ঘরে-বাইরে মশার উপদ্রব, অতিষ্ঠ রাজধানীবাসী
![]() |
| মশার উপদ্রব থেকে বাঁচতে দিনের বেলায় মশারি টানিয়ে ঘুমাচ্ছেন দিনমজুরেরা। গতকাল বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
গত বুধবার রাত সাড়ে ১০টা। রাজধানীর আদাবরের একটি পাঁচতলা বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাত-পা নেড়ে মশা তাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী রাশেদুল ইসলাম। ঘরের ভেতরে মশা তাড়ানোর কুণ্ডলী (কয়েল) জ্বলছে, বসার ঘরে (ড্রয়িংরুম) মশা মারার বিষ (অ্যারোসল) ছিটানো হয়েছে, তবুও কোনো লাভ হচ্ছে না।
রাশেদুল বলছিলেন, ‘সারা দিন অফিস করে এসে একটু শান্তিতে বসব, সেই উপায় নেই। মনে হয়, ঘরে ঢুকলেই মশার ঝাঁক অপেক্ষা করে আছে। রাতে মশারির মধ্যেও ঢুকে পড়ে মশা।’
রাশেদুলের আট বছরের ছেলের পায়ে ও হাতে ছোট ছোট ঘা। বারবার চুলকাতে গিয়ে চামড়া উঠে গেছে। শিশুটির মা বললেন, ‘ও বুঝতেই পারে না কখন কামড়ায়। পরে দেখি লাল হয়ে ফুলে গেছে।’ এই পরিবারের ধারণা, এখন রাজধানীর বহু পরিবারেই একই সমস্যা চলছে।
সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ঢাকায় মশার উপদ্রব শুধু বেড়েই চলেছে এমন নয়; বরং তা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, জানুয়ারি মাসের তুলনায় চলতি ফেব্রুয়ারিতে মশার সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এই মশার ৯০ শতাংশই কিউলেক্স জাতের। আগামী মার্চ মাসে মশার উপদ্রব আরও বাড়তে পারে বলেও বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।
বাংলাদেশে সাধারণত তিন প্রজাতির মশার বিস্তার দেখা যায়—কিউলেক্স, এডিস ও অ্যানোফিলিস। এর মধ্যে কিউলেক্স মশার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। কিউলেক্স মশার কামড়ে ফাইলেরিয়া বা গোদরোগ এবং জাপানি এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত রোগ) হয়। তবে এই দুটি রোগ দেশে খুব একটা প্রবল নয়। অন্যদিকে, এডিসের কামড়ে ডেঙ্গু এবং অ্যানোফিলিসের কামড়ে ম্যালেরিয়া হয়।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানী মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, জাপানি এনসেফালাইটিসে মৃত্যুর সম্ভাব্য হার ২৫ শতাংশ। এই রোগে রাজশাহী, রংপুর ও পার্বত্য অঞ্চলে অতীতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তবে দেশে এই রোগ খুব বেশি দেখা যায় না। কারণ, এখানে এই রোগের জীবাণু ছড়াতে ভূমিকা রাখা প্রাণীর (শূকর) পালন খুব বেশি নেই।
গবেষকেরা বলছেন, তিনটি কারণে এবার মশার প্রকোপ বেড়েছে। প্রথমত, এবার শীতের তীব্রতা কম ছিল এবং স্বাভাবিক সময়ের আগেই শীত বিদায় নিয়েছে। ফলে মশার উপদ্রবও আগেভাগেই শুরু হয়েছে। দ্বিতীয়ত, নর্দমা ও জলাশয়ের দূষণ সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি। তৃতীয়ত, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে জনপ্রতিনিধি না থাকায় মশা নিধন কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার ২৬ বছর ধরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মশা নিয়ে গবেষণা করছেন। সর্বশেষ জরিপে তাঁর দল দুই ভাবে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে—মশার লার্ভা বা শূককীটের ঘনত্ব এবং পূর্ণাঙ্গ মশার উপস্থিতি গণনা করে।
লার্ভা পরীক্ষা করতে বিভিন্ন জলাশয় থেকে ২৫০ মিলিলিটার পানি তুলে তাতে লার্ভার সংখ্যা গণনা করা হয়। জানুয়ারিতে ঢাকা ও সাভারের বিভিন্ন এলাকায় সংগৃহীত পানিতে গড়ে ৮৫০টি লার্ভা পাওয়া গিয়েছিল। ফেব্রুয়ারিতে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে গড়ে ১ হাজার ২৫০-এ।
পূর্ণাঙ্গ মশার উপস্থিতি যাচাইয়ের পদ্ধতিটিও চমকে দেওয়ার মতো। একজন মানুষের হাঁটু পর্যন্ত পা ও হাত উন্মুক্ত রেখে এক ঘণ্টায় কতটি মশা কামড়াতে আসে, তা গণনা করা হয়। জানুয়ারিতে এই সংখ্যা ছিল ৪০০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০০। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে গড়ে ৮৫০।
অধ্যাপক বাশারের আশঙ্কা, মার্চে এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। তিনি বলেন, এক ঘণ্টায় পাঁচটি মশা কামড়াতে এলেই আন্তর্জাতিক মানে তা অনেক বেশি। সেখানে ঢাকায় ৮৫০টি মশা কামড়াতে আসা কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি একটি বিপৎসংকেত।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) পাঁচটি এলাকায় মশা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। সেখানেও মশা বেড়ে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টা টানা মশার ফাঁদ পেতে এই গবেষণা করা হয়। গত ১৬ থেকে ২০ জানুয়ারি রাজধানীর পাঁচটি এলাকায় ১৭ হাজার ১৫৯টি মশা পাওয়া গিয়েছিল। আর ৩০ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাওয়া গেছে ২২ হাজার ৩৬২টি। ওই পাঁচটি এলাকা হলো উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের উদ্যান (পার্ক), মিরপুর ২–এ ডিএনসিসির ভাণ্ডার শাখা দপ্তর, গুলশান ১–এর পুরোনো ভাণ্ডার শাখা দপ্তর, মিরপুর ১–এর ১০ নম্বর ওয়ার্ড সামাজিক কেন্দ্র (কমিউনিটি সেন্টার) ও মোহাম্মদপুরের ডিএনসিসির আঞ্চলিক দপ্তর।
ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় কবিরুল বাশার ও তাঁর দলের করা গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর সব জায়গায় সমানভাবে মশা নেই। কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, শনির আখড়া, শ্যামপুর, রায়েরবাজার, উত্তরা ও রাজধানী-সংলগ্ন সাভার এলাকায় মশার লার্ভা ও পূর্ণাঙ্গ মশার ঘনত্ব বেশি। অন্যদিকে শাহবাগ ও পরীবাগের মতো রাজধানীর মধ্যবর্তী এলাকাগুলোতে মশা তুলনামূলক কম পাওয়া গেছে।
রাজধানীর নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা সুমনা হক বলেন, ‘বারান্দায় দাঁড়ানো যায় না। বিকেল হলেই মশার আক্রমণ শুরু হয়।’ কলাবাগানে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী বলেন, ‘পড়ার টেবিলে বসতে গেলেই মশা ঘিরে ধরে। মশা মারার বিষ (অ্যারোসল) ছিটালে কিছুক্ষণ কম থাকে, তারপর আবার আগের মতোই উপদ্রব শুরু হয়।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবহাওয়া ও দূষণ—এই দুটিই কিউলেক্স মশা বাড়ার পেছনে বড় কারণ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক জি এম সাইফুর রহমান বলেন, আগে মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে কিউলেক্সের উপদ্রব বাড়লেও এ বছর তা ফেব্রুয়ারি থেকেই বাড়ছে। এই পরিস্থিতি আগামী কালবৈশাখী আসার আগ পর্যন্ত চলতে পারে।
সাইফুর রহমান আরও বলেন, চলতি বছর শীতকাল সংক্ষিপ্ত ছিল এবং গরম তাড়াতাড়ি শুরু হয়েছে। কিউলেক্স মশা সাধারণত আগস্ট থেকে বংশবৃদ্ধি শুরু করে। শীতে তাপমাত্রা কমে গেলে মশার শরীরের প্রাণরস (হরমোন) ও উৎসেচকের (এনজাইম) কার্যকারিতা কমে যায়। এতে মশার লার্ভা যেমন ঠিকমতো বাড়তে পারে না, তেমনি স্ত্রী মশার রক্ত খাওয়ার আগ্রহও কমে যায়। কিন্তু তাপমাত্রা বাড়লে এই প্রক্রিয়া ঠিক উল্টো হয়ে যায়; অর্থাৎ মশা দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে পারে এবং স্ত্রী মশার রক্তের চাহিদা বেড়ে যায়। বারবার ও বেশি পরিমাণে ডিম দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আমিষ (প্রোটিন) তারা রক্ত থেকেই সংগ্রহ করে। ডিম দেওয়ার এই বাড়তি ক্ষমতাই মশার দ্রুত বংশবিস্তারে প্রধান ভূমিকা রাখে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সর্বনিম্ন শূন্য দশমিক ৪ ডিগ্রি ও গড় তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তাপমাত্রা বৃদ্ধিই কিউলেক্স মশার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। তাপমাত্রার পাশাপাশি দূষণও একটি বড় কারণ। আবর্জনা, বদ্ধ জলাশয় ও নর্দমা কিউলেক্স মশার প্রধান প্রজনন কেন্দ্র।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় প্রায় আট হাজার বিঘা জলাশয় রয়েছে। এসব জলাশয়ের বড় অংশই মশার উৎপত্তিস্থল। ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, ‘একবার পরিষ্কার করলে দ্রুতই আবার আবর্জনায় ভরে যায়। জলাশয় ব্যবস্থাপনা সত্যিই খুব জটিল।’ তাঁর মতে, অনেক এলাকায় খোলা নর্দমা, স্থায়ী জলাবদ্ধতা ও আবর্জনা ফেলার নির্দিষ্ট স্থান না থাকায় কিউলেক্সের বংশবিস্তার রোধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সিটি করপোরেশনে জনপ্রতিনিধি না থাকায় মশা নিধনের কাজ ঠিকমতো হচ্ছে না বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। অনেক জলাশয়ে মাছ চাষ হওয়ায় সেখানে সিটি করপোরেশনকে কাজ করতে দেওয়া হয় না—এমন সমস্যাও রয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, জনপ্রতিনিধিরা এলাকার লোকজনকে চেনেন। কোনো সমস্যা হলে তাঁরা লোকজনকে বোঝাতে পারেন। সরকারি কর্মকর্তাদের চেষ্টার ত্রুটি না থাকলেও সব ক্ষেত্রে তাঁরা জনগণকে একইভাবে বোঝাতে সক্ষম হন না।

Comments
Comments