পুলিশ হত্যা ও স্থাপনায় হামলার ঘটনার তদন্ত শুরু হচ্ছে
![]() |
| সিরাজগঞ্জে এনায়েতপুর থানায় ১৩ পুলিশ সদস্যকে হত্যার পর একজনের মরদেহ গলায় ফাঁস দিয়ে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয় | ফাইল ছবি |
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় অনেক পুলিশ সদস্য প্রাণ হারান। পুলিশ সদর দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সে সময় ৪৪ জন সদস্য নিহত হয়েছিলেন। তবে পুলিশ কর্মকর্তারা এই সংখ্যাটি মানতে রাজি নন; তাঁদের দাবি, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
আগের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে এই বিষয়ে তদন্তের দাবি জানানো হলেও তখন তা গুরুত্ব পায়নি। তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশ সদস্যদের হত্যা এবং স্থাপনায় হামলার ঘটনাগুলো তদন্তের সবুজ সংকেত পাওয়া গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশের স্থাপনায় হামলা ও সদস্যদের হত্যার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় এসেছে। ঘটনার দেড় বছর পার হলেও এসবের তদন্ত না হওয়ায় সরকারের উচ্চপর্যায়ের কেউ কেউ বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। এখন পর্যন্ত এসব ঘটনায় মাত্র পাঁচটি মামলা হয়েছে, তবে কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। পুলিশের কিছু কর্মকর্তা এ নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলেও আগে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট হামলার আগের ও পরের ভিডিও ফুটেজ এবং আলামত সংগ্রহ করে রেখেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে সবুজ সংকেত না পাওয়ায় এত দিন পুলিশ সদর দপ্তর তদন্তের কাজ এগিয়ে নিতে পারেনি। এছাড়া আন্দোলনের সময় কারাগার ভেঙে বন্দি পালানোর ঘটনায় এখনো অনেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।
![]() |
| পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে পুলিশের বাহন | ফাইল ছবি |
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, এখন পুলিশের স্থাপনায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও সদস্য হত্যার ঘটনা তদন্ত করে মামলা করার জন্য বিশেষ বার্তা এসেছে। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি ঘটনার গভীরে গিয়ে তদন্ত করা হবে। পর্যাপ্ত আলামত থাকা সত্ত্বেও আগের সরকারের অসহযোগিতার কারণে তদন্ত ও মামলা থমকে ছিল। এখন মামলা হলে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি ফেঁসে যেতে পারেন। নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও জানিয়েছেন যে তদন্ত অবশ্যই হবে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের ধরতে বিশেষ অভিযান চালানো হতে পারে এবং এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা বা ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি ছাত্র-জনতা হত্যাকাণ্ডের মামলাগুলোর দ্রুত তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হবে।
| হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে রাজধানীর অনেক থানা | ফাইল ছবি |
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়িসহ পুলিশের স্থাপনায় হামলা চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র লুট এবং পুলিশ সদস্যদের হত্যা করা হয়। লুট হওয়া অস্ত্রের বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। এসব ঘটনায় মামলা ও তদন্তে গতি না থাকায় পুলিশের ভেতরে ক্ষোভ তৈরি হলেও কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলছিলেন না। তবে নতুন সরকার গঠনের পর পরিস্থিতি বদলেছে। সদর দপ্তরে পাঠানো বিশেষ বার্তায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, আন্দোলনের সময় পুলিশের ওপর হওয়া সব হামলার তদন্ত করতে হবে।
মামলার তদন্ত ও আসামিদের শনাক্ত করতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা ও আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে কিছু অপরাধীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানায় তিনটি ও চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় দুটি মামলা হলেও সেখানে আসামিরা সবাই অজ্ঞাতনামা। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, ‘পুলিশ হত্যা ও অস্ত্র লুটের ঘটনায় দ্রুত আরও মামলা হবে। অপরাধ কখনো পুরনো হয় না। আমাদের একাধিক টিম কাজ শুরু করেছে।’
![]() |
| ভাঙচুরের পর যাত্রাবাড়ী থানা | ফাইল ছবি |
আন্দোলনের সময় সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় ১৩ জনসহ অনেক পুলিশ সদস্য প্রাণ হারান। ঢাকার ৫০টি থানার মধ্যে ২১টিসহ সারা দেশে ২১৬টি স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। পুড়ে যায় ১৩টি থানা ও অসংখ্য টহল গাড়ি। এসব ঘটনায় মূল তদন্ত শুরু না হলেও ছায়া তদন্ত চলছে। সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, তাঁরা সিসি ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন। যদিও শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ হত্যার ঘটনায় অনেক মামলা হয়েছে, তবে সেখানে অনেক নিরীহ মানুষকে আসামি করার অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ডিএমপির কয়েকজন সাবেক ওসি জানান, তাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি না চালাতে অনুরোধ করলেও তা শোনা হয়নি। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতার হামলায় টিকতে না পেরে অনেকে পোশাক খুলে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। তাঁরা চান, সিসি ফুটেজ দেখে প্রকৃত হামলাকারীদের পাশাপাশি যারা সাধারণ মানুষ ও পুলিশ হত্যার জন্য দায়ী, তাদের সবার বিচার হোক।
![]() |
| সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় হত্যার শিকার তিন পুলিশ সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করা হয় পুকুর থেকে। আট জনের মরদেহ ছিল মসজিদের পাশে স্তূপ করে রাখা | ফাইল ছবি |
৫ আগস্ট সরকার পতনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে সারা দেশে দুই হাজারের বেশি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ৬১২টি হত্যা মামলা। অনেক পুলিশ সদস্যের নামে শত শত মামলা হয়েছে। পিবিআই বর্তমানে আলোচিত ৬৮টি মামলার তদন্ত করছে যেখানে ৯৯ জন পুলিশ কর্মকর্তা আসামি। আসামির তালিকায় সাবেক আইজিপি থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত রয়েছেন। এজাহারের তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল না পাওয়ায় তদন্তকারী কর্মকর্তারা অনেক ক্ষেত্রে বিব্রত বোধ করছেন।
অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা ঘটনার সময় নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত ছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হতে কললিস্ট ও কমান্ড সার্টিফিকেট সংগ্রহ করছে সিআইডি। এছাড়া বিভিন্ন টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিও ফুটেজ চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
![]() |
| হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পুলিশের ব্যক্তিগত সম্পদও | ফাইল ছবি |
সারা দেশে হওয়া মামলাগুলোতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সাবেক পুলিশ প্রধানসহ শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ৩৩৩টি মামলা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা রেঞ্জে ১৪৮টি, চট্টগ্রামে ২০টি, রাজশাহীতে ২২টি এবং সিলেটে ১৫টিসহ দেশের বিভিন্ন রেঞ্জ ও মেট্রোপলিটন এলাকায় আরও অনেক মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।





Comments
Comments