বিল নিয়ে বাকবিতণ্ডা, সংযোগ কেটে দেওয়ার অভিযোগ পল্লী বিদ্যুতের বিরুদ্ধে
বিল দিতে গেলে কর্মীকে গালিগালাজ এবং কর্মকর্তাকে হুমকি দেওয়ায় ওই গ্রাহকের বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে বিদ্যুতের বিল বেশি আসা নিয়ে কথা-কাটাকাটির পর এক গ্রাহকের বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। তবে পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তাদের দাবি, বিল দিতে গেলে কর্মীকে গালিগালাজ এবং কর্মকর্তাকে হুমকি দেওয়ায় ওই গ্রাহকের বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলার সুয়াইর ইউনিয়নের আলীপুর গ্রামের স্বপন মিয়ার বসতঘরের বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সংযোগ পুনরায় দেওয়া হয়নি। বিদ্যুৎ না থাকায় পরিবারটিকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা, ভুক্তভোগী পরিবার ও মোহনগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে স্বপন মিয়ার বিদ্যুৎ বিল একসঙ্গে ৩ হাজার ১০০ টাকা আসে। পরিবারটি ওই বিল পরিশোধ করে। এরপর অক্টোবর মাসের বিল আসে ৮৭০ টাকা। বৃহস্পতিবার দুপুরে ওই বিল পৌঁছে দিতে বাড়িতে যান পল্লী বিদ্যুতের মিটার পাঠক ও বার্তাবাহক রাশেদ মিয়া। এ সময় বিলের পরিমাণ নিয়ে স্বপন মিয়ার স্ত্রী আসমা আক্তারের সঙ্গে তাঁর কথা-কাটাকাটি হয়।
বিষয়টি রাশেদ মিয়া মোহনগঞ্জ পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন আদর্শনগর অভিযোগ কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হামিদুর রহমানকে জানান। পরে তিনি বিষয়টি উপজেলা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক ইমদাদুল হককে অবহিত করেন। এরপর তাঁর নির্দেশে ওই দিন বিকেলে স্বপন মিয়ার বাড়ির বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।
অভিযোগ কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হামিদুর রহমান বলেন, ‘পল্লী বিদ্যুতের কর্মী রাশেদ মিয়া আমাকে জানিয়েছেন, বিল দিতে গেলে ওই গ্রাহক তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। এমনকি উপমহাব্যবস্থাপকের হাত কেটে ফেলার হুমকিও দেন। বিষয়টি উপমহাব্যবস্থাপককে জানানোর পর তাঁর নির্দেশে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।’
সন্ধ্যা সাতটার দিকে মুঠোফোনে কথা হয় স্বপন মিয়ার স্ত্রী আসমা আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, বিদ্যুতের কর্মী রাশেদ মিয়ার সঙ্গে কোনো গালিগালাজ বা অসৌজন্যমূলক আচরণ হয়নি। তিনি শুধু জানতে চেয়েছিলেন, এত বেশি বিদ্যুৎ বিল কেন আসে। জবাবে রাশেদ মিয়া তাঁকে অফিসের লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। তখন তিনি বলেন, ‘আমি কেন অফিসের লোকজনের কাছে যাব? আপনি বিল লিখে নিয়ে যান। আপনারা যে হিসাব দেবেন, সেই অনুযায়ী বিল আসে।’
আসমা আক্তারের ভাষ্য, এরপর রাশেদ মিয়া মুঠোফোনে কারও সঙ্গে কথা বলেন। পরে বিকেলে মোটরসাইকেলে করে একজন বয়স্ক লোককে নিয়ে এসে বলেন, তাঁদের মিটার পরীক্ষা করে দেখা হবে, বিল ঠিক আছে কি না। পরে তাঁরা মিটার থেকে বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে চলে যান। এরপর থেকে তাঁদের ঘরে বিদ্যুৎ নেই।
আসমা আক্তার আরও বলেন, ‘আমাদের বাড়িতে আমি ও আমার স্বামী থাকি। তিন মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে মাদ্রাসায় থাকে। তাই বিদ্যুৎ খরচও বেশি হওয়ার কথা নয়। অথচ বিল অনেক বেশি আসে। বাড়িতে একটি ফ্রিজ, দুটি লাইট ও ফ্যান চলে। বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজে থাকা মাছ-মাংসসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেছে।’
এ ব্যাপারে জানতে রাশেদ মিয়ার মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
জানতে চাইলে উপমহাব্যবস্থাপক ইমদাদুল হক মুঠোফোনে বলেন, ওই গ্রাহকের মিটার ও মিটার পাঠে কোনো সমস্যা নেই। তারপরও বিল দিতে গেলে কর্মীদের গালিগালাজ এবং তাঁরও হাত কেটে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পেয়েছেন। এ কারণে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
এভাবে গ্রাহকের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা আইনসংগত কি না, জানতে চাইলে ইমদাদুল হক বলেন, তাঁদের আইনে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে বিষয়টি আলোচনা করা হবে। ভবিষ্যতে এমন আচরণ করবেন না, এমন নিশ্চয়তা পেলে সংযোগ পুনঃস্থাপন করা হবে।
এ বিষয়ে নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপকের দায়িত্বে থাকা কলমাকান্দা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপমহাব্যবস্থাপক শাহ আলমের সঙ্গে কথা হয়। প্রথমে তিনি বিষয়টি জানেন না জানিয়ে খোঁজ নেওয়ার কথা বলেন। তবে তিনি বলেন, এভাবে গ্রাহকের বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা ঠিক হয়নি। গ্রাহককে বুঝিয়ে বললে তিনি নিশ্চয়ই বুঝতেন।
পরে খোঁজ নিয়ে শাহ আলম বলেন, ওই গ্রাহক পল্লী বিদ্যুতের কর্মীদের অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন বলে তাঁকে জানানো হয়েছে। এ কারণে উপমহাব্যবস্থাপক সংযোগ বিচ্ছিন্নের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি উপমহাব্যবস্থাপককে স্থানীয় লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে সংযোগ পুনঃস্থাপনের ব্যবস্থা করতে বলেছেন।