কক্সবাজারের আশ্রয়শিবির: ‘আমাদের আশা কবে পূরণ হবে?’
![]() |
| কাঁটাতারে ঘেরা আশ্রয়শিবিরে দিন কাটছে রোহিঙ্গাদের। দেশে ফিরতে না পেরে ঈদেও আনন্দ ছিল না তাঁদের। কক্সবাজারের টেকনাফের জাদিমুরা আশ্রয়শিবিরে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
রোহিঙ্গা ভাষায় মনের ইচ্ছা বা আশাকে ‘আজ্জু’ বলা হয়। দেশে থাকা ১৪ লাখ রোহিঙ্গা ‘আজ্জু’ বলতে দেশে ফেরার আশা বোঝান। লেদা আশ্রয়শিবিরের ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান ও রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ আলম এভাবেই ‘আজ্জু’ কথার অর্থ ব্যাখ্যা করেন। এর আগে হতাশ হয়ে তিনি জানতে চেয়েছিলেন, ‘আমাদের আজ্জু (ফেরার আশা) কখন পূরণ হবে?’
কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা আশ্রয়শিবিরে গত মঙ্গলবার মোহাম্মদ আলমের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। পবিত্র ঈদুল ফিতর কেমন কেটেছে শিবিরবাসীর, তা জানতেই সেখানে গিয়েছিলেন। মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘নিজ দেশে না থাকলে ঈদের আনন্দও আসে না। তবু সরকারের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। আমরা তাদের অতিথি। কিন্তু অতিথি হয়ে থাকতে কারও ভালো লাগে না। কষ্টে থাকলেও নিজ দেশে, নিজ বাড়িতে থাকার অনুভূতিই আলাদা। সেটিই তো আমাদের নেই। পরিবেশ থাকলে আজই দেশে চলে যেতাম।’
লেদা শিবির থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে কক্সবাজারের টেকনাফে, দমদমিয়া সংরক্ষিত বন নেচার পার্কের পাশে আট বছর আগে গড়ে তোলা হয় জাদিমুরা আশ্রয়শিবির। সেখানে ৩৭ হাজার রোহিঙ্গা থাকেন। কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা এই শিবিরের পাশেই কক্সবাজার-টেকনাফ আঞ্চলিক সড়ক।
জাদিমুরা শিবিরের একটি ঘরের সামনে কাঠের বেঞ্চে বসেছিলেন কয়েকজন রোহিঙ্গা। সড়কের ওপারে তাকালে দেখা যায় নাফ নদী, এবং তার ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের বলিবাজার। ২০১৭ সালে সহিংসতার মুখে সব ছেড়ে পরিবার নিয়ে তারা পালিয়ে আসেন এই শিবিরে। এরপর থেকে শিবিরই তাদের ঠিকানা। অনেকগুলো ঈদ কেটেছে তারা এখানে। অথচ বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণার অনুযায়ী, এবারের ঈদ তারা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিজেদের বাড়িতে করার কথা ছিল। গত মঙ্গলবার দুপুরে জাদিমুরা শিবিরে এই প্রশ্ন তুলতেই হেসে ওঠেন আবদুল নবী, রফিক উল্লাহসহ সেখানে বসে থাকা রোহিঙ্গারা।
রফিক উল্লাহ আবদুল নবীর কথা ছিনিয়ে নিয়ে বলেন, ‘এই আশ্রয়শিবিরের ত্রিপলের ছাউনি দিয়ে আটটি ঈদ কেটেছে। কোনো ঈদ আরাকানের (রাখাইন) মতো উৎসবমুখর হয়নি। ঈদের নামাজ শেষে রোহিঙ্গারা মা–বাবা, দাদা–দাদিসহ আত্মীয়স্বজনের কবর জিয়ারত করেন। এখানে সেই সুযোগ নেই। শিবিরে বিনামূল্যে খাদ্য সহায়তা পাওয়া যায় ঠিক, কিন্তু শান্তি নেই, বন্দিজীবন আর ভালো লাগে না।’
২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রাখাইন রাজ্য ত্যাগ করে স্বামী ও তিন সন্তান নিয়ে টেকনাফে পালিয়ে লেদা আশ্রয়শিবিরে আসেন গোলজার বেগম। গত আট বছরে আশ্রয়শিবিরে জন্ম নিয়েছে আরও পাঁচ সন্তান। ঘরের একটি অংশ দোকান বানিয়ে সেখানে পান–সিগারেট বিক্রি করেন তিনি। গোলজার বেগম বলেন, এবারের ঈদ তাঁদের ভালো কেটেছে না। আগে প্রতি ঈদে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গরুর মাংসের সঙ্গে চালের রুটি পরিবেশন করা হতো, কিন্তু এবার অর্থসংকটে তা সম্ভব হয়নি। কয়েকটি ক্যাম্পে শিশুদের জন্য নগদ অর্থ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বড়দের জন্য কোনো বিনোদনের ব্যবস্থা ছিল না।
ভবিষ্যৎ নিয়েও রোহিঙ্গাদের ভাবনা অনিশ্চিত। মধুরছড়ার আশ্রয়শিবিরের পাহাড়ের ঢালুতে দুই কক্ষের ত্রিপলের ছাউনিতে স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে থাকেন সালামত উল্লাহ। তিনি বলেন, যে খাদ্য সহায়তা পাচ্ছেন তা দিয়ে এক মাস চলা সম্ভব হয় না। আগে ক্যাম্পের বাইরে কাজ করে দৈনিক ৩০০–৫০০ টাকা উপার্জন করা যেত, কিন্তু এখন কড়াকড়ির কারণে সেটিও সম্ভব হচ্ছে না। আশ্রয়শিবিরে নিরাপত্তা নেই, তহবিল সংকটের কারণে শিশুদের স্কুলও বন্ধ। রাখাইন ফিরে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের কী হবে তা ভেবে দিশাহারা তিনি।
মধুরছড়ার রোহিঙ্গা নেতা জালাল আহমদ বলেন, এক বছর ধরে রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে। তাদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সম্পর্ক কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে না হওয়ায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে না।
বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১৪ লাখ। এর মধ্যে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর কয়েক মাসে এসেছে আট লাখ রোহিঙ্গা। এখন পর্যন্ত এক রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো যায়নি। উল্টো, গত দেড় বছরে নতুন করে ঢুকেছে আরও দেড় লাখ রোহিঙ্গা।
আশ্রয়শিবিরগুলোতে মানবিক সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে জানিয়ে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, আগে আশ্রয়শিবিরে রোহিঙ্গাদের মাথাপিছু ১৪ ডলার করে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হতো। এখন তা কমে ১২ ডলারে ঠেকেছে। আগামী এপ্রিল থেকে খাদ্য সহায়তা আরও কমতে পারে। প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত হলে রোহিঙ্গা তরুণ–কিশোরেরা মাদক ও সন্ত্রাসে জড়াতে পারে। ইতিমধ্যে শত শত নারী–শিশু পাচারের শিকার হয়েছেন।
![]() |
| আশ্রয়শিবিরে আটটি ঈদ কেটেছে রোহিঙ্গা নারী গোলজার বেগমের। কবে দেশে ফিরবেন জানেন না তিনি। গত মঙ্গলবার টেকনাফের লেদা আশ্রয়শিবিরে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
বিএনপি সরকারের প্রতি প্রত্যাশা বেশি বলে জানান রোহিঙ্গাদের সংগঠন ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার নেতা মোহাম্মদ রফিক। তিনি বলেন, ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে দুই দফায় কয়েক লাখ রোহিঙ্গা দেশছাড়া হয়েছিল, তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি সরকার। আলোচনার মাধ্যমে সেই সময় বিএনপি সরকার রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছিল। তাই রোহিঙ্গাদের আশা, অতীতের মতো এবারও বিএনপি সরকারই এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে।
প্রত্যাবাসন ইস্যুতে আপাতত দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই জানিয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, তবে সরকার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। নতুন করে যেন আর কোনো রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ না ঘটে, সেই বিষয়ে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রাখাইন রাজ্যের অবকাঠামোগত সমস্যা ও আর্থিক সংকট প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে।



Comments
Comments