{getBlock} $results={3} $label={ছবি} $type={headermagazine}

কারো কাছে ‘সুসংবাদ’, কারো চোখে ‘প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ’

'রোডম্যাপে কমিশন প্রতিটি কাজের সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে, যার মধ্য দিয়ে জাতি নির্বাচনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে,' বলেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম।
প্রকাশঃ
অ+ অ-

নির্বাচন | প্রতীকী ছবি

রাষ্ট্র সংস্কার আগে হবে, নাকি ভোট-সেই বিরোধ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার মধ্যে নির্বাচন কমিশন ভোটের যে রোডম্যাপ দিল, তা জনমনে কতটা স্বস্তি ফেরাবে, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।

এর জবাবে মিশ্র প্রতিক্রিয়া এসেছে রাজনৈতিক দলের তরফে। ভালো-মন্দ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন সাধারণ মানুষ আর বিশ্লেষকরাও।

রোডম্যাপ ঘোষণাকে ‘সুসংবাদ’ হিসেবে দেখছেন বিএনপির নেতারা। জামায়াতের চোখে রোডম্যাপ হয়েছে ‘গতানুগতিক; কিছুটা বিভ্রান্তিমূলকও’। আর জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপি মনে করে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত না করে রোডম্যাপ ঘোষণা করাটা ‘সরকারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের শামিল’।

নির্বাচন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ রোডম্যাপকে দেখছেন ভোটের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপ হিসেবে। কেউ বলছেন, এ রোডম্যাপকে স্বস্তির কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ খুব একটা নেই।

বৃহস্পতিবার দুপুরে নির্বাচন কমিশন ভবনে ইসি সচিব আখতার আহমেদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেন। আগের দিন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিশন এ রোডম্যাপে অনুমোদন দেয়, যেখানে দুই ডজন কাজের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।

ভোটের দিন ও তফসিলের তারিখ নির্ধারণ না করা হলেও ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ভোট ধরে সাজানো হয়েছে এ পরিকল্পনা।

সংলাপ, মত বিনিময়, মিটিং, ব্রিফিং, প্রশিক্ষণ, মুদ্রণ, বাজেট বরাদ্দ, আইটিভিত্তিক প্রস্তুতি, প্রচারণা, সমন্বয় সেল, আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক থেকে যাবতীয় কর্মপরিকল্পনা মাথায় রেখে উল্লেখযোগ্য খাত ও বাস্তবায়নসূচি রোডম্যাপে স্থান পেয়েছে।

‘পরিস্থিতি বুঝে’ কর্মপরিকল্পনায় নতুন কাজ যুক্ত করার সুযোগ থাকার কথাও বলেছে কমিশন। 

যা বলছেন সাধারণ মানুষ
মহাখালী এলাকার চা দোকানি রতন শিকদার শান্ত ফেব্রুয়ারিতে ভোট হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তিনি বলেন, 'যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যমত্যের জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি, সেহেতু নির্বাচন আরও কিছুটা দেরি হতে পারে।' 

ব্যবসায়ী সাঈম হাসানের মতে, প্রধান উপদেষ্টা ঘোষিত সময়ের কাছাকাছি ভোট হবে। তবে তার শঙ্কা কিছুটা ভিন্ন। তিনি বলেন, 'আওয়ামী লীগ নির্বাচন নিয়ে নানা কৌশল আমাদের রাজনৈতিক মহলকে শিখিয়ে গেছে। সেগুলোর ইমপ্লিমেন্টেশন হয় কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।' 

এদিকে প্রকৌশলী সাদমান খান দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনের সম্ভাবনা কম দেখছেন। তার ভাষ্য, 'নির্বাচন আয়োজন নির্ভর করছে দেশের স্থিতিশীলতার উপর। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি একেবারেই স্থিতিশীল নয়৷'

নিরাপত্তাকর্মী মো. হারিছ বৃহস্পতিবার রাতে বলছিলেন, 'নির্বাচন হলেই কি, আর না হলেই কি? দেশ তো চলছে। এর থেকে ভালো-খারাপ কিছুই আর আশা করি না।' 

রাজনৈতিক দলগুলো যা বলছে
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা হওয়ায় বিএনপি ‘খুশি’ বলে মন্তব্য করেছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বৃহস্পতিবার বিকালে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, 'রোডম্যাপ ঘোষণা হয়েছে। আমরা এতে আশাবাদী হয়েছি। এ রোডম্যাপ থেকে বোঝা যায় যে, নির্বাচন কমিশন ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। মূল কথা হচ্ছে যে, আমরা খুশি, উই আর হ্যাপি।' 

রোডম্যাপ ঘোষণাকে জনগণের জন্য সুসংবাদ হিসেবে দেখছেন কিনা জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, 'জি।' 

তবে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার রোডম্যাপকে গতানুগতিক এবং ‘কিছুটা বিভ্রান্তিমূলক’ আখ্যা দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, 'জাতির প্রত্যাশা আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠাতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে। কিন্তু কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে; তা এখনো ঠিক হয়নি।এমনকি জুলাই জাতীয় সনদের আইনি ভিত্তি এবং এর বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত হয়নি। এ অবস্থায় রোডম্যাপ ঘোষণা অপরিপক্ক ও আংশিক। এতে জনপ্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি।' 

এদিকে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুর ইসলাম আদীব বলেন, 'আশা করেছিলাম, নির্বাচনি রোডম্যাপ প্রকাশের আগেই সরকারের সংস্কার বিষয়ক পর্যাপ্ত অগ্রগতি অর্জনের রোডম্যাপ প্রকাশ করা হবে। কিন্তু আমরা হতাশার সঙ্গে লক্ষ্য করছি, অজানা কারণে ঐকমত্য কমিশনের পরবর্তী দফার বৈঠক পেছানো হয়েছে এবং এখনো জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দেওয়ার উপায় নির্ধারিত হয়নি।' 

তিনি বলেন, 'জুলাই সনদ চূড়ান্ত না করে এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত না হয়ে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা ঐকমত্য কমিশন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের শামিল। আমরা মনে করি ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য নির্বাচন আয়োজন প্রয়োজন, আমরা কোনোভাবেই নির্বাচনবিরোধী নই। সেদিক থেকে রোডম্যাপ ঘোষণা ইতিবাচক। যত দ্রুত জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি হবে, তত দ্রুত নির্বাচনের দিকে যাওয়া যাবে। সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত না করে নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ ভবিষ্যতে সংকট তৈরি করতে পারে, যার দায় সরকারকেই নিতে হবে।' 

আদীব বলেন, 'ঐকমত্য কমিশনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক দলগুলো গণপরিষদ বা সংবিধান সভা কিংবা গণভোটের কথা বলেছিল। সেই আলোচনা এখনও চলমান। সরকার জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত আগেই নিয়ে ফেলেছে। তাহলে আগামী সপ্তাহে গণপরিষদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে যে আলোচনা দলগুলোর সঙ্গে হওয়ার কথা তা পারস্পরিক সংগতিপূর্ণ নয়।' 

যা বলছেন বিশ্লেষকরা
সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খানের মতে ‘যদি, কিন্তু, তবে’ নিয়ে নির্বাচনের রোডম্যাপ রাজনৈতিক অঙ্গন বা জনমনে স্বস্তি ফেরাতে পারবে না।

বিকালে তিনি বলেন, 'যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের পরিস্থিতি থাকতো, তাহলে একটা কথা ছিল, কিন্তু জাময়াতে ইসলামী পিআর পদ্ধতির কথা বলছে। ইসলামী দলগুলোরও একই সুর। এদিকে এনসিপি গণপরিষদ নির্বাচনের কথা বলছে। তারা নির্বাচন বর্জনের হুমকিও দিচ্ছে। আওয়ামী লীগতো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না, তাদের বিচার করা হচ্ছে। তাহলে কী বিএনপি শুধু নির্বাচন করবে? এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের রোডম্যাপ কতটুকু স্বস্তি ফেরাবে, তা নিয়ে বিশদ ভাবনার জায়গা রয়েছে।' 

রোডম্যাপে রাজনীতি কিংবা জনমনে স্বস্তি ফিরবে না বলে মনে করছেন সাবেক সচিব আব্দুল আওয়াল মজুমদারও।

তিনি বলছিলেন, 'নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব এখনো রয়েছে। তাই এখনই এ রোডম্যাপ রাজনৈতিক অঙ্গন ও জনমনে স্বস্তি ফেরাবে বলে মনে হচ্ছে না। আমি জাতীয় পর্যায়ের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছি, তারাও এরকমটা মনে করছেন। তাই এখনই এ বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না। পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সার্বিক বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে।' 

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য মো. আব্দুল আলীম মনে করছেন, এ রোডম্যাপ জনমন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে 'কিছুটা হলেও স্বস্তি ফেরাবে।

তিনি বৃহস্পতিবার রাতে বলেন, 'প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় ঘোষণা করলেন, এরপর আমরা দেখলাম নির্বাচন কমিশনে একটি চিঠি গেল। সে অনুযায়ী কমিশন রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। রোডম্যাপে কমিশন প্রতিটি কাজের জন্য একটি সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে, যার মধ্য দিয়ে জাতি একটি নির্বাচনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে।; 

নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী বৃহস্পতিবার রাতে বলেন, 'মোটামুটি আমার মনে হয় কাজের সময়সীমার যে পরিধিটা বলছে, সে কাজগুলো হলে নির্বাচন সহজেই করা যায়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দায়িত্ব তো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর ন্যাস্ত করা হয়েছে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসার বিষয়টি ইলেকশন কমিশনকেই দেখতে হবে। প্রার্থীদের প্রচারণা চালানোর সময় যেন কোনো অসুবিধা না হয়, মবের মুখে না পড়েন, সেটাও কমিশনকে মনিটর করতে হবে। শুধু আইনশৃঙ্ক্ষলা বাহিনীর ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। পুরো পরিস্থিতির ওপর কমিশনকেই মনিটর করতে হবে।' 

একটি মন্তব্য করুন

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন