অমর একুশে আজ: মাথা নত না করার ৭৫ বছর
![]() |
| প্রতিবছর শহর ও গ্রামের শিশু-কিশোরেরা ইট-কাঠ-কাগজে এভাবেই তৈরি করে শহীদ মিনার | ফাইল ছবি |
আজ মহান একুশে ফেব্রুয়ারি, শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে যারা স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি গড়েছিলেন, সেই বীর শহীদদের প্রতি আজ পরম শ্রদ্ধায় নত হচ্ছে জাতি। বাঙালির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার লড়াকু ইতিহাসের এই অনন্য অর্জনের আজ ৭৫ বছর পূর্ণ হলো। জাতিসংঘের উদ্যোগে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে আজ ভাষা শহীদদের স্মরণে দিবসটি পালন করা হচ্ছে।
শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসের কর্মসূচি শুরু করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, ঢাকায় বিদেশি দূতাবাসের প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আরও ৩০ মিনিট বিশিষ্ট ব্যক্তিরা শ্রদ্ধা জানান। এরপর শহীদ মিনার এলাকা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপতির বাণী
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে মাতৃভাষার অধিকার আদায়ে জীবন উৎসর্গকারী শহীদ রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, শফিউরসহ নাম না-জানা শহীদদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই আমাদের জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটেছিল। অমর একুশের চেতনাই আমাদের স্বাধিকার ও মুক্তিসংগ্রামে প্রেরণা জুগিয়েছে। মহান একুশের চেতনা সারা বিশ্বের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মানবোধ জাগ্রত করুক—এটাই আজকের দিনের কামনা।
প্রধানমন্ত্রীর বাণী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বিবৃতিতে দেশবাসী ও বিশ্ববাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনের এক অবিস্মরণীয় ও গৌরবের প্রতীক। ৫২-র ভাষা আন্দোলন কেবল ভাষার অধিকারই প্রতিষ্ঠা করেনি, বরং বাঙালির গণতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক চেতনার ভিত্তিকে মজবুত করেছে। তিনি আরও বলেন, ‘১৯৭১ সালের স্বাধীনতা এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে আমরা একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ ও মানবিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ প্রধানমন্ত্রী সর্বস্তরে বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
রক্তঝরা সেই ইতিহাস
১৯৫২ সালের এই দিনে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকদের ‘উর্দু হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ এমন একতরফা ঘোষণার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করে বাংলার ছাত্রসমাজ। সব বাধা উপেক্ষা করে মিছিল বের করলে পুলিশের গুলিতে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার ও শফিউরসহ অনেকে শহীদ হন। তাঁদের সেই আত্মত্যাগই পরবর্তীকালে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়।
দিবসের কর্মসূচি
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশজুড়ে বিস্তারিত কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। সরকারি, আধাসরকারি ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালন করছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনায় প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে। বেতার ও টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার এবং সংবাদপত্রে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হয়েছে। গণযোগাযোগ অধিদপ্তর রাজপথে ভ্রাম্যমাণ সংগীতানুষ্ঠান ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোতেও দিবসটি পালন করা হচ্ছে।
বাংলা একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন সংস্থা বইমেলা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। জাতীয় জাদুঘরসহ বিভিন্ন জাদুঘরে আজ শিশু-কিশোর ও শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা টিকিটে প্রবেশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া জাদুঘরে ভাষা আন্দোলনের নিদর্শনের পাশাপাশি ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের গ্রাফিতি চিত্রও প্রদর্শন করা হচ্ছে।

Comments
Comments