[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান ঠেকাতে রাস্তায় ট্রাক, ভাঙা হলো কালভার্ট

প্রকাশঃ
অ+ অ-
চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে চলছে যৌথ বাহিনীর অভিযান। আজ সকালে তোলা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের ধরতে অভিযানে গিয়ে নজিরবিহীন প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন যৌথ বাহিনীর সদস্যরা। আলীনগর এলাকায় প্রবেশের মূল রাস্তার ওপর বড় ট্রাক আড়াআড়ি করে রেখে, কালভার্ট ভেঙে এবং নালার স্ল্যাব তুলে এই বাধার সৃষ্টি করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ধারণা, অভিযানের খবর আগেভাগেই সন্ত্রাসীদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। তাই যৌথ বাহিনীর প্রবেশ ঠেকাতে গত রাতেই এসব প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়।

জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় মূলত দুটি সন্ত্রাসী পক্ষ সক্রিয়। একটির নেতৃত্বে আছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অন্যটির নেতৃত্বে রোকন উদ্দিন। ইয়াসিন গত জানুয়ারিতে ওই এলাকায় অভিযানে যাওয়া এক র‍্যাব কর্মকর্তাকে হত্যা মামলার প্রধান আসামি। দুর্গম আলীনগর এলাকায় তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, আজকের অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল ইয়াসিনের নিয়ন্ত্রণে থাকা আলীনগর এলাকা। সেখানে বাহিনীর প্রবেশ রুখতেই পরিকল্পিতভাবে কালভার্টটি ধ্বংস করা হয়েছে এবং রাস্তার ওপর ট্রাক ফেলে রাখা হয়েছে। প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

 
এটি অনেক বড় অভিযান। এখানে বিভিন্ন বাহিনীর লোকজন আছে। জঙ্গল সলিমপুর এলাকা যারা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের সিএনজি অটোরিকশার চালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন সোর্স রয়েছে। কোনোভাবে হয়তো জেনে গেছে।
— নাজমুল হাসান, অতিরিক্ত ডিআইজি, চট্টগ্রাম রেঞ্জ।

সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীবিরোধী অভিযানে সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতার কথা স্বীকার করেছেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান। আজ সোমবার বেলা ১১টার দিকে সাংবাদিকদের তিনি জানান, নানা বাধা সত্ত্বেও যৌথ বাহিনী আলীনগরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে।

অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান বলেন, "ছিন্নমূল এলাকা পার হয়ে আলীনগরে ঢোকার মুখেই একটি বড় ট্রাক দিয়ে রাস্তা আটকে দেওয়া হয়েছিল। যৌথ বাহিনীর সদস্যরা সেই ব্যারিকেড সরিয়ে সামনে এগিয়ে যান।" তিনি আরও জানান, কিছু দূর যাওয়ার পর দেখা যায় রাতের আঁধারে একটি কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়েছে। পরে কালভার্টের সেই ভাঙা অংশ ইট-বালি দিয়ে ভরাট করে যৌথ বাহিনীর গাড়ি আলীনগরে প্রবেশ করে।

অভিযানের আগে কীভাবে সন্ত্রাসীরা এসব প্রতিবন্ধকতা তৈরির সুযোগ পেল—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "এটি একটি বিশাল অভিযান, যেখানে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা অংশ নিচ্ছেন। জঙ্গল সলিমপুর যারা নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের সিএনজি অটোরিকশা চালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে সোর্স (তথ্যদাতা) রয়েছে। কোনোভাবে হয়তো তারা অভিযানের খবর আগেভাগেই জেনে গেছে।"

পরিকল্পিত এই বাধা এড়িয়েই বর্তমানে জঙ্গল সলিমপুরের দুর্গম আলীনগর এলাকায় চিরুনি অভিযান চালাচ্ছে যৌথ বাহিনী।

জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান ঠেকাতে রাস্তায় ট্রাক, ভাঙা হলো কালভার্ট | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন  

সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে আজ সোমবার সকাল ৬টা থেকে প্রায় ৪ হাজার সদস্যের অংশগ্রহণে বিশাল এক যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। অভিযানের অংশ হিসেবে ভোর থেকেই পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কোনো সন্ত্রাসী যেন পালিয়ে যেতে না পারে, সে লক্ষ্যে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলোতে বসানো হয়েছে কড়া তল্লাশি চৌকি।

অভিযান ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান জানান, আমাদের অভিযান এখনো চলমান। কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত উদ্ধারকৃত অস্ত্র বা গ্রেপ্তারের সঠিক সংখ্যা বলা যাচ্ছে না। তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে এই এলাকায় নির্বিঘ্নে অভিযান পরিচালনার জন্য সেখানে যৌথ বাহিনীর একটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

গত জানুয়ারি মাসে জঙ্গল সলিমপুরে আসামি ধরতে গিয়ে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন র‍্যাব-৭-এর সদস্যরা। ওই হামলায় র‍্যাবের উপসহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। ওই সময় সন্ত্রাসীরা চার র‍্যাব সদস্যকে অপহরণ করে এবং আটক এক আসামিকে ছিনিয়ে নেয়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় তাঁদের উদ্ধার করা হয়।

র‍্যাব কর্মকর্তা হত্যার ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানায় সন্ত্রাসী মোহাম্মদ ইয়াসিনসহ ২৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। সেই ঘটনার পর থেকেই জঙ্গল সলিমপুরে সমন্বিত অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে তখন অভিযান স্থগিত রাখা হলেও আজ বড় পরিসরে এই অভিযান শুরু হলো। নিরাপত্তার স্বার্থে অভিযানের সময় সাংবাদিকদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

ভেঙে ফেলা হয়েছে নালার স্ল্যাব, রাস্তার ওপর রাখা হয়েছে ট্রাক। আজ সকালে তোলা | ছবি: এক পুলিশ কর্মকর্তার তোলা

চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার পশ্চিমে জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। সীতাকুণ্ড উপজেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটির বিপরীতে লিংক রোডের উত্তর পাশে ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড়জুড়ে বিস্তৃত এই এলাকাটি নগরের একদম কাছেই। পূর্ব দিকে হাটহাজারী উপজেলা এবং দক্ষিণে বায়েজিদ বোস্তামী থানা বেষ্টিত এই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলটি গত চার দশকে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছে।

সরকারি পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। অভিযোগ রয়েছে, পাহাড় কেটে প্লট-বাণিজ্য ও অবৈধ দখল টিকিয়ে রাখতে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসী বাহিনী, যারা সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় থাকে। গত বছরের অক্টোবরেও এখানে দুই পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহত হন। এর পরদিন সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক।

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ ইয়াসিন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সীতাকুণ্ডের তৎকালীন সংসদ সদস্য এস এম আল মামুনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর তিনি নিজেকে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর অনুসারী দাবি করতে শুরু করেন।

যদিও র‍্যাব কর্মকর্তা হত্যার ঘটনার পর এক বিবৃতিতে আসলাম চৌধুরী স্পষ্ট করেছেন যে, জঙ্গল সলিমপুরে তাঁর কোনো অনুসারী নেই এবং এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপির কেউ জড়িত নন। মূলত রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থেকে ইয়াসিন বাহিনী দীর্ঘকাল ধরে এই দুর্গম এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আসছে।

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন