[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

মঙ্গলবার শপথ নিতে পারে সংবিধান সংস্কার পরিষদ

প্রকাশঃ
অ+ অ-
জাতীয় সংসদ ভবন | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আগামীকাল মঙ্গলবার সংসদ সদস্য (এমপি) হিসেবে শপথ নেবেন। একই সঙ্গে তাঁদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও আলাদা শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচিতদের দুটি শপথের বিষয়ে প্রস্তুতিও নিচ্ছে জাতীয় সংসদ সচিবালয়।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত আগামীকাল দুটি শপথ হবে কি না বা জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নে এখনই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে কি না, তা নিয়ে কিছুটা সংশয় আছে।

দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাওয়া বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, দলটি মনে করছে, বিদ্যমান সংবিধানে যা আছে সেটা অনুসরণ করাই যুক্তিসংগত হবে। বিদ্যমান সংবিধানে শুধু সংসদ সদস্যদের শপথের কথা বলা আছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ বা এ ধরনের কিছু নেই। যদি সংবিধানে কখনো এটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন এ রকম শপথের বিষয়টি আসবে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশের আইনি ভিত্তি নিয়েও শুরু থেকে বিএনপির প্রশ্ন আছে।

গণভোটে 'হ্যাঁ' জয়ী হওয়ায় এখন জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হওয়ার কথা। আগামীকাল সকালে সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হবে। বিকেলে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্রাঙ্গণে হবে মন্ত্রিসভার শপথ। এ জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় সংসদ সচিবালয়।

সংসদ সদস্যরা শপথ নেওয়ার পর শপথ বইয়ে স্বাক্ষর করেন। শপথ নেওয়ার নির্ধারিত ফরম আছে। এগুলো আসনভিত্তিক প্রস্তুত করা হচ্ছে। এ ছাড়া জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের তফসিলে আছে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়ার ফরম। সেটি অনুসারে সংসদ সদস্যরা দ্বিতীয় শপথ নেবেন, এমন প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা গত রোববার রাতে বলেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুটি শপথ হবে। একটি সংসদ সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে।

তবে গতকাল বিএনপির সূত্র জানায়, আগামীকাল দলটি থেকে নির্বাচিত ২০৯ জন এবং তাদের মিত্র দলের ৩ জন সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নাও নিতে পারেন। শেষ পর্যন্ত এমনটা হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টি ঝুলে যেতে পারে।

জুলাই জাতীয় সনদে থাকা সংবিধান সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলোর মধ্যে কয়েকটি নিয়ে ভিন্নমত আছে বিএনপির। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক কমিটি (এনসিপি) প্রায় সব বিষয়ে একমত। তারা জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চায়।

গতকাল কিশোরগঞ্জে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেছেন, 'সংস্কারের ওপর যে গণভোট হয়েছে, এটার পুরোটাই মানতে হবে। এর কোনো খণ্ডিত অংশ আমরা বাস্তবায়ন দেখতে চাই না।'

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন খাতের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে ঐকমত্য ও সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সেগুলো নিয়ে তৈরি করা হয় জুলাই জাতীয় সনদ। এর মধ্যে ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান সম্পর্কিত, এগুলো বাস্তবায়নে গণভোট হয়েছে। তাতে 'হ্যাঁ' জয়ী হয়েছে।

সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নে তিনটি স্তর। ইতিমধ্যে দুটি স্তর পার হয়েছে। প্রথমত, আইনি ভিত্তি দিতে গত বছরের ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন রাষ্ট্রপতি। বাস্তবায়নের দ্বিতীয় স্তরে গত ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট হয়েছে। এতে 'হ্যাঁ' জয়ী হওয়ায় তৃতীয় স্তর শুরু হওয়ার কথা। এই স্তরে জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা বলা আছে আদেশে।

প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কিছুটা কমানো, কিছু নিয়োগে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো, আইনসভা দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট করা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের পদ্ধতি সরাসরি সংবিধানে যুক্ত করার মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব আছে জুলাই সনদে।

অবশ্য উচ্চকক্ষের গঠন পদ্ধতিসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবে ভিন্নমতের নোট দিয়েছিল বিএনপি। দলটি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে নিজেদের সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তাবগুলো রেখেছিল।

বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, সংসদের দুই তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনে সংবিধান সংশোধন করা যায়। কিন্তু এবার নিয়মিত সংসদ নয়, সংবিধান সংস্কারে কাজ করবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ—এমনটি বলা হয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে।

দলগুলোর সঙ্গে সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় এ ধরনের একটি পরিষদ গঠনের বিষয়টি এসেছিল। তখন বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সংবিধান-সম্পর্কিত যেসব সংস্কার প্রস্তাব জুলাই সনদে আছে, সেগুলো বাস্তবায়ন হলে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসবে। নিয়মিত সংসদ সংবিধানের মৌলিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ আছে। এভাবে সংবিধান সংশোধন করা হলে পরে এটি আদালতে চ্যালেঞ্জ হতে পারে। কিন্তু যদি আগামী সংসদকে সংবিধান সংস্কারের বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়, তাহলে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ থাকবে না। তবে ওই আলোচনায় বিএনপি এ ধরনের পরিষদ গঠনের প্রয়োজন নেই—এমন মত দিয়েছিল।

এ ছাড়া সনদ বাস্তবায়নে অধ্যাদেশ নয়, একটি আদেশ জারির প্রস্তাব দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ কয়েকটি দল। অন্যদিকে বিএনপি এর বিপক্ষে ছিল। তারা বলেছিল, এ ধরনের আদেশ জারির কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন।

পরে এসব বিষয়ে বিশেষজ্ঞদেরও মত নিয়েছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। শেষ পর্যন্ত গত বছরের ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির 'জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) আদেশ' জারি করেন। সেখানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টিও রাখা হয়।

১৩ নভেম্বর এ আদেশ জারির পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ নামে একটি নতুন ধারণা, একটা পরিষদ গঠনের কথা আদেশে বলা হয়েছে। তিনি সেদিন আরও বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতি এই আদেশ জারি করেছেন। রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা আছে। সংবিধান অনুযায়ী আদেশ জারির ক্ষমতা নেই।

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে যেভাবে সংসদের প্রথম অধিবেশন ডাকা হবে একইভাবে পরিষদের প্রথম সভা ডাকা হবে। সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে পরিষদের সদস্যরা সভাপ্রধান ও উপ-সভাপ্রধান নির্বাচন করবেন।

সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার শেষ করবে এবং তা শেষ করার পর পরিষদের কার্যক্রম শেষ হবে। তবে এই সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার শেষ না হলে কী হবে তা আদেশে উল্লেখ নেই।

আদেশে বলা হয়েছে, সংস্কার পরিষদের কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সময় নির্বাচিত প্রতিনিধিরা 'পরিষদ সদস্য' হিসেবে পরিচিত হবেন। পরিষদ তার অধিবেশন ডাকা ও মুলতবি, সংবিধান সংস্কার বিষয়ক প্রস্তাব তোলার পদ্ধতি, প্রস্তাব বিবেচনা ও গ্রহণ এবং অন্য সব বিষয়ে কার্যপ্রণালী ঠিক করবে। সংস্কার পরিষদের কার্যক্রম চালানোর জন্য অন্তত ৬০ জন পরিষদ সদস্যের উপস্থিতি দরকার হবে। সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত যেকোনো প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিষদের মোট সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সিদ্ধান্ত হবে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামা অনুযায়ী সংবিধানে জুলাই জাতীয় সনদ যুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আদেশে বলা হয়েছে, সংবিধান সংস্কার শেষ হওয়ার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে জাতীয় সংসদের নিম্নকক্ষের নির্বাচনে পাওয়া ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের একটি উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে এবং কর্মপরিধি ঠিক করা হবে। উচ্চকক্ষের মেয়াদ হবে সদস্যদের শপথ নেওয়ার তারিখ থেকে জাতীয় সংসদের নিম্নকক্ষের মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত। উচ্চকক্ষ গঠনের ক্ষেত্রে যেকোনো বাধা দূর করার জন্য পরিষদ প্রয়োজনীয় বিধান তৈরি করতে পারবে এবং সরকার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করতে পারবে।

আইনসভা দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট করার প্রস্তাবে একমত হলেও এর গঠন পদ্ধতি ও ক্ষমতা নিয়ে ভিন্নমত ছিল বিএনপির। দলটি নিম্নকক্ষে পাওয়া আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টনের পক্ষে। এ ছাড়া সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতারও বিপক্ষে বিএনপি। দলটি যেভাবে উচ্চকক্ষ চায় সেটি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে রেখেছিল।

গত শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, 'আইনগত বিবেচনার চেয়েও রাজনীতিতে প্রথম এবং প্রধান বিবেচনাটা আপনাকে রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে। ...আমরা সবাইকে মনে করিয়ে দিচ্ছি, জনরায় (গণভোটে হ্যাঁ জিতেছে) হয়েছে, আবার রাজনৈতিক দলের প্রতিও জনগণের সমর্থন দেখা গেছে। ফলে এর মধ্যে একটি সমন্বয় করতে হবে। সমন্বয়ের দায়িত্বটা রাজনীতিকদের।' 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন