{getBlock} $results={3} $label={ছবি} $type={headermagazine}

ব্যাংক লোকসানি খাতের উপর প্রভাব ফেলল, মুনাফা হ্রাস ২,৭০০ কোটি টাকা

প্রকাশঃ
অ+ অ-

প্রতীকী ছবি

দেশের ব্যাংক খাতের নিট মুনাফা বড় ধাক্কা খেয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত নিট মুনাফা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বা ১৮ শতাংশ কমেছে। তবে এই বছরে ব্যাংক খাতের সুদ আয় ২৪ শতাংশ ও বিনিয়োগ আয় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। আলোচ্য সময়ে দেশি-বিদেশি তিনটি ব্যাংক এক হাজার কোটি টাকা ও বিদেশি খাতের একটি ব্যাংক তিন হাজার কোটি টাকার নিট মুনাফা অর্জনের রেকর্ড করেছে।

গত বছর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ায় এবং তাঁদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংকগুলোর লোকসান এতটা বেড়ে যায় যে পুরো খাতের নিট মুনাফায় টান পড়ে। দেশের সরকারি, বেসরকারি ও বহুজাতিক ব্যাংকগুলোর মুনাফা ও লোকসানের এই চিত্র মিলেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে।

মুনাফা থেকে ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি ও করপোরেট কর পরিশোধের পর নিট মুনাফার হিসাব করা হয়। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ব্যাংকগুলো এখন বছর শেষ হওয়ার পরও আট মাস পর্যন্ত সময় নিচ্ছে। এর কারণ হলো, নিট মুনাফার বিষয়টি বার্ষিক সাধারণ সভায় অনুমোদন করতে হয়।

জানা গেছে, এবারে ব্যাংকগুলোর বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক তদারকি বেশ জোরদার করে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি প্রায় সব ব্যাংকের বিভিন্ন ঋণ প্রকল্প সরেজমিন পরিদর্শন করে তার ভিত্তিতে কী পরিমাণ ঋণ খেলাপি দেখাতে হবে তা বেঁধে দেয়। ফলে অধিকাংশ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পায়। নির্দেশনা অনুযায়ী নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখার কারণে অনেক ব্যাংকের মুনাফায় ধাক্কা খেয়েছে, অনেকগুলো লোকসান গুনেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশের ব্যাংক খাতের সম্মিলিত নিট মুনাফা গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৪ সালে প্রথম সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে। ২০২৩ সালে যেখানে ব্যাংক খাতের সম্মিলিত নিট মুনাফা ছিল প্রায় ১৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা সেখানে ২০২৪ সালে তা কমে ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ এক বছরে ব্যাংক খাতের নিট মুনাফা কমেছে প্রায় ২ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা বা ১৮ শতাংশ।

১০ বছরে মুনাফায় তিন ধাক্কা
গত ১০ বছরের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এই সময়ে ব্যাংক খাত তিনবার নিট মুনাফায় হোঁচট খেয়েছে। ২০১৮ সালে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট শুরু হলে ঋণপ্রবাহ কমে যায়। তখন ব্যবসায়ীরা তারকা হোটেলে বসে নগদ জমার হার (সিআরআর) কমিয়ে নেন। এর মধ্যে সরকারি-বেসরকারি কয়েকটি ব্যাংকে অনিয়ম সংঘটিত হয়। ফলে ২০১৮ সালে ব্যাংক খাতের নিট মুনাফা কমে হয় ৩ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা। যদিও ২০১৭ সালে নিট মুনাফা ছিল ৯ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। এর আগে ২০১৫ ও ২০১৬ সালে নিট মুনাফা ছিল যথাক্রমে ৭ হাজার ৯২০ কোটি টাকা ও ৮ হাজার ৩১০ কোটি টাকা।

এরপর ২০২০ সালে কোভিড–১৯ তথা করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরু হলে অর্থনীতি আবার ঝিমিয়ে পড়ে। ওই বছরে ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ বেঁধে দেওয়ায় ব্যাংকগুলোর সুদ আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে ২০২০ সালে নিট মুনাফা কমে ৪ হাজার ৬৬০ কোটি টাকায় নামে, যা এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে ছিল ৬ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা।

বহু বছর ধরে লুট করার জন্য ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের হাতে ব্যাংক তুলে দেওয়া হয়েছে। হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া এত দিন বেশির ভাগ ব্যাংক কম খেলাপি ঋণ ও ভুয়া মুনাফা দেখাত
সেলিম আর এফ হোসেন, সাবেক চেয়ারম্যান, এবিবি।
এরপর ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিট মুনাফায় ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি হয়। এর মধ্যে নিট মুনাফা বেড়ে ২০২১ সালে ৫ হাজার ২০ কোটি, ২০২২ সালে ১৪ হাজার ২৩০ কোটি ও ২০২৩ সালে ১৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। আর সর্বশেষ ২০২৪ সালে তা কমে হয় ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা।

