বেকারির ভেতরে 'তেলাপোকার কারখানা', ইফতারি তৈরিতে নেই স্বাস্থ্যবিধি
![]() |
| নগরের চকবাজারের কাচ্চি ডাইনের রান্নাঘরে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভিযান। সম্প্রতি তোলা | ছবি: নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সৌজন্যে |
বেকারির সামনে ফুটপাতে টেবিল সাজিয়ে রাখা হয়েছে নানা পদের ইফতারি। মুখরোচক সব খাবার কিনতে ক্রেতাদের ভিড়। তবে বেকারির ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল অন্য এক চিত্র। রান্নাঘরের দেয়ালজুড়ে শত শত তেলাপোকা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর পাশেই তৈরি করা হচ্ছিল ইফতারের সব আইটেম। স্যাঁতসেঁতে সেই রান্নাঘরে খাবার তৈরিতে স্বাস্থ্যবিধির কোনো বালাই নেই।
বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম শহরের জিইসি মোড় এলাকার হারুন বেকারিতে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখতে পান জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। অনিয়মের দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করার পাশাপাশি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (চট্টগ্রাম বিভাগ) মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ জানান, ছোট একটি বেকারি; কিন্তু ভেতরে দেখলে মনে হয় যেন তেলাপোকার কারখানা। আমরা রান্নাঘরে ঢুকেই রীতিমতো অবাক হয়েছি। দেয়ালজুড়ে তেলাপোকার বিচরণ ছিল এবং সেগুলো সবখানে ঘোরাঘুরি করছিল।
![]() |
| নগরের জিইসি মোড়ের হারুন বেকারিতে কয়েক শ তেলাপোকার বিচরণ। গতকাল তোলা | ছবি: সংগৃহীত |
শুধু হারুন বেকারি নয়, গত ১০ দিনে চট্টগ্রাম শহরের অন্তত ৫টি বেকারি ও রেস্তোরাঁয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ খুঁজে পেয়েছেন নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তা অধিকার রক্ষা কর্মকর্তারা। এর মধ্যে বারকোড সুইটস এবং মেরিডিয়ান রেস্তোরাঁর মতো নামী প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ মো. জসিম উদ্দিন জানান, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি খাবার মানুষের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তেলাপোকা বিভিন্ন ধরনের জীবাণু, ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া বহন করে। এসব জীবাণু খাবারের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে ডায়রিয়া, আমাশয় ও খাবারে বিষক্রিয়াসহ (ফুড পয়জনিং) নানা রোগের সৃষ্টি করতে পারে।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি শহরের চকবাজার এলাকায় জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ ‘কাচ্চি ডাইন’ পরিদর্শনে যান জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসন। সেখানকার রান্নাঘরে ঢুকতেই ইঁদুর ও তেলাপোকার অবাধ বিচরণ চোখে পড়ে। এরপর ১ মার্চ মুরাদপুর এলাকায় ‘বারকোড সুইটস অ্যান্ড কনফেকশনারি’র রান্নাঘরে গিয়েও তেলাপোকা, ছারপোকা ও বিড়ালের উপস্থিতি পাওয়া যায়।
গত বুধবার কালুরঘাট এলাকার ‘বিএসপি ফুড প্রোডাক্টস প্রাইভেট লিমিটেড’ এবং বৃহস্পতিবার গরীবুল্লাহ শাহ হাউজিং এলাকায় ‘হোম রেসিপি ফুড বেকারি’র রান্নাঘরেও তেলাপোকা পাওয়া গেছে। নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তারা জানান, এই চারটি প্রতিষ্ঠানের রান্নাঘরই ছিল স্যাঁতসেঁতে ও নোংরা।
কর্মকর্তারা আরও জানান, এসব প্রতিষ্ঠানকে আগে বড় অঙ্কের জরিমানা ও সতর্ক করা হলেও বারবার একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান জরিমানা দেওয়ার পর সাময়িকভাবে কিছুটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকলেও পরে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। ফলে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
![]() |
| নগরের মুরাদপুরের বারকোড সুইটসে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভিযান। সম্প্রতি তোলা | ছবি: সংগৃহীত |
বৃহস্পতিবার শহরের চকবাজার এলাকায় ‘সাতকানিয়া ভাতঘর’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায় জেলা প্রশাসন। সেখানে জিলাপি তৈরিতে হাইড্রোজের ব্যবহার হাতেনাতে ধরা পড়ে। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ সময় বা অতিরিক্ত মাত্রায় এই রাসায়নিক শরীরে প্রবেশ করলে কিডনির মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। এমনকি এটি মেধাশক্তিও কমিয়ে দিতে পারে।
কর্মকর্তারা জানান, হাইড্রোজের ড্রামের ওপরই লেখা থাকে যে, এটি ব্যবহারের সময় কোনো কিছু খাওয়া বা পান করা যাবে না, কারণ এটি বাতাসে ক্ষতিকর কণা ছড়ায়। মূলত পোশাক শিল্পে ব্যবহারের জন্য তৈরি এই রাসায়নিক এখন মেশানো হচ্ছে খাবারে। এছাড়া গোপালজল ও কেওড়াজল খাবারে ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও অনেক প্রতিষ্ঠান তা মানছে না।
এসব অনিয়ম ঠেকাতে প্রতিষ্ঠানগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ (সিলগালা) করে দেওয়ার মতো কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, শুধু জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়ার কারণে তারা বারবার একই অপরাধ করছে। যেহেতু আইন অনুযায়ী স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ার বিধান আছে, তাই এসব প্রতিষ্ঠানকে কঠিন শাস্তি দিলে অন্যরাও সতর্ক হবে।



Comments
Comments