চট্টগ্রামে তীব্র গ্যাস সংকট, ব্যাহত জনজীবন ও শিল্প উৎপাদন
বেড়েছে লোডশেডিং। সব মিলিয়ে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে জনজীবন, পরিবহন, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) ২১ জুলাই কারিগরি সমস্যা শুরুর পর থেকেই চট্টগ্রামে গ্যাসের সরবরাহ কম ছিল। শনিবার রাত থেকে সরবরাহ আরও কমানো হয়েছে।
এতে গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। শিল্পকারখানা, সিএনজি ফিলিং স্টেশন, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা এবং বাসাবাড়িতে গ্যাসের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
এতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় বিভিন্ন কারখানায় যেমন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি বেড়েছে লোডশেডিং। গ্যাসের জন্য সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির লাইন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। বাসাবাড়িতে চুলা জ্বলছে না।
সব মিলে জ্বালানির স্বল্পতায় জনজীবনে সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। সিএনজিচালিত কিছু গাড়ির ভাড়া বেড়ে গেছে। গ্যাস সংকটে রান্না করতে না পারায় বিভিন্ন এলাকার খাবার হোটেলগুলোতে মানুষের ভিড় বেড়েছে।
চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে থাকা কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকা অঞ্চলে সরবরাহ বাড়াতে জাতীয় গ্রিড থেকে সেখানে বেশি পরিমাণে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। এতে চট্টগ্রামের জন্য গ্যাসের বরাদ্দ গত দুদিনে আরও কমেছে। এটাই বর্তমান সংকটের মূল কারণ।
কেজিডিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলে স্বাভাবিক সময়ে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট । ২১ জুলাই এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ার পরদিন চট্টগ্রামে জাতীয় গ্রিড থেকে ২৩০ এমএমসিএফ গ্যাস মিলছিল। গত শনিবার তা কমে দাঁড়ায় ২১৭ এমএমসিএফে। রোববার এটি কমে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি নেমে এসেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেজিডিসিএলের বিপণন বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, এফএসআরইউ-এর সমস্যা যতদিন মিটবে না, ততদিন সংকট থাকবে। আমাদের সরবরাহ লাইনে কোনো সমস্যা নেই। গ্যাস কম পাচ্ছি, তাই সরবরাহ কম করতে পারছি। আগের কয়েকদিনের তুলনায় আজ আরও কম গ্যাস পেয়েছি।
আরেক কর্মকর্তা বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে গ্যাস কম পাওয়ায় বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক সরবরাহ ৩৮ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমিয়ে ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট করা হয়েছে। আর সার কারখানায় ৪৮ মিলিয়ন থেকে কমিয়ে ৪২ মিলিয়ন ঘনফুট দেওয়া হচ্ছে। সংকট বাড়ার কারণ চট্টগ্রামে সরবরাহ কমিয়ে ঢাকায় দেওয়া হচ্ছে। তাই গতকাল থেকে সরবরাহ কমেছে। এই সংকট আরও কয়েকদিন থাকার সম্ভাবনা বেশি।
এদিকে গ্যাসের সরবরাহ কমার কারণে গোটা চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশের এলাকায় জনসাধারণের ভোগান্তি চরমে উঠেছে। শনিবার রাত থেকেই বাসাবাড়ি ও সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যায়।
রোববার সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন প্রান্তের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে ঘুরে দেখা যায় গাড়ির দীর্ঘ সারি। দুই-একটি স্টেশনে গ্যাস দিতে পারলেও পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় বেশিরভাগ স্টেশনে বিকেল পর্যন্ত গ্যাস বিক্রি করতে পারেনি।
দুপুরে নগরীর কদমতলী এলাকার ফোর স্টার সিন্ডিকেট সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, গাড়ির লাইন পলোগ্রাউন্ড মাঠের সামনে দিয়ে সিআরবি এলাকায় গিয়ে ঠেকেছে।
লাইনে থাকা সিএনজি অটোরিকশার চালক সাইফুল আলম বলেন, সকাল থেকে দাঁড়িয়ে আছি। কখন গ্যাস দেবে স্টেশনের লোকও বলতে পারছে না। সারাদিন এখানে চলে গেলে ভাড়া মারব কখন? জমা উঠবে কেমনে।
সকালে কাটিরহাট থেকে চট্টগ্রাম নগরীর উদ্দেশ্যে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় রওনা দেওয়া জাহাঙ্গীর আলম বলেন, হাটহাজারী পর্যন্ত জনপ্রতি ২০ টাকার ভাড়া গত কয়েকদিনে বেড়ে হয়েছে ৩০ টাকা। তাও সিএনজি চলছে হাতেগোনা কয়েকটা।
চালকদের বাড়তি ভাড়ার কথা বললে, তারা বলে গ্যাস নিতে কয়েক ঘণ্টা লাগে; তাই বাড়িয়ে নিচ্ছে। আবার মুরাদপুর থেকে আগে কোতোয়ালি পর্যন্ত সিএনজি অটোরিকশা চলত। সেগুলো এখন চকবাজার গিয়ে যাত্রী নামিয়ে দেয়। সেখান থেকে আবার যাত্রী নিয়ে কোতোয়ালি যায়। এভাবে বাড়তি ভাড়া নিচ্ছে।
হাটহাজারী উপজেলার দক্ষিণ মাদার্শার আহমদিয়া পাড়ার বাসিন্দা শামসুল ইসলাম বলেন, শনিবার রাত থেকে লাইনে গ্যাস নেই। সকালে বাসার চুলা জ্বালাতে পারিনি। দুপুরের রান্না করেছি রাইস কুকারে। কখন গ্যাস আসবে জানি না।
হালিশহর এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী মায়মুনা হক বলেন, আজকে সকাল থেকে গ্যাস নেই। আগে অল্প হলেও চুলা জ্বলত। আজকে সকালের দিকে অল্প একটু করে জ্বলেছিল। পরে আর গ্যাসই আসেনি। দোকান থেকে কিনে দুপুরের খাবার খেতে হয়েছে। রাতে কী করব জানি না।
গ্যাস সংকটে শিল্পের অবস্থা কী প্রশ্নে চট্টগ্রামের শিল্পোদ্যোক্তা এবং পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি একটা জাতীয় সংকট। গ্যাস না থাকলে কারখানায় উৎপাদন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব না। মানুষের শরীরে যেমন রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়, তেমনি জ্বালানি সরবরাহ না থাকলে শিল্পগুলো আইসিইউর দিকে যাচ্ছে। এর বেশি কিছু বলতে চাই না।
চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি সহ্য করার মতো না। এরকম হবে সেটা আমরা প্রত্যাশা করিনি। গতকাল থেকে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে তা ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বর্তমানে গ্যাসের যে কম চাপ, এই অবস্থায় কোনোমতে শিল্পকারখানা খোলা রাখা সম্ভব হবে না।
পরিস্থিতির উন্নতির জন্য চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে সরকারের কাছে আহ্বান জানান এই ব্যবসায়ী নেতা।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে মোট ২৮টি সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট।
পিডিবির হিসেবে, শনিবার এসব কেন্দ্র থেকে দিনে ২ হাজার ৬৬৩ মেগাওয়াট এবং রাতে ৩ হাজার ৪০৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। ওই দিন চট্টগ্রামে ১ হাজার ৩৫৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে গড়ে ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছিল।
রোববার গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে, সঙ্গে বেড়েছে লোডশেডিং। রোববার বিকেলে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াটের মতো লোডশেডিং করা হয়।
চট্টগ্রাম পিডিবির প্রধান প্রকৌশলী কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, আজ বিকেল ৪টায় আমাদের চাহিদা ছিল ১ হাজার ২৭০ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ৯৭০ মেগাওয়াটের মতো। তাই প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে দিনের বিভিন্ন সময়ের চাহিদা অনুসারে তারতম্য হয়ে থাকে।
তবে লোডশেডিং বাড়া বা গ্যাস সরবরাহ কমায় উৎপাদন পরিস্থিতি বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি পিডিবির দায়িত্বশীল কেউ।
How did this article make you feel?