[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্তে মুঠোফোনের দাম কমার সম্ভাবনা কতটা?

প্রকাশঃ
অ+ অ-
মুঠোফোন | ফাইল ছবি

চলতি বছরের শুরুতেই দেশের বাজারে মুঠোফোনের দাম বাড়ান ব্যবসায়ীরা। কোম্পানি ও মডেল ভেদে প্রতিটি মুঠোফোনের দাম ৫০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। তবে সরকারের শুল্ক ছাড়ের কারণে দাম কমতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন মুঠোফোন আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা। তাঁদের ভাষ্য, ফেব্রুয়ারি শুরুর আগেই দাম কমে আসতে পারে।

তবে বাস্তবে এই ‘দাম কমানো’ বলতে অনেকের মতে বাড়ানো দামের কিছুটা কমিয়ে আগের অবস্থায় ফেরাই বোঝানো হচ্ছে। সে কারণে শুল্ক ছাড়ের প্রকৃত সুফল গ্রাহকেরা পাচ্ছেন না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

এত দিন দেশে ‘অফিশিয়াল’ ও ‘আনঅফিশিয়াল’—এই দুই ধরনের মুঠোফোন বিক্রি হতো। তুলনামূলক কম দামের কারণে বৈধ প্রক্রিয়ায় আমদানি না করা হ্যান্ডসেটের চাহিদা ক্রেতাদের মধ্যে বেশি ছিল। ‘অফিশিয়াল’ ফোনের ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছিলেন, আনঅফিশিয়াল বাজারে চোরাই ও রিফার্বিশড সেট বিক্রি হচ্ছে, যা বৈধ ব্যবসার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের অক্টোবরে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার বা এনইআইআর চালুর ঘোষণা দেয়। এর উদ্দেশ্য ছিল অবৈধ ও অনিবন্ধিত মুঠোফোনের ব্যবহার বন্ধ করা। তবে এনইআইআর চালুর ঘোষণা আসার পর থেকেই আনঅফিশিয়াল মুঠোফোন ব্যবসায়ীরা প্রথমে এর বিরোধিতা করেন এবং পরে সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। এই পরিস্থিতিতে সরকার এনইআইআর কার্যকর করার সময়সূচি ১৫ দিন পিছিয়ে দেয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মুঠোফোনের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করেছে। পাশাপাশি মুঠোফোন সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানের উপকরণ আমদানিতে শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে দাম কমবে বলে আশা দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

ওই সময় ব্যবসায়ীরা মুঠোফোন আমদানিতে শুল্ক কমানোর দাবি জানান, যাতে আনঅফিশিয়াল ব্যবসায়ীরাও বৈধভাবে আনা হ্যান্ডসেট বিক্রি করতে পারেন। একই সঙ্গে তাঁরা সতর্ক করে বলেন, এনইআইআর চালু হলে মুঠোফোনের দাম বেড়ে যেতে পারে।

এরপর সরকার চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এনইআইআর চালু করে। একই দিনে মুঠোফোন আমদানিতে শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।

তবে ওই দিনই দেশের বাজারে অফিশিয়াল মুঠোফোনের দাম বাড়ানো হয়। ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ার কারণ হিসেবে বৈশ্বিক বাজারে এআই চিপসেটের মূল্যবৃদ্ধির কথা বলছেন। এ বিষয়ে শাওমি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার জিয়াউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আগে যে মেমোরি আমরা ১০ ডলারে কিনতাম, সেই মেমোরির দাম এখন প্রায় ৬০ ডলার। বর্তমানে ল্যাপটপসহ যেকোনো ইলেকট্রনিক পণ্যে যেখানে মেমোরি ব্যবহার হচ্ছে, সব ক্ষেত্রেই দাম বেড়েছে। নেপালে ডিসেম্বরে, ইন্দোনেশিয়ায় নভেম্বরে এবং ভারতে ডিসেম্বরে দাম বেড়েছে। বাংলাদেশেও একই কারণে দাম বেড়েছে।’

দেশে যখনই সরকার কোনো পণ্যের ওপর শুল্ক কমায়, সেই সুযোগটা ব্যবসায়ীরাই নেন। মুঠোফোনের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে। এতে একদিকে রাষ্ট্র, অন্যদিকে জনগণ—দুই পক্ষই প্রতারিত হয়েছে।

