পদ্মা ট্রিবিউন | বাংলা নিউজ পেপার
বাংলাদেশ রাজনীতি বিশ্ব বাণিজ্য মতামত খেলা বিনোদন চাকরি জীবনযাপন ভিডিও

৫৭ অভিবাসীর মৃত্যুর পর সেউতা সফরে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী

এই পরিস্থিতিতে সেউতা সফরে যান স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মরক্কোর দিক থেকে সাঁতরে সীমান্ত বেড়া পেরিয়ে স্পেনের ছিটমহল সেউতায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা
মরক্কোর দিক থেকে সাঁতরে সীমান্ত বেড়া পেরিয়ে স্পেনের ছিটমহল সেউতায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা | ছবি: সংগৃহীত

মরক্কো সীমান্ত পেরিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় স্পেনের ছিটমহল সেউতায় ঢুকে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ। এ সময় সীমান্ত পার হতে গিয়ে অন্তত ৫৭ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সেউতা সফরে যান স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ।


আজ শুক্রবার সাংবাদিকদের কাছে ৫৭ অভিবাসীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন সেউতার আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট হুয়ান জেসুস ভিভাস। তবে কীভাবে তাঁরা মারা গেছেন, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।


হুয়ান জেসুস বলেন, স্থল ও জলপথ ব্যবহার করে মরক্কো থেকে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ সেউতায় প্রবেশ করেছেন। অনেকেই সমুদ্রের পানিতে থাকা সীমান্ত বেড়া সাঁতরে পার হয়েছেন।


স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আজ সেউতা সফর করেন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁর সরকার সব ধরনের প্রস্তুতি ও সক্ষমতা কাজে লাগাচ্ছে।


সীমান্ত পার হওয়ার এই ঘটনাকে স্পেনের ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্বের ‘লঙ্ঘন’ বলে মন্তব্য করেছেন সানচেজ। তিনি বলেন, চলতি সপ্তাহে আসা অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবার পর্যন্ত প্রায় ২৫ হাজার মানুষকে সেউতা থেকে মরক্কোয় ফেরত পাঠানো হয়েছে।


সেউতায় সিভিল গার্ড কর্মকর্তাদের প্রতিনিধিত্বকারী স্থানীয় শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা রশিদ সাবিহি এই পরিস্থিতিকে ‘মারাত্মক মানবিক সংকট’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। রশিদ বলেন, অভিভাবকহীন শিশুসহ হাজার হাজার অভিবাসী ফুটপাতে ঘুমাচ্ছে। আর অনেকেই উদ্দেশ্যহীনভাবে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।


একটি বার্তা সংস্থাকে রশিদ বলেন, মারা যাওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই পানিতে ডুবে গেছেন। মরক্কো সীমান্তের কাছের একটি শহরতলির সৈকত হলো তারাজাল। এই সৈকতের বাঁধ টপকে পার হওয়ার সময় সীমান্তের তল্লাশিচৌকিতে পদদলিত হয়েও কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে।


সেউতায় প্রবেশের ফটকগুলোতে মরক্কোর সরকার জলকামান মোতায়েন করেছিল। তারা মানুষকে পেছনে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় ক্ষুব্ধ লোকজনের সঙ্গে সংঘর্ষের পর সেখানে একটি বাস ও সাতটি গাড়ির পোড়া ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকতে দেখা গেছে।


বৃহস্পতিবারের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বিপুলসংখ্যক মানুষ সৈকতের সীমান্ত বেড়া পার হয়ে স্থানীয় রাস্তায় হেঁটে আসছেন। তাঁদের বেশির ভাগই মরক্কোর নাগরিক। তাঁদের মধ্যে তরুণদের সংখ্যাই বেশি। তবে নারী ও ছোট শিশুদের নিয়ে অনেক পরিবারও ছিল।


উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের আরেকটি ছিটমহল হলো মেলিলা। সেউতা ও মেলিলা—এই দুটি শহর মিলে আফ্রিকার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসংযোগ তৈরি করেছে। ইউরোপে পাড়ি জমাতে চাওয়া মানুষেরা প্রায়ই এই দুই সীমান্ত দিয়ে দলে দলে ঢোকার চেষ্টা করেন।


সেউতায় পৌঁছাতে অভিবাসীরা অনেক সময় মরক্কোর ফনিদেক শহর থেকে সাঁতার কাটেন। স্প্যানিশ ভূখণ্ডে পৌঁছাতে তাঁদের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। আবার অনেকেই কাছের বেলইউনেশ শহর দিয়েও পার হওয়ার চেষ্টা করেন। কারণ, ওই পথে দূরত্ব কিছুটা কম।


আকস্মিক সীমান্ত পার হওয়ার এই হিড়িকের সঙ্গে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক একটি রায়ের যোগসূত্র দেখছে সেউতা কর্তৃপক্ষ। চলতি মাসের শুরুতে দেওয়া ওই রায়ে বলা হয়েছিল, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া সমুদ্রপথে আসা অভিবাসীদের কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠাতে পারবে না। তবে সীমান্ত বেড়া টপকে বা স্থলপথে স্পেনে প্রবেশকারীদের ক্ষেত্রে এই রায় প্রযোজ্য নয়।


শুক্রবার সানচেজ বলেন, আদালতের রায় নিয়ে মাফিয়ারা গুজব ছড়িয়েছে। এ কারণেই অভিবাসীদের এমন ঢল নেমেছে। তিনি আরও বলেন, ‘মরক্কোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে আমরা জানতে পেরেছি, মানব পাচারকারী চক্রগুলো সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়কে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করেছে। গত কয়েক ঘণ্টায় সেই মনগড়া ব্যাখ্যা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।’


তবে এমন ঢলের পেছনে ওই রায়ের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন মরক্কোর অধিকারকর্মীরা। তাঁদের যুক্তি, বেশির ভাগ অভিবাসীই এ ধরনের আইনি সিদ্ধান্তের কথা জানতেন না।


ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন শুক্রবার সেউতার পরিস্থিতিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উরসুলা বলেন, ‘আমাদের নিয়মকানুন না মেনে কাউকে আমাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নে ঢুকতে দিতে পারি না। বিপজ্জনক এই পারাপার অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। গুঁড়িয়ে দিতে হবে পাচারকারী চক্রের নেটওয়ার্ক। আমাদের নিয়মের মধ্যে থেকেই অভিবাসীদের দ্রুত ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।’


এদিকে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেছেন, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া কোনো অভিবাসীকে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে ঢুকতে না দেওয়ার ব্যাপারে স্পেনের যে অবস্থান, তাকে তিনি স্বাগত জানান। তিনি আরও জানান, তাঁর সরকার স্পেন সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে।


ফ্রান্সও স্পেন ও মরক্কোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন, প্রয়োজনে স্পেনকে সহায়তা করতে প্রস্তুত প্যারিস। এ ক্ষেত্রে ইউরোপের সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের মাধ্যমেও এই সহায়তা দেওয়া হতে পারে।


এর আগে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেন, সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতির পর স্পেনের সঙ্গে নিজেদের সীমান্তে কড়াকড়ি বাড়াবে ফ্রান্স।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে নুনেজ বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে স্পেন সীমান্তে অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে নিবিড় তল্লাশির জন্য দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণকারী সীমান্তরক্ষী বাহিনী মোতায়েনেরও ঘোষণা দিয়েছেন নুনেজ।


এই সীমান্ত সংকটের প্রভাব ইতিমধ্যে ইতালিতেও পড়েছে। অভিবাসীদের আরেকটি প্রধান গন্তব্য হলো দেশটি। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি স্পেনের সঙ্গে উন্মুক্ত সীমান্তের শেনজেন চুক্তি স্থগিত করার হুমকি দিয়েছেন। যদিও স্পেনের সঙ্গে ইতালির কোনো সরাসরি সীমান্ত নেই। মেলোনি বলেন, নিজেদের সীমান্ত রক্ষা ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হবে।


সেউতার আঞ্চলিক সরকারের প্রধান হুয়ান জেসুস জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি অবস্থা ঘোষণার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। ‘সীমান্তের অখণ্ডতা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে’ আরও পুলিশ পাঠানো এবং সীমান্তে সেনাবাহিনী মোতায়েনেরও দাবি জানান তিনি।


তবে জাতীয় জরুরি অবস্থা জারির এই দাবি নাকচ করে দিয়েছে স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা বলছে, এ ধরনের পদক্ষেপের আওতায় অভিবাসন সংকট পড়ে না। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত সহায়তা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা।

বিশ্ব থেকে আরও পড়ুন

How did this article make you feel?

Related Articles

0 Comments

No comments yet. Be the first to share your thoughts!

Leave a Comment

Moderated — may take a moment.