রাজশাহীর বাটার মোড়: ৭৫ বছর ধরে স্বাদে অতুলনীয় নামহীন দোকানের জিলাপি
![]() |
| মো. সাফাত দোকানে জিলাপি বানানোর দায়িত্ব সামলান। তাঁর সঙ্গে আছেন আরও একজন কারিগর | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
দোকানের কোনো নাম নেই, নেই কোনো পরিচয়ফলক বা সাইনবোর্ড। তবুও রাজশাহীর মানুষের কাছে মচমচে ও রসালো জিলাপির আস্থার জায়গা বাটার মোড়। প্রায় ৭৫ বছর ধরে একই স্থানে তৈরি হচ্ছে এই জিলাপি। প্রতিবছর রমজান এলে এখানে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় থাকে। এবার রোজার প্রথম দিনেই দেখা গেল ব্যতিক্রমী দৃশ্য; দুপুর গড়াতেই শুরু হয়েছে ক্রেতাদের আনাগোনা।
বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটার দিকে নগরের বাটার মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, ছোট দোকানটির সামনে একের পর এক মোটরসাইকেল এসে থামছে। কেউ তিন কেজি, কেউ এক কেজি, আবার কেউ প্রয়োজনমতো জিলাপি কিনছেন। ভেতরে দুই কারিগর ব্যস্ত হাতে জিলাপি তৈরি করছেন ও ভাজছেন। চুলা থেকে নামানো গরম জিলাপি মুহূর্তেই মোড়কজাত হয়ে চলে যাচ্ছে ক্রেতাদের হাতে। জিলাপির সঙ্গে অনেকে নিমকি ও মাঠাও কিনছেন।
দোকানটির বর্তমান মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৫০ সালের দিকে এখানে জিলাপি তৈরি শুরু হয়। ব্যবসা শুরু করেছিলেন সোয়েব উদ্দিন। তখন তাঁর একমাত্র কারিগর ছিলেন জামিলী সাহা। ১৯৭২ সাল থেকে জামিলী সাহার ছেলে কালীপদ সাহা বাবার সঙ্গে কাজে যোগ দেন। ১৯৮০ সালে জামিলী সাহা মারা গেলে কালীপদ সাহাই প্রধান কারিগরের দায়িত্ব নেন। ২০১৭ সালে তাঁর মৃত্যুর পর থেকে তাঁর শিষ্য মো. সাফাত এই জিলাপি তৈরির দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে আছেন আরও একজন কারিগর।
সোয়েব উদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর চার ছেলে দোকানটি পরিচালনা করছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজনকে দোকানে ব্যস্ত সময় কাটাতে দেখা যায়। মো. শামীম বলেন, ‘এটি ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে। আমাদের জিলাপিতে কোনো ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা হয় না। রাসায়নিক ছাড়া জিলাপি ভালো করা কঠিন হলেও আমরা পূর্বপুরুষের ব্যবসা ও মান ধরে রেখেছি।’
মো. শামীম আরও বলেন, এত বছর ধরে এই দোকান আস্থার সঙ্গে টিকে থাকার মূল কারণ সততা। ভালো মানের উপকরণ ব্যবহার করায় সারা বছরই জিলাপি বিক্রি হয়, তবে রমজানে চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
দোকানটির অন্যতম কারিগর মো. সাফাত ৪৩ বছর ধরে জিলাপি বানাচ্ছেন। কাজের ফাঁকে তিনি বলেন, সব উপকরণের সঠিক মিশ্রণ ঠিক রাখতে হয়। এটি সবাই নিখুঁতভাবে ভাজতে পারে না।
সাফাতের হাতের নিপুণ ঘূর্ণিতে কড়াইয়ের গরম তেলে গোল হয়ে ফুটে ওঠে জিলাপি, এরপর তা ডোবানো হয় রসে। সেই রস টেনে নিয়েই তৈরি হয় কাঙ্ক্ষিত স্বাদ। এবার প্রতি কেজি জিলাপির দাম ২২০ টাকা। সারা বছর এখানে জিলাপি পাওয়া গেলেও রমজানে বিকেলের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দীর্ঘ লাইন দেখা যায়।
![]() |
| দুপুর গড়াতেই ক্রেতাদের ভিড়। বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটার দিকে রাজশাহী নগরের বাটার মোড়ে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান তানভিরুল হক বলেন, বাটার মোড়ের এই জিলাপি রাজশাহীর এক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। শুধু রোজার সময় নয়, সারা বছরই মানুষ এখানে আসে। তবে রোজায় এখানকার জিলাপি দিয়ে ইফতার করার আলাদা তৃপ্তি রয়েছে।
পবা উপজেলার বসুয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. শাহিন জিলাপি কিনে বের হওয়ার সময় বলেন, ‘এত ভালো জিলাপি রাজশাহীর আর কোথাও পাওয়া যায় না। ছোটবেলা থেকেই এখান থেকে কিনে খাই, এর স্বাদই আলাদা।’
দোকানটি থেকে আধা কেজি জিলাপি কিনে মো. রাফাত বলেন, ‘প্রতি রমজানে এই জিলাপি দিয়েই ইফতার শুরু হয়। বিকেলের দিকে প্রচণ্ড ভিড় হতে পারে ভেবে দুপুরেই চলে এলাম।’


Comments
Comments