[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

মশা মারতে পারছে না ডিএসসিসি, পথ খুঁজতে বিশেষজ্ঞ কমিটি

প্রকাশঃ
অ+ অ-
মশা নিধনে ওষুধ দিচ্ছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একজন কর্মী | ফাইল ছবি

মশা নিধন সিটি করপোরেশনের অন্যতম প্রধান কাজ। রাজধানীতে মশার উপদ্রব অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো, এই কাজটি ঠিকমতো হচ্ছে না। যদিও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দাবি, মশা নিধনের কাজ নিয়মিতই চলছে। তবে সব ব্যবস্থা নেওয়ার পরও মশা কেন মরছে না, তা নিয়ে তারাও চিন্তিত।

মশার ওষুধ কার্যকর কি না, তা যাচাই করতে একটি কমিটি গঠন করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এই কমিটি মাঠপর্যায়ে তদন্ত করে দেখবে ওষুধে মশা মরছে কি না। একই সঙ্গে মশা নিধনের কর্মীরা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছেন কি না, সেটিও কমিটি যাচাই করে দেখবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানায়, মশা নিধনের কাজে বর্তমানে ১ হাজার ৩০ জন কর্মী নিয়োজিত আছেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ওয়ার্ডে সকালে সাতজন ও বিকেলে ছয়জন কর্মীর মশার ওষুধ ছিটানোর কথা। তবে মাঠের বাস্তবতা ও নাগরিকদের অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা।

দক্ষিণ সিটিতে একাধিকবার প্রশাসক বদল হলেও নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলর না থাকায় তদারকি দুর্বল হয়ে পড়েছে। আবার মশা নিধনের কাজে নিয়োজিত কিছু কর্মী রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে দায়সারাভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। পরিস্থিতির কারণে তাঁদের কিছু বলাও যায় না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য বিভাগ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন

বৃহস্পতিবার বেলা তিনটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটির ২০ নম্বর ওয়ার্ডের অধীন জাতীয় প্রেসক্লাব, সেগুনবাগিচা, বিজয়নগর, নয়াপল্টন ও কাকরাইল এলাকার মূল সড়ক ও বিভিন্ন অলিগলি ঘুরে দেখেছেন এই প্রতিবেদক। কোথাও মশা নিধন কর্মীদের দেখা পাওয়া যায়নি। সিটি করপোরেশনের সময়সূচি অনুযায়ী, এই রমজান মাসে বেলা তিনটা থেকে ইফতারের আগপর্যন্ত প্রতিটি ওয়ার্ডে ছয়জন করে কর্মীর মশা নিধনের কাজ করার কথা।

২০ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকা দুই ঘণ্টা ঘুরেও মশা নিধন কর্মীদের খুঁজে না পাওয়ার বিষয়টি দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-১-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ফারিয়া ফয়েজকে জানান এই প্রতিবেদক। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সচিবালয় এলাকায় মশা নিধনে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কর্মীরা বৃহস্পতিবার সচিবালয়ের ভেতরে মশার ওষুধ ছিটানোর কাজ করেছেন। ফলে অন্য কিছু এলাকায় তুলনামূলকভাবে কম ওষুধ ছিটানো হয়েছে। তবে এলাকা ভাগ করে মশা নিধনের কার্যক্রম নিয়মিতই পরিচালনা করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দক্ষিণ সিটির স্বাস্থ্য বিভাগের আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, দক্ষিণ সিটিতে একাধিকবার প্রশাসক বদল হলেও নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলর না থাকায় তদারকি ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। আবার মশা নিধনের কাজে নিয়োজিত কিছু কর্মী রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে দায়সারাভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমান পরিস্থিতির কারণে তাঁদের কিছু বলাও যাচ্ছে না।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে শুধু মশা নিধন কার্যক্রমের জন্য ৪৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে ব্যয় করা হয়েছে ৪৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে-পরে ১০ থেকে ১৫ দিন মশা নিধনের কাজে ঢিলেমি ছিল। বিষয়টি হয়তো প্রকাশ্যে কেউ স্বীকার করবেন না, তবে হঠাৎ মশার উপদ্রব বেড়ে যাওয়ার পেছনে এটিও একটি বড় কারণ।

গত দুই দিনে খিলগাঁও, ধানমন্ডি, যাত্রাবাড়ী, জুরাইন, লালবাগ ও চকবাজার—ঢাকা দক্ষিণ সিটির এই ছয়টি এলাকা ঘুরে দেখেছেন এই প্রতিবেদক। এসব এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা ও দোকানি মিলিয়ে ৩২ জনের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁদের প্রত্যেকেই বলেছেন, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে হঠাৎ মশার উপদ্রব অনেক বেড়ে গেছে।

ফুটপাতের দোকানি মো. রোকন বলেন, মশার যন্ত্রণায় বিকেলের পর ঠিকমতো বেচাকেনা করা যায় না। ধানমন্ডি লেকসংলগ্ন একটি বাড়ির বাসিন্দা আহমেদ রনি বলেন, সন্ধ্যার পর বারান্দায় দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
 
 
ওষুধের কার্যকারিতা যাচাইয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা দ্রুতই প্রতিবেদন দেবে। প্রতিবেদন যাতে নিরপেক্ষ হয় তাই কমিটিতে স্বাস্থ্য বিভাগের কাউকে রাখা হয়নি।
জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন

ঢাকা দক্ষিণ সিটির স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, মশার লার্ভা ধ্বংস করতে সকালে ‘টেমিফস’ নামের একটি ওষুধ ছিটানো হয়, যা ভারত থেকে আমদানি করা। আর বিকেলে উড়ন্ত মশা মারতে ‘মেলাথিউন’ নামের ওষুধ দিয়ে ধোঁয়া ছড়ানো (ফগিং) হয়, যা চীন থেকে আনা হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, পরীক্ষাগারে ওষুধের কার্যকারিতা ঠিকঠাক পাওয়া গেলেও মাঠে প্রয়োগের পর কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না। সকালে ডোবা, নালা-নর্দমা ও জমে থাকা পানিতে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। কিন্তু বিকেলের ধোঁয়া ছড়ানোর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, যেসব মশার গায়ে ধোঁয়া সরাসরি লাগছে, কেবল সেগুলোই মারা যাচ্ছে; বাকিগুলো মরছে না।

মশার উপদ্রব নিয়ে চিন্তিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান। তিনি বলেন, বেইলি রোড এলাকায় তাঁর বাসার আশপাশে নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হলেও মশার উপদ্রব কমছে না। এ কারণেই ওষুধের কার্যকারিতা যাচাইয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি দ্রুতই প্রতিবেদন জমা দেবে।

এই কর্মকর্তা আরও জানান, প্রতিবেদন যাতে নিরপেক্ষ হয়, তাই কমিটিতে স্বাস্থ্য বিভাগের কাউকে রাখা হয়নি। কমিটির প্রধান করা হয়েছে সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাকে।

দক্ষিণ সিটির হিসাব বিভাগ সূত্র বলছে, কেবল মশা নিধনেই গত পাঁচ বছরে প্রায় ১৮৮ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। তবে জনগণের করের বিপুল এই অর্থ ব্যয়ের পরও কেন মশা নিয়ন্ত্রণে আসছে না—এ নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে শুধু মশা নিধন কার্যক্রমের জন্য ৪৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে এই খাতে ব্যয় করা হয়েছিল ৪৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। দক্ষিণ সিটির হিসাব বিভাগ বলছে, কেবল মশা নিধনেই গত পাঁচ বছরে প্রায় ১৮৮ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে।

তবে জনগণের করের বিপুল এই অর্থ ব্যয়ের পরও কেন মশা নিয়ন্ত্রণে আসছে না—এ নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কার্যকর তদারকি, ওষুধের মান যাচাই এবং মাঠপর্যায়ের জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে শুধু বরাদ্দ বাড়িয়ে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।

নগরবিশারদেরা বলছেন, শুধু ধোঁয়া ছড়িয়ে (ফগিং) মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এই ধোঁয়া মূলত পূর্ণবয়স্ক মশা কমাতে কার্যকর হলেও লার্ভা বা মশার ডিম ধ্বংসে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নির্মাণাধীন ভবন, ছাদে জমে থাকা পানি, খোলা নর্দমা ও জলাবদ্ধ জায়গাগুলোয় নিয়মিত নজরদারি না থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন।

গত কয়েক বছরে রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশা নিধনে শুধু মৌসুমি ও লোকদেখানো অভিযান নয়, বছরব্যাপী সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন; বিশেষ করে ওয়ার্ডভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ, নিয়মিত তদারকি এবং মাঠপর্যায়ের জবাবদিহি জোরদার করা দরকার।

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন