[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

গত বছরে দিনে ৫১ নারী জানিয়েছেন স্বামী নির্যাতনের কথা, ৮ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি

প্রকাশঃ
অ+ অ-
Infographic Image
স্বামীর হাতে নির্যাতনের ঘটনা জানিয়ে কল
২০২৫
:
১৮,৬২৬
২০২৪
:
১১,৪৯৮
২০২৩
:
৯,৯১৩
২০২২
:
৬,৫৬০
২০২১
:
৩,৩৪৮

চলতি বছরের জুনে পেশায় নার্স এক নারী স্বামীর সঙ্গে গোপালগঞ্জে শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিলেন। সেখানে দাম্পত্য কলহের এক পর্যায়ে স্বামী তাঁকে মারধর করেন, ছুরি দেখিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেন এবং পরে একটি ঘরে তালা দিয়ে আটকে রাখেন। পরদিন ওই গৃহবধূর মামা জাতীয় জরুরি সেবায় কল করলে পুলিশ এসে তাঁকে উদ্ধার করেন।

ওই গৃহবধূ থানায় অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরেই স্বামী তাঁকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করছিলেন। তাদের ১৪ বছরের সংসারে একটি সন্তান রয়েছে।

২০২৪ সালে রাজধানীর ভাটারা এলাকায় এক গৃহবধূকে মাঝরাতে মারধর করে স্বামী বাসা থেকে বের করে দেন। পরে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বরে কল করলে পুলিশ এসে তাঁকে উদ্ধার করে আত্মীয়ের বাড়িতে পৌঁছে দেয়।

স্বামীর হাতে নির্যাতনের অভিযোগে ২০২৫ সালে ৯৯৯ নম্বরে দিনে গড়ে ৫১টি কল এসেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় এটি ৬৩ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালে স্বামীর নির্যাতনের অভিযোগে কল এসেছিল ১১ হাজার ৪১৮টি, অর্থাৎ দিনে গড়ে ৩১টি। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল দিনে গড়ে ২৭টি।

গত বছর হত্যা, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, উত্ত্যক্ত করা, আত্মহত্যার প্ররোচনা, আটকে রাখা, স্বামী, মা–বাবা ও অন্যদের হাতে নির্যাতন, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনসহ নানা অভিযোগে নারী নির্যাতনের ঘটনায় মোট কল এসেছে ৩২ হাজার ২৮৬টি। এর মধ্যে কেবল স্বামীর নির্যাতনের ঘটনায় কল এসেছে ১৮ হাজার ৬২৬টি। অর্থাৎ মোট কলের মধ্যে প্রায় ৫৮ শতাংশ স্বামীর বিরুদ্ধে।

চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে নারীর নির্যাতনের অভিযোগে ৬ হাজার ২২৭টি কলের মধ্যে ৩ হাজার ৮০৮টি বা ৬১ শতাংশ কল এসেছে স্বামীর বিরুদ্ধে।

২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর ৯৯৯ প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ৮ বছরে স্বামীর বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগে এটাই সর্বোচ্চ কল। কল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত বছর স্বামীর সহিংসতার বিরুদ্ধে যত কল এসেছে, ২০২২ সালের আগে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে মোট কলও সেই পরিমাণ ছিল না।

নারী নির্যাতনের ঘটনা যেভাবে বাড়ছে, তাতে সরকারের টাস্কফোর্স করে বড় ধরনের কর্মসূচি নেওয়া দরকার। নারীর ওপর নির্যাতন বিষয়ে সমাজের মনস্তত্ত্ব নিরূপণ করা দরকার।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম

জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯–এর প্রধান অতিরিক্ত উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) মহিউল ইসলাম বলেন, অনেক স্বামী স্ত্রীর ওপর কর্তৃত্ব দেখাতে নির্যাতন করেন। নারী নির্যাতনের ঘটনা ও স্বামীর হাতে নির্যাতনের অভিযোগ জানিয়ে গত আট বছরে সর্বোচ্চ কল এসেছে গত বছর। ২০২৪ সালের তুলনায় নারী নির্যাতনের অভিযোগে কল বেড়েছে ৪০ শতাংশ।

মহিউলের মতে, কলের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার দুটি কারণ রয়েছে। এক. তৃণমূল পর্যায়ে ৯৯৯–এর সেবার প্রসার বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকে এই সেবার কথা জানতে পেরেছেন এবং আস্থা রেখেছেন। দুই. নারীরা নির্যাতনের ঘটনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছেন, তারা প্রতিকার পেতে কল করছেন।

৯৯৯–এর কল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে নারী নির্যাতনের অভিযোগে কল এসেছিল ২৩ হাজার ৩৩টি। এর মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ ছিল ১১ হাজার ৪১৮টি। ২০২৩ সালে ২৬ হাজার ৭৯৮টি কলের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ৯ হাজার ৯১৩টি। ২০২২ সালে ২১ হাজার ৭১২টি কলের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ৬ হাজার ৫৬০টি। ২০২১ সালে ১২ হাজার ১৬৯টি কলের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ৩ হাজার ৩৪৮টি।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, নারী নির্যাতনের ঘটনা যেভাবে বাড়ছে, তাতে সরকারের টাস্কফোর্স করে বড় ধরনের কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন। নারীর ওপর নির্যাতন বিষয়ে সমাজের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করা দরকার। ফলাফল অনুযায়ী আইন তৈরি, আইনে পরিবর্তন আনা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী নির্যাতনের পক্ষে মত প্রকাশ করা হয় এবং নারীর প্রতি বৈষম্যকে সমর্থন দেওয়া হয়। এ ধরনের মতামতও নারীর ওপর নির্যাতন ও নারীবিদ্বেষ বাড়ায়।

নির্যাতনের ঘটনায় পারিবারিক সহিংসতা (সুরক্ষা ও প্রতিরোধ) আইন, ২০১০ রয়েছে। এছাড়া যৌতুকের কারণে নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনও প্রযোজ্য। গোপালগঞ্জের গৃহবধূর ঘটনার বিষয়ে ২৫ মার্চ টুঙ্গিপাড়া থানায় যোগাযোগ করলে জানা যায়, তিনি পারিবারিক সহিংসতা বা অন্য কোনো আইনের আওতায় প্রতিকার চাননি। থানায় শুধু লিখিত অভিযোগ করেছিলেন।

টুঙ্গিপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আইয়ুব আলী বলেন, তিনি ওই ঘটনার পর এই থানায় যোগ দিয়েছেন। খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পেরেছেন, বিষয়টি এরপর আর এগোয়নি।

দেখা গেছে, ৯৯৯–এর পক্ষ থেকে থানায় যোগাযোগ করানো হলেও আইনি প্রতিকার চাওয়া ও পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু দুর্বলতা রয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী জানেন না, কীভাবে আইনি প্রতিকার নিতে হবে এবং সেই সহায়তা পান না। তাঁরা শুধু তথ্য দেওয়া হয়।

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯–এর প্রধান মহিউল ইসলাম বলেন, ভুক্তভোগীদের থানার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয় এবং তারা সেবা পেয়েছেন কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হয়। ৯৯৯–এর দিক থেকে এ বিষয়ে কোনো ঘাটতি নেই।

পারিবারিক সহিংসতা, স্বামীর হাতে নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা কম হওয়ার বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) উপাত্তেও। আসকের তথ্যানুসারে, ২০২৫ সালে নারীর বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতার ৫৬০টি ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছিল। এর মধ্যে ২৪৮টিতে মামলা হয়েছে। স্বামীর হাতে নির্যাতনের ঘটনা ছিল ২৮টি এবং ২১৭টি হত্যার ঘটনা ঘটেছিল।

২০২৪ সালে পারিবারিক সহিংসতার ৫২৩টি ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, যার মধ্যে ২১১টিতে মামলা হয়েছিল। স্বামীর হাতে নির্যাতনের ঘটনা ছিল ৩৩টি এবং ১৮০টি হত্যার ঘটনা। ১০টি পত্রিকা, কিছু অনলাইন পোর্টাল ও আসকের নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে এই উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, সংসার ভেঙে যাওয়ার ভয়ে অনেক নারী আইনি প্রতিকার চান না। এছাড়া আইনি ব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান ও সচেতনতার অভাব রয়েছে। পারিবারিক সহিংসতা (সুরক্ষা ও প্রতিরোধ) আইনের আওতায় অভিযোগের ঘটনা অত্যন্ত কম। আইনটির যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে ভুক্তভোগী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে প্রচার বাড়ানো প্রয়োজন। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন