পদ্মা ট্রিবিউন | বাংলা নিউজ পেপার
বাংলাদেশ রাজনীতি বিশ্ব বাণিজ্য মতামত খেলা বিনোদন চাকরি জীবনযাপন ভিডিও

নারীর জন্য নিরাপদ শহর, ঢাকার অবস্থান কোথায়

আসল প্রশ্ন হলো, একজন নারী সেই শহরে কতটা নিশ্চিন্তে জনপরিসর ব্যবহার করতে পারেন এবং বিপদে পড়লে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান কতটা দ্রুত তাঁর পাশে দাঁড়ায়।

আনিকা চৌধুরী প্রিয়ন্তি
নিরাপত্তার শংকা নিয়েই রাতে পথ চলতে হয় নারী যাত্রীদের
নিরাপত্তার শংকা নিয়েই রাতে পথ চলতে হয় নারী যাত্রীদের | প্রতীকী ছবি

একজন নারী রাত ১১টায় একা রাস্তায় হাঁটছেন—হাতে ফোন, কানে এয়ারবাড, সামনে নিয়ন আলোয় মোড়ানো ফুটপাত। তিনি ভাবছেন না, কে পেছনে আসছে কিংবা অন্ধকার গলিটা এড়িয়ে কতটা পথ ঘুরে যেতে হবে। আবার পৃথিবীর আরেক শহরে একই সময়ে একজন নারী সন্ধ্যা পেরোলেই একা রাস্তায় বের হতে ভয় পাচ্ছেন। বাড়ি ফেরার অনিশ্চয়তা নিয়েও জীবনের প্রয়োজনে তাঁকে বের হতে হচ্ছে। একটি শহর নারীর জন্য কতটা নিরাপদ, তার উত্তর শুধু অপরাধের সংখ্যা দিয়ে পাওয়া যায় না। আসল প্রশ্ন হলো, একজন নারী সেই শহরে কতটা নিশ্চিন্তে জনপরিসর ব্যবহার করতে পারেন এবং বিপদে পড়লে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান কতটা দ্রুত তাঁর পাশে দাঁড়ায়।


আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নারীর নিরাপত্তাকে এখন আর শুধু ছিনতাই, হত্যা কিংবা ধর্ষণের পরিসংখ্যান দিয়ে দেখা হয় না। জর্জটাউন ইন্সটিটিউট ফর ওম্যান, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটির ২০২৫/২৬ ওম্যান, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি ইনডেক্স নিরাপত্তাকে অন্তর্ভুক্তি, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা—এই তিন বৃহৎ মাত্রায় বিবেচনা করে। নিরাপত্তার মধ্যে রয়েছে ঘরের ভেতরের সহিংসতা, সমাজে নিরাপত্তার অনুভূতি, নারীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সহিংসতা এবং সংঘাতের নৈকট্য। এর গুরুত্বপূর্ণ সূচকের একটি হলো—‘রাতে একা হাঁটলে নিরাপদ বোধ করেন কি না’।


শহরের ক্ষেত্রে ছবিটা আরও সূক্ষ্ম। জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ইউএন ওম্যানের নিরাপদ শহর কাঠামো দেখায়, নিরাপদ শহরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আলোকিত রাস্তা, দৃশ্যমান ও হাঁটার উপযোগী ফুটপাত, নিরাপদ ও সহজলভ্য গণপরিবহন, পর্যাপ্ত গণশৌচাগার, নিরাপদ পার্ক ও জনপরিসর, যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে আইন, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং কার্যকর আইন প্রয়োগ।


বিশ্বের শহরগুলোর জন্য কোনো একক, সর্বজনস্বীকৃত ‘নারীর নিরাপত্তা র‌্যাংকিং’ নেই। তবে সাম্প্রতিক নারী-কেন্দ্রিক শহরভিত্তিক সূচক এবং সাধারণ নগর-নিরাপত্তা তথ্য একসঙ্গে দেখলে টোকিও, সিঙ্গাপুর, রেইকিয়াভিক, হেলসিঙ্কি ও কোপেনহেগেনের মতো শহরগুলো বারবার তুলনামূলক নিরাপদ শহরের তালিকায় উঠে আসে।


টোকিওর গল্পটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। বিশাল জনসংখ্যা, রাতভর চলমান নগরজীবন এবং বিপুল গণপরিবহনের মধ্যেও শহরটি তুলনামূলকভাবে কম সহিংস অপরাধ, শক্তিশালী পরিবহনব্যবস্থা ও উচ্চ মাত্রার রাতের নিরাপত্তাবোধের জন্য পরিচিত। ২০২৬ সালের নারী-কেন্দ্রিক সূচকেও টোকিও প্রথম স্থানে ছিল।


সিঙ্গাপুরের শক্তি অন্য জায়গায়। কঠোর আইন প্রয়োগ, তুলনামূলকভাবে কম সহিংস অপরাধ, বিস্তৃত ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন এবং রাতে চলাচলের নিরাপত্তাবোধ—সব মিলিয়ে এটি নারীর দৈনন্দিন জীবনযাপনকে তুলনামূলকভাবে সহজ করে। জর্জটাউনের ২০২৫/২৬ সূচকে সিঙ্গাপুরে শহর বা নিজের এলাকায় রাতে একা হাঁটার নিরাপত্তাবোধের হার ছিল ৯৭ শতাংশ, এই সূচকে সর্বোচ্চ।


রেইকিয়াভিক, হেলসিঙ্কি ও কোপেনহেগেনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি বিষয়—প্রাতিষ্ঠানিক সমতা। ২০২৫/২৬ ওম্যান, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি ইনডেক্সে ডেনমার্ক প্রথম এবং ফিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডও শীর্ষ সারির দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। ফলে এসব শহরের নিরাপত্তাকে শুধু কম অপরাধ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না—নারীর শিক্ষা, কাজ, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, আইনি সুরক্ষা ও সামাজিক অবস্থানের মতো বৃহত্তর কাঠামোও এর সঙ্গে যুক্ত।


অর্থাৎ নিরাপদ শহরের আসল চেহারা অনেক সময় একটি নজরদারি ক্যামেরায় নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থায়, যেখানে একজন নারী রাতে বের হওয়ার জন্য বিশেষ অনুমতি, পুরুষ সঙ্গী কিংবা অসংখ্য সতর্কতা—কোনোটিকেই নিজের স্বাধীনতার শর্ত মনে করেন না।


নারীর বাস্তব অভিজ্ঞতা বুঝতে বরং শহরভিত্তিক ‘নিরাপত্তা নিরীক্ষা’ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। করাচির উদাহরণটি তা স্পষ্ট করে। ইউএন ওম্যানের করাচি ওম্যান সেইফটি অডিটে জরিপ করা নারীদের মাত্র ২ দশমিক ৮ শতাংশ জনপরিসরকে নিরাপদ মনে করেছিলেন; ৯৭ শতাংশ নিজেদের অনিরাপদ বলেছেন। পরিবহন স্টপে ৯৭ শতাংশ নারী নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেছিলেন এবং হয়রানির সাধারণ রূপগুলোর মধ্যে ছিল অশালীন মন্তব্য, তাকিয়ে থাকা, অনুসরণ করা ও অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ।


মিসরের কায়রোয়ও সমস্যাটি শুধু প্রচলিত অপরাধের নয়, জনপরিসরে যৌন হয়রানি নারীর শহর ব্যবহারের স্বাধীনতাকে সীমিত করেছে। এ কারণেই ইউএন ওম্যানের ‘নিরাপদ শহর কর্মসূচি’ সেখানে পরিবহনকর্মী ও চালকদের সঙ্গে কাজ করে নারীর প্রতি হয়রানির সামাজিক স্বাভাবিকীকরণ বদলানোর চেষ্টা করেছে।


নাইজেরিয়ার লাগোসের মতো শহরে আবার অপরাধ, পরিবহন ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা একসঙ্গে নিরাপত্তার প্রশ্ন তৈরি করে। আর ভেনিজুয়েলার কারাকাসের মতো শহর সাধারণ অপরাধ সূচক এই অতি উচ্চ ঝুঁকির সংকেত দেয়। এসব উদাহরণ দেখায়, নারীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ শহর সব সময় একই কারণে ঝুঁকিপূর্ণ নয়। কোথাও সহিংস অপরাধ, কোথাও যৌন হয়রানি, কোথাও দুর্বল অবকাঠামো, কোথাও রাষ্ট্রীয় সেবার সীমাবদ্ধতা, আবার কোথাও রাজনৈতিক অস্থিরতা ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দেয়।


একটি নিরাপদ শহর নারীর জন্য শুধু বিপদ কমায় না, বিকল্পও বাড়ায়।


সে চাইলে বাসে উঠতে পারে, হাঁটতে পারে, রাতে কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরতে পারে, পার্কে বসতে পারে, একা ভ্রমণ করতে পারে। রাস্তার আলো নষ্ট হলে সেটি মেরামতের ব্যবস্থা আছে। গণপরিবহনে হয়রানি হলে অভিযোগের পথ আছে। পুলিশে গেলে তাকে সন্দেহের চোখে দেখা হবে না—এমন আস্থাও নিরাপত্তার অংশ। ইউএন ওম্যানের নিরাপদ শহর কাঠামো তাই আইন, অবকাঠামো, পরিবহন, জনপরিসর এবং সামাজিক আচরণকে একই কাঠামোর মধ্যে দেখে।


অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ শহরে নারী প্রায়ই নিজের স্বাধীনতার বদলে নিজের নিরাপত্তা বেছে নিতে বাধ্য হন। কোন রাস্তা দিয়ে যাবেন, কখন ফিরবেন, কোন বাসে উঠবেন, একা যাবেন কি না—এসব সিদ্ধান্তে ভয় ঢুকে পড়ে। তখন শহরটি শুধু বিপজ্জনক হয়ে ওঠে না, নারীর জন্য ছোট হয়ে যায়।


ঢাকায় নারীর বাস্তব অভিজ্ঞতার চিত্রটি উদ্বেগজনক। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের পাবলিক স্পেস ওম্যান’স সেইফটি অডিটে ৪২ শতাংশ নারী শহরের পার্ককে অনিরাপদ মনে করেছেন, নিম্নআয়ের এলাকার জরিপে ৩০ শতাংশ নারী নিরাপত্তার কারণে সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফেরার কথা জানিয়েছেন এবং অনেকে যৌন হয়রানির ভয়ে গণপরিবহন এড়িয়ে চলেন। একই গবেষণা দেখিয়েছে, অনিরাপদ জনপরিসর নারীর কর্মসংস্থানের সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলে। ২০২৪ সালে পরিচালিত ঢাকার পরিবহনবিষয়ক লিঙ্গ বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, নারী ও পুরুষের যাতায়াতের অভিজ্ঞতায় নিরাপত্তা ও হয়রানির বড় পার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ ঢাকার সমস্যা শুধু রাস্তায় অপরাধ আছে কি না, তা নয়; নারী সেই রাস্তায় কতটা স্বাধীনভাবে চলতে পারছেন, সেটিই বড় প্রশ্ন।


শেষ পর্যন্ত তাই একটি শহরকে নারীর জন্য নিরাপদ বলা মানে শুধু সেখানে কম অপরাধ হয়, এমন নয়। নিরাপদ শহর হলো সেই শহর, যেখানে রাত নামলে নারীর পৃথিবী ছোট হয়ে আসে না; যেখানে বাস, ফুটপাত, পার্ক, কর্মস্থল, বাজার কিংবা বাড়ি ফেরার পথ—কোনোটিই তাঁর স্বাধীনতার বিনিময়ে কিনতে হয় না।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন

0 Comments

No comments yet. Be the first to share your thoughts!

Leave a Comment

Moderated — may take a moment.