[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

জলের নিচে বিশ্বাস, উপরে মেলা

প্রকাশঃ
অ+ অ-
লালমনিরহাট সদরের পঞ্চগ্রামের সিন্দুরমতি দিঘিতে পুণ্যার্থীদের স্নান। শুক্রবার সকালে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন  

কাকডাকা ভোরে আকাশে তখনও রঙের আভা ফুটেনি। পূর্ব দিগন্তে আলোর আলো ফোটার আগেই চারপাশ নরম অন্ধকারে ঢাকা থাকে। সেই অন্ধকার ভেদ করে লালমনিরহাটের পঞ্চগ্রামের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী সিন্দুরমতি দিঘির পাড়ে সনাতন সম্প্রদায়ের মানুষজনের ঢল নামে। কারও কাঁধে গামছা, কারও হাতে ফুল আর ধূপ, কারও চোখে বহুদিনের মানত পূরণের নীরব প্রত্যাশা।

চৈত্রের নবমী। বাংলা সনের এই দিনে অন্তত একবার পানিতে নেমে নিজের মন-দেহকে ধুয়ে নেওয়ার আশায় থাকে এ অঞ্চলের মানুষ। প্রতিবছর চৈত্রের রামনবমীতে স্নান উপলক্ষে সিন্দুরমতি দিঘি ও আশপাশের এলাকায় বসে বিশাল মেলা। দেশ-বিদেশ থেকে হাজারো পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীর আগমন হয়। অন্যান্য বছরের মতো এবারও পুণ্যস্থান ও মেলা বসেছিল।

সকাল ৬টায় সিন্দুরমতি দিঘির পানি তখনও স্থির। যেন শতাব্দীর বহু স্মৃতি জমে আছে স্তরে স্তরে। প্রথম সূর্যের আলো পড়তেই পানি ঝিলিক করে ওঠে। সেই ঝিলিকে ভেতরে নেমে পড়েন সনাতন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন বয়সের পুণ্যার্থী। কেউ নিঃশব্দে, কেউ মন্ত্রোচ্চারণে। জল ছিটকে উঠে আবার শান্ত হয়। এই ওঠানামার মধ্যে মিশে আছে বিশ্বাস।

পুণ্যার্থীদের কেউ বলেন, এখানে স্নান করলে পাপমোচন হয়। কেউ বলেন, মনের ইচ্ছা পূর্ণ হয়। আবার কেউ কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে প্রতিবছর এখানে এসে দাঁড়ান, যেন অদৃশ্য এক টান তাদের টেনে আনে।

লালমনিরহাট সদরের পঞ্চগ্রামে শত বছরের পুরোনো সিন্দুরমতি দিঘির পাড়ে সিন্দুরমতি মেলায় হাজারো মানুষের ভিড়। শুক্রবার সকালে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন  

দিঘির পাড়ে তখন এক অন্য জগৎ গড়ে ওঠে। জলের ভেতরে বিশ্বাসের পাশে মাটির ওপর জমে ওঠে মেলার কোলাহল। সারি সারি অস্থায়ী দোকান—মাটির হাঁড়ি, বাঁশের ঝুড়ি, কাচের চুড়ি, রঙিন খেলনা। বাতাসে ভেসে আসে জিলাপি, ভাজা মুড়ির মিষ্টি গন্ধ আর মানুষের কণ্ঠের টান টান সুর।

এই মেলা শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, স্মৃতিরও বাজার। বহু বছর পর দেখা হয় আত্মীয় ও পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে। কেউ গল্পে মেতে ওঠেন, কেউ হারিয়ে যান ভিড়ের মধ্যে। স্থানীয় প্রবীণরা বলেন, এই দিঘির ইতিহাস বহু পুরানো। জনশ্রুতি আছে, এক জমিদার সন্তানের আশায় এই দিঘি খনন করিয়েছিলেন। সময়ের সঙ্গে সেই ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা রূপ নিয়েছে সমষ্টিগত বিশ্বাসে। একটি মানুষের গল্প ধীরে ধীরে হাজার মানুষের তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে।

লালমনিরহাট জেলা জাদুঘর থেকে ২০০৭ সালে প্রকাশিত মো. আশরাফুজ্জামান মণ্ডলের লেখা ‘লালমনিরহাট জেলার ইতিহাস’ বইয়ের ১৫৯ থেকে ১৬৩ পাতায় সিন্দুরমতি দিঘি অধ্যায়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে। সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের সিন্দুরমতি মৌজার প্রাচীন এই দিঘির আয়তন ১৬ একর ৫ শতক। যার মধ্যে জলায়তন ১৩ একর। বইয়ে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭৫ সালে সিন্দুরমতি দিঘি সরকারি উদ্যোগে আংশিকভাবে পুনঃখনন করা হয়। তখন মূল্যবান মুদ্রা, মূর্তি ও পাথর পাওয়া যায়। এরপর ২০০৩ সালের মার্চে পাকা ঘাট নির্মাণের জন্য দিঘির উত্তর পাড়ে খনন করলে প্রাচীন একটি ঘাটের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়।

দুপুরের দিকে রোদ চড়ে বসে। মেলার ভিড় তখন ঘন হয়ে ওঠে। মাইকে ভেসে আসে ঘোষণা, কোথাও বাউল সুর, কোথাও শিশুদের হাসি। বিকেলের দিকে সূর্যের আলো কমে এলে দূরের গাছের ছায়া দিঘির পানিতে লম্বা হয়ে পড়ে। ভিড় ধীরে ধীরে কমতে থাকে। কেউ বাড়ির পথে হাঁটেন, কেউ শেষবারের মতো দিঘির দিকে তাকান। দিনের শেষে থেকে যায় শুধু কিছু পায়ের ছাপ, কিছু ভেজা কাপড়ের গন্ধ আর এক দিনের মধ্যে জমে ওঠা অগণিত গল্প।

সিন্দুরমতি দিঘির পাড়ে সিন্দুরমতি মেলার উদ্বোধন করেন লালমনিরহাট-৩ সদর আসনের সংসদ সদস্য এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। শুক্রবার সকালে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন  

 লালমনিরহাটের পাশের জেলা কুড়িগ্রামের যতীনের হাট থেকে আসা পুণ্যার্থী গৌতম কুমার রায় (৪০) বলেন, ‘আগেও অনেকবার এসেছি। এবার মা-বাবাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি। কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র নদে অষ্টমীর স্নানে অনেক ভিড় থাকে। এখানে ভিড় কিছুটা কম। তাই এবার তাঁদের এখানে নিয়ে এসেছি। আমরা তিনজনই সিন্দুরমতি দিঘির জলে স্নান করেছি। ভালো লাগছে।’

সিন্দুরমতি দিঘির পাড়ে সিন্দুরমতি মেলার উদ্বোধন করেন লালমনিরহাট-৩ সদর আসনের সংসদ সদস্য এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব (দুলু)। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সিন্দুরমতি দিঘি শত বছরের ঐতিহ্য ধরে টিকে আছে। এটি শুধু সনাতন সম্প্রদায়ের পুণ্যস্থান নয়; বরং জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে এলাকার মানুষের সহাবস্থান ও সম্প্রীতির মেলবন্ধন গড়ে তুলেছে। সিন্দুরমতি দিঘি ও মেলা ঘিরে পর্যটন এলাকা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ঐতিহ্যবাহী সিন্দুরমতি দিঘি
Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন