তেল-কয়লার চেয়ে খরচ কম, সৌরবিদ্যুতে জোর
নতুন বিএনপি সরকার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। এ খাতকে নানা সুবিধা দিচ্ছে।
২০২৪ সালে পাবনার ভবানীপুরে চালু হয় ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র। পদ্মার ধু ধু বালুচরে ৪০০ একর জমির ওপর কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়েছে। দিনের বেলা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি জাতীয় গ্রিডে সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ করে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়া এবং সরবরাহসংকটের কারণে যখন দেশের জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে, খরচ বেড়ে গেছে, তখন পদ্মার চরের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র মানুষকে বিদ্যুৎ দিচ্ছে। সৌরবিদ্যুতের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে জ্বালানি আমদানির প্রয়োজন হচ্ছে না, পরিবেশদূষণও হচ্ছে না। দামও তুলনামূলক কম।
ভবানীপুরের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি করেছে প্যারামাউন্ট গ্রুপ। ২০২১ সালে তাদের সঙ্গে করা ২০ বছরের ক্রয়চুক্তিতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়ছে সাড়ে ১১ সেন্ট, যা এখন প্রায় ১৩ টাকা। অন্যদিকে, ফার্নেস তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি ইউনিটে ব্যয় ২৮ টাকার বেশি। কয়লাবিদ্যুতের খরচ প্রতি ইউনিট ১৫ টাকার আশপাশে। কয়লায় পরিবেশদূষণের ঝুঁকিও আছে।
অন্যদিকে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল দরপত্র ছাড়াই। তখন সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের সরঞ্জামের দামও বেশি ছিল। ফলে বিদ্যুতের দাম বেশি পড়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দরপত্র ডেকে প্রতি ইউনিট ৮ টাকার কম দরে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি করা গেছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, কয়লা ও তেলের চেয়ে এই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী।
সৌরবিদ্যুতের এত সুবিধার পরও বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর ভর করে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে। কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যথেষ্ট জোর দেওয়া হয়নি। বিপাকে পড়ে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে কিছুটা জোর দেওয়া হয় সৌরবিদ্যুৎ খাতে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মোট ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি হয়, যার অধিকাংশই ছিল জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক। সব মিলিয়ে এখন বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার ৩৪৭ মেগাওয়াট। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির (সৌর, পানি ও বায়ু) ১৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৮৯ মেগাওয়াট। গ্রিডে যুক্ত মোট বিদ্যুতের মাত্র ৪ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য খাত থেকে। পিডিবির তথ্য বলছে, ২০১২-১৩ অর্থবছরেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
অবশ্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য বলছে, অনেক কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠান ছাদে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। ফলে বর্তমানে গ্রিডে যুক্ত আছে ১ হাজার ৪৯২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। অবশ্য এটি ধরে হিসাব করলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা মাত্র ৫ শতাংশ।
২০২১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের কথা ছিল। তা সম্ভব হয়নি। এরপর ২০২৫ সালের মধ্যে এ লক্ষ্য অর্জনের কথা বলা হয়। সেটাও হয়নি। কারণ, এ খাতে বিনিয়োগ কম হয়েছে। ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল সময়ে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলার (বর্তমান মূল্যে ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগ হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বিনিয়োগ হয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে।
নতুন বিএনপি সরকার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। এ খাতকে নানা সুবিধা দিচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমান সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আগামী গ্রীষ্মের আগে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতেই ছাদবিদ্যুতে জোর দেওয়া হয়েছে। এতে অন্তত গত গ্রীষ্মের মতো ভোগান্তি হবে না। ছাদের পাশাপাশি সরকারি জমিতে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহ আছে। ইতিমধ্যে বাগেরহাটের রামপালে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নির্ধারিত জমিতে ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন করেছে সরকার।
আওয়ামী লীগ সরকার বিদেশি গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভর করে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র করেছে। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমতে থাকে। ডলারের দাম বাড়ে এবং দেশে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে।
তখন বিদ্যুৎকেন্দ্র অনেক থাকলেও মানুষকে লোডশেডিংয়ে ভুগতে হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিতে বাধ্য হয় তৎকালীন সরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি করতে সম্মতিপত্র দেওয়া হয়।
বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রথমে বিনিয়োগকারীকে সম্মতিপত্র দেয় সরকার। এরপর হয় বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে যে ৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মতি দেওয়া হয়, সেগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাতিল করা হয়। ওই সময় যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মতিপত্র দিয়েছিল দরপত্র ছাড়া। ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর বিশেষ ক্ষমতা আইন রহিত করেন আদালত। তাই ওই কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে চুক্তি করার সুযোগ নেই।
২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর ৩১টি কোম্পানিকে চিঠি দিয়ে পিডিবি জানায়, তাদের কাছ থেকে কোনো বিদ্যুৎ কিনবে না। এরপর ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে সরকারি সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ১৫টি কোম্পানি উচ্চ আদালতে ১১টি রিট দায়ের করে। এর মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকার কয়েক দফা দরপত্র ডেকে গত ২৫ জানুয়ারি ৭টি ও ২৯ জানুয়ারি ৪টি—মোট ১১টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি করে। সেগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ৮১৮ মেগাওয়াট।
নতুন বিএনপি সরকার আসার পর এখন পর্যন্ত ১০টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তবে দরপত্র জমার সময় একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে। ফলে কয়টি দরপত্র জমা পড়েছে, কারা আগ্রহ দেখিয়েছে, তা জানা যায়নি।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদেশি ঋণে সার্বভৌম গ্যারান্টি দেওয়া হতো। অন্তর্বর্তী সরকার তা বাতিল করে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সূত্র বলছে, সার্বভৌম গ্যারান্টি না থাকায় বিদেশিরা ঋণ দিতে চায় না। দুই বছর ধরে জমি কিনতেও সমস্যা হচ্ছে। নতুন যারা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ পেয়েছে, তাদের অভিজ্ঞতা কম। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সরঞ্জাম আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। সব মিলিয়ে নতুন চুক্তি করা সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দু-এক বছরে বিদ্যুৎ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দরপত্রে অংশ নিয়ে তিনটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ পেয়েছে কনফিডেন্স গ্রুপ। গ্রুপটির চেয়ারম্যান ইমরান করিম প্রথম আলোকে বলেন, জমি কেনা ও ব্যাংকের অর্থায়ন নিয়ে কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে। উৎপাদন শুরু করতে ২০২৮-এর মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে নতুন সরকার প্রকল্পের ক্ষেত্রে কিছু নিশ্চয়তা দিচ্ছে, এতে করে অর্থায়নের ক্ষেত্রে সুবিধা পাওয়া যাবে।
পিডিবির তথ্য বলছে, বর্তমানে বেসরকারি খাতে মোট ১৯টি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ চলমান আছে। এসব কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৪২ মেগাওয়াট। সরকারি খাতে নির্মাণাধীন ৬টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা রয়েছে। এর মধ্যে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি কেন্দ্রের চুক্তি হয় ২০২৩ সালে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সরকারিভাবে ৫টি কেন্দ্র মিলে ১০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের চুক্তি করা হয়। এর বাইরে কক্সবাজারে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মতিপত্র দেওয়া হয়েছে। চুক্তি প্রক্রিয়াধীন।
গত এপ্রিলে প্রকাশিত সিপিডির এক প্রতিবেদন বলেছে, বেসরকারি খাতে যে ৩১টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মতিপত্র বাতিল করা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো। ৬০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ আসত। এর মধ্যে ১৫টি কোম্পানি জমিও কিনে ফেলেছিল। তবে প্রশ্ন ছিল সেগুলোর বিদ্যুতের দাম নিয়ে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ১০টি দরপত্রে সৌরবিদ্যুতের গড় যে দাম পড়েছে, তা সম্মতিপত্র বাতিল করা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চেয়ে গড়ে ২১ শতাংশ কম। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম আগে ছিল গড়ে ১০ দশমিক ৪৭ সেন্ট (প্রায় ১৩ টাকা)। দরপত্রের পর তা হয়েছে গড়ে ৮ দশমিক ২৭ সেন্ট (১০ টাকার কিছু বেশি)। এর মধ্যে ৭ দশমিক ৪৯ সেন্টেও একটি চুক্তি হয়েছে (৯ টাকার কিছু বেশি)।
অবশ্য সম্মতিপত্র বাতিলের পর চীনের কোম্পানিগুলো বিদ্যুতের দাম নিয়ে আবার সমঝোতার প্রস্তাবও দিয়েছিল। কিন্তু সরকার তা এখনো আমলে নেয়নি। তবে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় বাতিল হওয়া সৌর ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দাবি পর্যালোচনার জন্য গত মে মাসে একটি কমিটি গঠন করে। কমিটির কাজে অগ্রগতি কম।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দর-কষাকষি করে মূল্য কমিয়ে বাতিল হওয়া কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে চুক্তি করা যেতে পারে। তাহলে দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব।
যেমন নীলফামারীর ডিমলায় ৫০ মেগাওয়াট ও দিনাজপুরে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চাইলে আগামী বছরের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। এ কেন্দ্র দুটির সবকিছু তৈরি হওয়ার পর বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির খসড়াও তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সম্মতিপত্র বাতিল হওয়ায় কাজ থেমে গেছে।
সূত্র বলছে, সম্মতিপত্র বাতিল হওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ রয়েছে। এর মধ্যে চীনের শীর্ষ ৫ বিদ্যুৎ কোম্পানির একটি কোম্পানিও আছে। তারা দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মতিপত্র পেয়েছিল, যার ক্ষমতা ১৫০ মেগাওয়াট। এ ছাড়া ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরও কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সমঝোতা চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। এর মধ্যে ২০০ মেগাওয়াট ছিল ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ। কোনো কোনো কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে না পারায় বিগত দুই বছরে ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামে বিনিয়োগ করেছে। ইন্দোনেশিয়ায় ৭০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে চীনের ওই কোম্পানি।
বাতিল হওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, নতুন করে দরপত্র ডাকলে পাঁচ বছর আগে বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসবে না। বরং বাতিল হওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে দ্রুত যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কেন্দ্রগুলোকে সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মতিপত্র বাতিল হয়েছে, সেগুলোর কিছু প্রকল্পে কাজের অগ্রগতি আছে। যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকৃত অর্থেই নিয়ম মেনে কাজ পেয়েছে এবং বিনিয়োগ করেছে, সেগুলো উৎপাদনে আনার বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে।
২০০৬ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে আলাদা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনতে নতুন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি মন্ত্রণালয় গঠন করে প্রতিবেশী দেশ ভারত। দেশটির প্রেস তথ্য ব্যুরোর গত ৮ এপ্রিলের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভারতের ২০৩ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদার ৫১ দশমিক ৫ শতাংশ পূরণ করা হয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে।
২০১৮ সালে ভিয়েতনামের সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা ছিল মাত্র ৮৬ মেগাওয়াট। ২০২৫ সালের শেষে তা প্রায় ১৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি দাঁড়িয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ খাতে সাফল্য দেখিয়েছে পাকিস্তান। দেশটিতে বিদ্যুতের দাম ব্যাপক বেড়ে যাওয়ায় বহু মানুষ ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে। গ্রিডে যুক্ত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ দেশটিতে ৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। অবশ্য বিভিন্ন সূত্র বলছে, দেশটিতে ছাদবিদ্যুতের পরিমাণ আরও কয়েক গুণ বেশি। এসব বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হয়নি, গ্রাহকেরা নিজেদের কাজে ব্যবহার করছে।
২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের ঘোষণা দিয়েছে বর্তমান সরকার। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এ লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব নয়। ইতিমধ্যে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির উপকরণ আমদানিতে শুল্ক ১ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। ছাদবিদ্যুতের ব্যাপক প্রণোদনা দিয়েছে সরকার। প্রতি ইউনিট ছাদবিদ্যুৎ সাড়ে ১০ টাকায় কিনে নেবে সরকার। এতে করে বাজারে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ছাদের পাশাপাশি এখন জমিতেও বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের গতি বাড়াতে হবে। সরকারিভাবে জমি বরাদ্দ দিয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়েও সস্তায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরিতে ১০ থেকে ১২ বছর সময় লাগতে পারে। সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র করা যায় দেড় বছরের মধ্যে। এ ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণ একটি বড় সমস্যা। তবে দেশে প্রায় ৩৬ লাখ একর খাসজমি আছে, অকৃষিজমি আছে ১৮ লাখ একর। এসব জমির মধ্যে চরের ৩০ হাজার একর জমি ব্যবহার করে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযো
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও কমে আসছে। ৫০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করতে সাড়ে তিন কোটি ডলার বা ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন। ৬ থেকে ৭ বছরের মধ্যে বিনিয়োগ উঠে আসে।
নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, ছাদ থেকে শুরু করে ছোট আকারের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের ইতিবাচক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। বেসরকারি খাতেও শিল্পের ছাদে কেউ কেউ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। তবে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে গতি বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যেসব কেন্দ্র বাতিল করেছে, সেগুলো মূল্যায়নে সরকার গঠিত কমিটির দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়া উচিত। প্রয়োজনে বিদ্যুতের দাম নিয়ে সমঝোতা করে যথাযথ বিদেশি কোম্পানিকে সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।