বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক আইনজীবীদের ইংল্যান্ড-ওয়েলসে নিবন্ধনে কড়া শর্ত
৩০ সেপ্টেম্বর বিএসবির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়
বাংলাদেশসহ বিদেশে যোগ্যতা অর্জনকারী আইনজীবীদের ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ব্যারিস্টার হিসেবে স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় নতুন কড়াকড়ি আরোপ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বার স্ট্যান্ডার্ডস বোর্ড (বিএসবি)।
বিপুলসংখ্যক আবেদন জমে থাকাসহ আবেদনকারীদের একটি অংশের ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বাস্তবে আইন পেশায় কাজ করার নিশ্চিত পথ না থাকার প্রেক্ষাপটে নতুন আবেদন গ্রহণে সাময়িক বিধিনিষেধ দিয়েছে সংস্থাটি।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিএসবির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আপাতত শুধু ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে আইন পেশায় প্রবেশের নিশ্চিত প্রমাণ দেখাতে সক্ষম আইনজীবীদের কাছ থেকে স্থানান্তরিত যোগ্য আইনজীবী হিসেবে নতুন আবেদন গ্রহণ করা হবে।
বিএসবি বলছে, আগের বিধিমালার কারণে এমন বিপুলসংখ্যক আবেদন এসেছে, যাঁদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে আইন পেশায় কাজ করবেন না। এতে আবেদনের বড় জট তৈরি হয়েছে।
বিএসবির মহাপরিচালক ফিল গোল্ডিং বলেছেন, ব্যবস্থাটিকে এমনভাবে পরিবর্তন করা প্রয়োজন, যাতে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বাস্তবেই আইন পেশায় কাজ করবেন—এমন আবেদনকারীদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া যায়। এতে আবেদনের জটও কমবে। তবে প্রয়োজনীয় দক্ষতা আছে আর ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে আইন পেশায় কাজ করার বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা রয়েছে—এমন বিদেশি আইনজীবীদের নিরুৎসাহিত করা এ সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য নয়।
বিএসবির ২০২৩–২৪ নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বর্ষে স্থানান্তরিত যোগ্য আইনজীবী হিসেবে মোট ৫৮৬টি আবেদন জমা পড়েছিল। সম্মিলিতভাবে মোট আবেদনের অর্ধেকের বেশি এসেছিল বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান থেকে। তখন প্রতি মাসে গড়ে ৫০টির বেশি নতুন স্থানান্তরিত যোগ্য আইনজীবীর আবেদন জমা পড়েছিল।
তবে বিএসবির এই প্রতিবেদনে শুধু বাংলাদেশ থেকে ঠিক কতটি আবেদন জমা পড়েছিল, তার নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
বিএসবির কর্মকর্তাদের বরাতে আইনবিষয়ক সংবাদমাধ্যম লিগ্যাল ফিউচারসের প্রতিবেদনে বলা হয়, একপর্যায়ে বিদেশি স্থানান্তরিত যোগ্য আইনজীবীর আবেদনের বেশির ভাগ বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আসছিল। ২০২৩ সালের শেষ দিকে বিএসবির কাছে প্রায় ৬৫০টি আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
বিএসবির তথ্যের ভিত্তিতে লিগ্যাল ফিউচারস জানায়, গত দুই বছরে সংস্থাটি ৯৫৭টি নতুন স্থানান্তরিত যোগ্য আইনজীবীর আবেদন পেয়েছে। ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত এক বছরে ৭০০টির বেশি আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এই সংখ্যা আগের কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি।
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১–২২ বর্ষে ৩২৫টি স্থানান্তরিত যোগ্য আইনজীবীর আবেদন আসে। ২০২৪–২৫ বর্ষে তা ৬৩৪টিতে পৌঁছায়। অর্থাৎ আবেদন বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। সংবাদপত্রটি বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান থেকে আবেদন বৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করে।
কেন বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়া থেকে এত আবেদন আসে, তার সুনির্দিষ্ট কারণ বিএসবি এখনো নিশ্চিতভাবে জানে না।
২০২৩–২৪ বর্ষের প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছিল, বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান থেকে কেন এত বেশি আবেদন আসে, অঞ্চলটি কেন ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তা তাদের কাছে স্পষ্ট নয়। বিষয়টি বুঝতে গবেষণা শুরু করার কথা জানিয়েছিল বিএসবি।
২০২৩ সালের এপ্রিলে বিএসবির এক ঘোষণায় পরীক্ষায় অসদুপায়ের অভিযোগ তদন্তের জন্য বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে বার প্রশিক্ষণের ইন্টারনেটভিত্তিক পরীক্ষা অবিলম্বে স্থগিত করতে বলা হয়।
সিদ্ধান্তটি কেন্দ্রীয় দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলাবিষয়ক পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব লিখিত ইন্টারনেটভিত্তিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল।
পরে বিষয়টি শুধু বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরের মাসে (মে) বিএসবি সিদ্ধান্ত নেয়, ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে বিশ্বের কোনো দেশেই বার প্রশিক্ষণের পরীক্ষা ইন্টারনেটভিত্তিক নেওয়া যাবে না।
তখন সংস্থাটি বলেছিল, পেশাগত এই পরীক্ষার মূল্যায়নের নিরাপত্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে আপস করা সম্ভব নয়।
একই বছরের নভেম্বরে বিএসবি আরও জানায়, পরীক্ষায় অসদুপায়ের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ায় ইন্টারনেটভিত্তিক পরীক্ষা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তটি অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বহাল থাকবে।
বিদেশে লিখিত পরীক্ষা এখন তত্ত্বাবধানের মধ্যে থাকা নির্ধারিত কেন্দ্রে, সাধারণত ব্রিটিশ কাউন্সিলের অনুমোদিত স্থানে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
নতুন ব্যবস্থায় বিদেশে যোগ্যতা অর্জন করলেই আপাতত স্থানান্তরিত যোগ্য আইনজীবী হিসেবে আবেদন করা যাবে না।
বিএসবির নির্দেশনা অনুযায়ী, আবেদনকারীকে অন্তত একটি শর্ত পূরণ করতে হবে। অনুমোদিত শিক্ষানবিশকাল প্রদানকারীর কাছ থেকে এমন শিক্ষানবিশকালের প্রস্তাব থাকতে হবে, যা ২০২৯ সালের ১ জানুয়ারির আগে শুরু হবে। অথবা এমন টেন্যান্সি বা চাকরির প্রস্তাব থাকতে হবে, যেখানে কাজ করতে বার অব ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলসের অনুশীলন সনদ প্রয়োজন।
কোনো যোগ্য বিদেশি আইনজীবী শুধু ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের বারে স্থানান্তরিত হওয়ার ইচ্ছা দেখিয়ে বর্তমানে নতুন আবেদন করতে পারবেন না। তাঁকে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বাস্তবে আইন পেশায় প্রবেশের নিশ্চিত প্রমাণ দিতে হবে।
তবে সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, আইসল্যান্ড ও লিশটেনস্টাইনে যোগ্যতা অর্জনকারী আইনজীবীদের ক্ষেত্রে এই নতুন শর্ত প্রযোজ্য হবে না। পারস্পরিক স্বীকৃতির ব্যবস্থার আওতাধীন ব্যক্তিগত মামলা এবং ইংল্যান্ড ও ওয়েলসভিত্তিক আন্তর্জাতিক সালিসি মামলাও এই সিদ্ধান্তে প্রভাবিত হবে না বলে জানিয়েছে বিএসবি।