— মহিউদ্দিন আহমেদ, সভাপতি, মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মুঠোফোন আমদানির ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করেছে। একই সঙ্গে মুঠোফোন সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উপকরণ আমদানিতে শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, শুল্ক কমানোর ফলে ৩০ হাজার টাকার বেশি দামের আমদানি করা প্রতিটি মুঠোফোনের দাম প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত কমার কথা। আর ৩০ হাজার টাকার কম দামের প্রতিটি মুঠোফোনের দাম কমতে পারে প্রায় দেড় হাজার টাকা।

এনবিআরের হিসাবে, শুল্ক কমানোর ফলে ৩০ হাজার টাকার বেশি দামের আমদানিকৃত প্রতিটি মুঠোফোনের দাম সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার মতো কমার কথা। আর ৩০ হাজার টাকার কম দামের প্রতিটি মুঠোফোনের দাম কমতে পারে দেড় হাজার টাকার মতো। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতটা কমবে না।

১৪ জানুয়ারি রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব বলেন, ‘যেহেতু শুল্ক কমেছে, দাম অবশ্যই কমবে।’

দাম কমানোর কথা বলছেন মুঠোফোন আমদানিকারকরাও। এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী আমদানি করা ফোনের ক্ষেত্রে দাম কমার সম্ভাবনা সঠিক বলে তাঁরা মনে করেন। তবে দেশে সংযোজিত মুঠোফোনের ক্ষেত্রে মডেলভেদে দাম মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কমতে পারে।

মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওবি) সদস্য এবং এক্সেল টেকনোলজিসের (স্যামসাং ব্র্যান্ড) এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর সাইফুদ্দিন টিপু বলেন, দেশে সংযোজিত ফোনে ৫ শতাংশ দাম কমার কথা থাকলেও, এসটিএম বা এসকেডি পদ্ধতিতে আমদানি করা যন্ত্রাংশের শুল্ক জটিল হওয়ায় প্রকৃত প্রভাব মাত্র ০.৭৫ থেকে ০.৮৬ শতাংশের মতো হবে।

কবে দাম কমবে—এমন প্রশ্নের জবাবে সাইফুদ্দিন টিপু বলেন, ‘যাঁরা বৈধভাবে ফোন আমদানি করেন, তাঁরা যখন নতুন পণ্য খালাস করবেন, তখন এই সুবিধা পাওয়া যাবে। আশা করা হচ্ছে, চলতি মাসের শেষের দিকে বাজারে দাম সমন্বয় হবে।’

তবে বৈধ ব্যবসায়ীদের চলতি মাসের মূল্যতালিকা অনুযায়ী দেখা যায়, ৪ জিবি র‍্যাম ও ৬৪ জিবি রমের শাওমি রেডমি এ৫ ফোনের দাম ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে ২ হাজার টাকা বেড়েছে। ৮ জিবি র‍্যাম ও ২৫৬ জিবি রমের রেডমি নোট ১৪ প্রো ৪জি মডেলের দাম বেড়েছে ৫ হাজার টাকা।

৮ জিবি র‍্যাম ও ১২৮ জিবি রমের ভিভো ওয়াই২১ডি মডেলের দাম বেড়েছে ২ হাজার টাকা। স্যামসাংয়ের অন্তত দুই ডজন মডেলের দাম ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এছাড়া আরও কিছু কোম্পানির বিভিন্ন মডেলের ফোনের দামও বাড়ানো হয়েছে।

ফলে মুঠোফোন আমদানিকারকেরা যে দাম কমানোর কথা বলছেন, তা মূলত বাড়ানো দামের ওপর থেকে কমানো হবে। অর্থাৎ শুল্ক কমানোর প্রকৃত সুফল ভোক্তারা পাচ্ছেন না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘যখনই সরকার কোনো পণ্যের ওপর শুল্ক কমায়, সেই সুযোগ ব্যবসায়ীরাই নেয়। মুঠোফোনের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এতে রাষ্ট্র ও জনগণ—দুই পক্ষই প্রতারিত হয়েছে।’

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা ও বিডিজবসের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর বলেন, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে মুঠোফোন আমদানিতে শুল্ক আরও কমানো প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘যত দিন সরকার শুল্ক আরও কমাবে না, তত দিন ভোক্তারা দাম কমানোর প্রকৃত সুফল পাবেন না। এনইআইআর বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শুল্ক আরও কমানো দরকার। গ্রে মার্কেট উঠে গেলে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাবে এবং বৈধ আমদানিকারীরা কিছুটা সুবিধা পাবেন।’

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন