধীন বেসরকারি করিমপুর চা-বাগান ১ হাজার ৩০২ একর জমি ও ১ হাজার ৭৯২ জন শ্রমিক নিয়ে উৎপাদন করেছে ১৫ লাখ ৬৪ হাজার ৪৫০ কেজি চা।
হিসাব অনুযায়ী, করিমপুর বাগানে মাথাপিছু শ্রমিকের গড় উৎপাদন ১ হাজার ২০১ কেজি। এর বিপরীতে সরকারি চা-বাগানগুলোতে মাথাপিছু শ্রমিকের গড় উৎপাদন মাত্র ৪৩৫ কেজি।
২ হাজার ৯৬ একরের নিউ সমনবাগ চা-বাগান ১ হাজার ৮২০ জন শ্রমিক নিয়ে চা উৎপাদন করেছে ৭ লাখ ৯২ হাজার কেজি। অন্যদিকে হবিগঞ্জের বেসরকারি মধুপুর চা-বাগান ৯৩০ একর জমি ও ৬৫৫ জন শ্রমিক নিয়ে উৎপাদন করেছে ৮ লাখ ৮৭ হাজার কেজি চা। গত ১০ বছরে নিউ সমনবাগ চা-বাগানের গড় উৎপাদন ছিল ৮ লাখ ৭৪ হাজার ৫৯৭ টন।
২০১৫ থেকে ২০২৫—এই এক দশকে নতুন চারা লাগানোর জন্য নিউ সমনবাগ চা-বাগান ১৭ কোটি টাকা পেয়েছে। কিন্তু চা বোর্ডের নথিতে দেখা যায়, এই বাগানের ৩০ শতাংশ জমি এখনো ফাঁকা, অর্থাৎ সেখানে নতুন কোনো চারা লাগানো হয়নি। বাকি ৭০ শতাংশ জমিতে থাকা চা-গাছগুলোর গড় বয়স ৪৫ বছর।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এসব চা-বাগানের বয়স ১৫০ থেকে ২০০ বছর। যেখানে প্রতিবছর নতুন চারা লাগানো (ইন-ফিল্লিং) দরকার, সেখানে বছরের পর বছর টাকা দেওয়া হলেও তা করা হয়নি। বয়স্ক গাছের চা স্বাভাবিকভাবেই মান ও স্বাদে পিছিয়ে থাকে।
বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, ছয় বছর বয়স থেকে চা-গাছ পরিপক্ব হতে শুরু করে। এরপর থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত গাছ থেকে সবচেয়ে বেশি পাতা পাওয়া যায়। ৪০ থেকে ৬০ বছর বয়সে উৎপাদন কমে আসে এবং ৬০ বছরের পর তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে যায়। তাই উৎপাদন ও মান ঠিক রাখতে নিয়মিত পুরোনো গাছের জায়গায় নতুন চারা লাগাতে হয়।
এদিকে চলতি বছরের অক্টোবরে স্থায়ী আমানত ভেঙে নেওয়া টাকা পরিশোধ করতে চা-বাগানগুলোকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ চা বোর্ড। বোর্ডের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আবুল বাসার সিদ্দিকী স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ঋণ হিসেবে দেওয়া এই টাকা চা বোর্ড বিনিয়োগ করলে বছরে অন্তত ১০ শতাংশ মুনাফা পেত। কিন্তু সাময়িক ঋণ হিসেবে দেওয়া এই অর্থ ফেরত না পাওয়ায় চা বোর্ড আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
চিঠিতে সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে বাগানের নিজস্ব আয় থেকে খরচ চালানোর সক্ষমতা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঋণ ফেরত দেওয়ার তাগিদ দিয়ে চিঠিতে বলা হয়, ভবিষ্যতে চা বোর্ড থেকে আর কোনো ঋণ দেওয়া সম্ভব হবে না।
এই বিষয়ে নিউ সমনবাগ চা-বাগানের ব্যবস্থাপক শহিদ নেওয়াজ বলেন, ‘আমি এ বছর দায়িত্ব নিয়েছি। সমস্যা এক দিনে তৈরি হয়নি। যদি প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে, তাহলে হয়তো আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব হবে।’
অনেকগুলো কারণ এখানে কাজ করে। যেমন আমার শ্রমিক বেশি হলেও সবাইকে কাজে পাওয়া যায় না। কেউ অসুস্থ থাকে, কেউ কেউ আসতে চায় না কাজে। তাঁদের সংগঠন আছে। এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইলে তাঁরা ধর্মঘট করে বসে থাকেন।
শহিদ নেওয়াজ, ব্যবস্থাপক, নিউ সমনবাগ চা-বাগান
সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্বে পরিচালিত ন্যাশনাল টি কোম্পানির অধীনে ১২টি চা-বাগান আছে। এই কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে যোগ দেন মামুনুর রশিদ। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর চা-বাগানের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু সংকট চিহ্নিত করেন।
মামুনুর রশিদ জানান, তিনি যোগদানের পর দেখেন ন্যাশনাল টি কোম্পানির ১৪ লাখ কেজি চা অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। পরে তিনি বিশেষ অনুমোদন নিয়ে সেগুলো বিক্রির ব্যবস্থা করেন।
চায়ের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে মামুনুর রশিদ বলেন, এবার চায়ের চাহিদা ভালো। আগে প্রতি কেজি চা উৎপাদনে খরচ হতো ২৩০ টাকা, অথচ বিক্রি করা হতো ১৬০ টাকায়। এবার নিলামে প্রতি কেজিতে ২৪৫ থেকে ২৫৩ টাকা পর্যন্ত দাম পাওয়া যাচ্ছে।
বাগানের চায়ের সার্বিক মান বাড়াতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০ জন প্রশিক্ষণার্থী সহকারী ব্যবস্থাপক (ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার) নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে মামুনুর রশিদ বলেন, গ্রিন টি, হোয়াইট টি, ইয়েলো টি ও পরীক্ষামূলক (এক্সপেরিমেন্টাল) চা উৎপাদনের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। কারণ, বিশ্ববাজারে এ ধরনের চায়ের দাম বাড়ছে। বর্তমানে যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের বাজার ধরার চেষ্টা চলছে।
চা-বাগানে যুগের পর যুগ ধরে টিকে থাকা কিছু সমস্যার কথাও উল্লেখ করেন মামুনুর রশিদ। এর মধ্যে রয়েছে বাগানের জমে থাকা লোকসান, শ্রমিকদের দক্ষতার অভাব, প্রশাসনে রাজনৈতিক নিয়োগ, কম বিনিয়োগ এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ।

Comments
Comments