নিট মুনাফা কমিয়েছে লোকসানি ব্যাংকগুলো
২০২৪ সালে ব্যাংকগুলোর ঋণ ও বিনিয়োগ থেকে আয় বাড়লেও সার্বিকভাবে নিট মুনাফা কমে যায় কয়েকটি বড় লোকসান দেওয়ার কারণে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে সরকারি খাতের জনতা ব্যাংক। বেক্সিমকো, এস আলম, এননটেক্সসহ আরও কয়েকটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ায় ২০২৪ সালে ব্যাংকটি ৩ হাজার ৬৬ কোটি টাকা লোকসান করে। লুকানো খেলাপি ঋণ ধরা পড়ায় এবি ব্যাংকের ১ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা ও ন্যাশনাল ব্যাংকের ১ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা লোকসান হয়। আগে মুনাফা দেখালেও পরে পুনর্নিরীক্ষায় গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ১ হাজার ৩০৮ কোটি টাকার লোকসান ধরা পড়ে। এ ছাড়া গত বছরে অগ্রণী ব্যাংকের ৯৮২ কোটি, বেসিক ব্যাংকের ৮৬৩ কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৪০৫ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংকের ১২১ কোটি টাকা লোকসান হয়।

যেসব ব্যাংক ভালো করছে
কিছু ব্যাংক বড় লোকসান করলেও আবার কয়েকটি মুনাফা ধরে রাখতে পেরেছে। এর মধ্যে কোনো কোনো ব্যাংক তো রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা করে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বিদেশি ব্যাংকগুলো। বহুজাতিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক গত বছর এককভাবে ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা মুনাফা করে, যা পুরো ব্যাংক খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপর এইচএসবিসি ব্যাংকও এককভাবে ১ হাজার ৮৬ কোটি টাকা মুনাফা করে। গত বছর বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ মুনাফা করে ব্র্যাক ব্যাংক। এটির নিট মুনাফা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা, যা ২০২৩ সালে ছিল ৮২৮ কোটি টাকা। সিটি ব্যাংকের মুনাফা ২০২৩ সালের ৬৩৮ কোটি থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ১ হাজার ১৪ কোটি টাকায় ওঠে।

এ ছাড়া পূবালী, ইস্টার্ন ও প্রাইম ব্যাংকের মুনাফা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। এর মধ্যে পূবালী ব্যাংকের মুনাফা ৬৯৮ কোটি থেকে বেড়ে ৭৮০ কোটি টাকা, ইস্টার্ন ব্যাংকে ৬১১ কোটি থেকে বেড়ে ৭৫০ কোটি টাকা ও প্রাইম ব্যাংকে ৪৮৪ কোটি থেকে বেড়ে ৭৪৫ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এ ছাড়া গত বছরে সরকারি সোনালী ব্যাংক ৯৮৮ কোটি, ডাচ্–বাংলা ব্যাংক ৪৭৩ কোটি, ট্রাস্ট ব্যাংক ৩৭৩ কোটি, যমুনা ব্যাংক ২৭৯ কোটি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ৩১১ কোটি ও এনসিসি ব্যাংক ২৩২ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে।

সার্বিকভাবে জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান সেলিম আর এফ হোসেন বলেন, বহু বছর ধরে লুট করার জন্য ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের হাতে ব্যাংক তুলে দেওয়া হয়েছে। হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া এত দিন বেশির ভাগ ব্যাংক কম খেলাপি ঋণ ও ভুয়া মুনাফা দেখাত। শুধু এস আলমের ব্যাংকগুলোই নয়, আরও অনেক ব্যাংক এই কাজ করত। এখন এসব বের হয়ে আসছে। এ জন্য অনেক ব্যাংক লোকসান করছে এবং কোনো কোনোটির মুনাফা কমেছে, এটাই প্রত্যাশিত।

সেলিম আর এফ হোসেন আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে ব্যাংক চলা উচিত। কারও নিরাপত্তা সঞ্চিতি ও মূলধনে ঘাটতি থাকলে কোনোভাবে লভ্যাংশ বিতরণ করা উচিত নয়। ব্যাংক খাতে যে সংস্কার প্রয়োজন, তা সবে শুরু হয়েছে। পুরো সংস্কার না হলে ব্যাংক খাত অর্থনীতিতে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারবে না।’

একটি মন্তব্য করুন

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন