[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

শিশুদের সঙ্গে কৃষকের ভিন্নধর্মী একুশে ফেব্রুয়ারি উদ্‌যাপন

প্রকাশঃ
অ+ অ-

 

একুশে ফেব্রুয়ারির গল্প শুনতে শুনতে শিশুরা যাচ্ছে পাশের গ্রাম কান্তপাশায়। আজ শনিবার সকালে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চৈতন্যপুর গ্রামে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন    

শিশুদের হাতে ফুলের ঝুড়ি। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো তাদের ভাষা আন্দোলনের গল্প শোনাতে শোনাতে হেঁটে যাচ্ছেন কৃষক মনিরুজ্জামান। চৈতন্যপুর থেকে গ্রামের শিশুদের নিয়ে তিনি যাচ্ছেন কান্তপাশা গ্রামে। তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে দিতেই তিনি গল্পে গল্পে শুনিয়ে যান ইতিহাস। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে এভাবেই শিশুদের মুখে মুখে ইতিহাস শেখান তিনি।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার নিভৃত একটি গ্রাম চৈতন্যপুর। শহর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরের এই গ্রামে কোনো বিদ্যালয় নেই, নেই কোনো শহীদমিনারও। পাশের কান্তপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রয়েছে একটি শহীদমিনার। কৃষক মনিরুজ্জামানের বাসা রাজশাহী শহরের মহিষবাথান এলাকায়। তিনি চৈতন্যপুরে জমি ইজারা (লিজ) নিয়ে চাষাবাদ করেন। গোদাগাড়ীর এক ফসলি জমিতে নতুন নতুন ফসল ফলিয়ে তিনি জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন। নিজের জমিতে তিনি ফুলের চাষও করেন।

কৃষক মনিরুজ্জামান সব সময়ই গ্রামের শিশুদের নিয়ে ব্যতিক্রমী সব আয়োজন করেন। শনিবার সকাল সাতটা থেকেই শিশুরা তাঁর জমির গাঁদাফুল তুলতে শুরু করে। এবার জমি থেকে তিন ঝুড়ি ফুল তুলেছে শিশুরা। এসব ফুল নিয়ে তাদের তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে হবে। পথ চলতে চলতেই মনিরুজ্জামান তাদের শোনান একুশে ফেব্রুয়ারির ইতিহাস। এরপর শহীদমিনারে গিয়ে অন্য গ্রাম থেকে আসা শিশুদের হাতেও একটি করে গাঁদাফুল তুলে দেওয়া হয়। সেই ফুল দিয়ে তারা শহীদমিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

মাঠ থেকে ফুল তোলা এবং হেঁটে কান্তপাশা বিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে নেতৃত্ব দেয় চৈতন্যপুর গ্রামের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী তৃষ্ণা রানী সরকার, লক্ষ্মী রানী, নবম শ্রেণির লিপি সরকার, রিত্তিকা রানী, আদুরি রানী, দীপালি রানী ও ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী উর্মি রানী।

ফুল দিয়ে শহীদ মিনারে ‘২১’ তৈরি করছে চৈতন্যপুর গ্রামের শিশুরা। আজ শনিবার সকালে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার কান্তপাশা গ্রামে কান্তপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন    

মনিরুজ্জামানের নির্দেশনায় শিশুরা ফুল দিয়ে শহীদ মিনারে বাংলায় ‘২১’ তৈরি করে। বেদির চারদিকে ও সিঁড়িতে প্রদীপের মতো করে ফুল দিয়ে সাজায় তারা। শহীদ মিনারে ছড়িয়ে দেওয়া হয় ফুলের পাপড়ি। মিনারের স্তম্ভের ওপরেও প্রদীপের আদলে ফুল সাজিয়ে দেওয়া হয়।

কান্তপাশা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম শিশুদের উদ্দেশে বলেন, মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস কেবল একটি স্মরণীয় দিন নয়, এটি আত্মপরিচয়ের লড়াই। ভাষার অধিকার রক্ষা ও আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি এক জনসভায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন। তার প্রতিবাদেই বিক্ষোভে ফেটে পড়ে বাংলাভাষী মানুষ, যা চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি।

নিজের জমিতে চাষ করা ফুল দিয়ে শিশুদের নিয়ে কেন এমন আয়োজন করেন—জানতে চাইলে মনিরুজ্জামান বলেন, ভাষার কারণেই পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতি সামনে এগিয়ে গেছে। যে ভাষা যত বেশি জনপ্রিয় এবং যে ভাষায় যত বেশি মানুষ কথা বলে, সেই ভাষার মানুষ তত বেশি উন্নতি করেছে। যেমন জাপানে গবেষণা করতে গেলে প্রথম দেড় বছর সেই দেশের ভাষা শিখতে হয় এবং গবেষণাটিও তাঁদের ভাষাতেই করতে হয়। এর মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের ভাষা পৃথিবীর মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চান।

তিনি আরও বলেন, মায়ের ভাষার জন্য রক্ত দেওয়ার ঘটনা পৃথিবীতে বিরল। ভাষাসৈনিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হলে শিশুদের ভাষাজ্ঞান ও ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে হবে। তিনি শিশুদের গল্পের ছলে ভাষার জন্য আত্মত্যাগের মহান ইতিহাস শোনান, যাতে তারা সহজেই এই বয়সে ইতিহাস জানতে পারে। পরে যখন বইখাতায় এগুলো পড়বে, তখন বিষয়টি তাদের কাছে পরিচিত মনে হবে এবং মনে শ্রদ্ধাবোধ জাগবে।

অনুভূতি জানতে চাইলে শিক্ষার্থী তৃষ্ণা রানী সরকার বলে, ‘আমরা নিজের হাতে ফুল তুলেছি। মনির কাকুর মুখে একুশে ফেব্রুয়ারির গল্প শুনতে শুনতে কখন কান্তপাশায় চলে এসেছি, বুঝতেই পারিনি। জীবনে কোনো দিন এই স্মৃতি ভুলব না।’

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন