ঋণের চাপ বাড়ছে, বিপাকে পোলট্রি খামারিরা
পোলট্রি খাতে সংকট
টানা চার মাস ধরে উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন দেশের প্রান্তিক পোলট্রি খামারিরা। প্রতিটি ডিম উৎপাদনে যেখানে খরচ হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৯ টাকা, সেখানে খামারিদের বিক্রি করতে হচ্ছে সাড়ে ৬ টাকার মতো দামে। প্রতিটি ডিমেই প্রায় তিন টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। দিনের পর দিন এই লোকসান, ঋণের বোঝা এবং বকেয়া বিলের চাপে অনেক খামারি এখন নিঃস্ব।
সম্প্রতি টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরসহ কয়েকটি এলাকা ঘুরে খামারিদের এমনই হতাশাজনক চিত্র দেখা গেছে। লোকসানের ভার সইতে না পেরে অনেকে খামার গুটিয়ে নিয়েছেন, কেউ পেশা বদলেছেন, আবার কেউ ঋণের চাপে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। খামারিদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে ছোট খামারগুলো বন্ধ হয়ে ভবিষ্যতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব সরাসরি ভোক্তার ওপর পড়বে।
টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী ইউনিয়নের রবিউল ইসলাম চকদার একসময় পরিচিত খামারি ছিলেন। কয়েক হাজার মুরগির খামার ছিল তাঁর, কাজ করতেন কয়েকজন কর্মচারীও। এখন সেই খামার নেই। জীবিকার তাগিদে তিনি এখন একটি ভবনে দারোয়ানের কাজ করছেন। রবিউল বলেন, ‘যৌবনের সব শক্তি দিয়ে খামার দাঁড়িয়ে করেছিলাম। ভাবছিলাম সামনে ভালো সময় আসবে, কিন্তু বাড়িছাড়া হতে হলো। যদি সরকারের একটু সহযোগিতা পেতাম, তবে এই অবস্থায় পড়তে হতো না।’
একসময় টাঙ্গাইলকে ‘ডিমের রাজধানী’ বলা হতো। কিন্তু এখন জেলার অনেক এলাকায় খামারের সেই কর্মচাঞ্চল্য আর নেই। কোথাও খালি শেড পড়ে আছে, কোথাও আবার অল্প কিছু মুরগি নিয়ে কোনোভাবে টিকে থাকার চেষ্টা চলছে। যারা এখনও খামার চালাচ্ছেন, তাঁরা বলছেন, পরিস্থিতি না বদলালে ঈদের পর অনেকেই খামার বন্ধ করে দেবেন।
ভূঞাপুরের খামারি খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘গত সোমবার ডিম বিক্রি করেছি সাড়ে ৬ টাকায়। অথচ খরচ হয়েছে সাড়ে ৯ টাকা। এক হাজার মুরগি পালতে প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা খরচ হয়। ডিম বিক্রি করে এখন মুরগির খাবারের খরচই ওঠে না।’ আগে তাঁর খামারে তিনজন কর্মচারী ছিল, এখন একজন দিয়ে কোনোমতে চালাচ্ছেন।
খামারিদের অভিযোগ, মাঠ পর্যায়ে ডিমের দাম কম হলেও ভোক্তারা বেশি দামেই কিনছেন। জাহাঙ্গীর আলম জানান, তাঁদের কাছ থেকে প্রতি হালি ডিম ২৪ থেকে ২৬ টাকায় নেওয়া হলেও দোকানে তা ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝখানের এই বড় মুনাফা নিয়ে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। এ ছাড়া মুরগির খাদ্য ও ওষুধের দাম নির্ধারণেও বড় কোম্পানিগুলোর আধিপত্য রয়েছে বলে দাবি খামারিদের। এক কেজি প্রোটিনের প্রকৃত মূল্য ৯০ টাকার মতো হলেও খামারিদের তা কিনতে হচ্ছে ২১০ টাকায়।
২৪ বছর ধরে পোলট্রি খামারের সঙ্গে যুক্ত আব্দুল মালেক এখন চরম আর্থিক সংকটে। তিনি জানান, বর্তমানে প্রতিদিন তাঁর প্রায় ৪০ হাজার টাকা এবং মাসে চার লাখ টাকার বেশি লোকসান হচ্ছে। তিন মাস ধরে বিদ্যুৎ বিল দিতে না পারায় এখন প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকা বকেয়া পড়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে তিনি খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন।
ভূঞাপুরের আরেক খামারি আবু হানিফ বলেন, ন্যায্যমূল্য না পেয়ে অনেক খামারি দেউলিয়া হয়ে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। কেউ বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, কেউবা ঋণের বোঝা নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আলম হোসেন নামে এক খামারি জানান, তাঁর ২০ হাজার মুরগির খামারে দেড় মাসে প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, এভাবে চললে এই খাতটিই ধ্বংস হয়ে যাবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রান্তিক খামারিদের উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় তারা দ্রুত লোকসানে পড়েন। বড় বাণিজ্যিক খামারগুলো সহজে ঋণ ও সরকারি সুবিধা পেলেও প্রান্তিক খামারিরা তা পান না। বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য রোধ করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারগুলো টিকিয়ে রাখা জরুরি।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী সতর্ক করে বলেন, প্রান্তিক খামারিরা টিকতে না পারলে গোটা শিল্প কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। তখন ভোক্তাদের অনেক বেশি দামে ডিম ও মুরগি কিনতে হবে।
খামারিদের অভিযোগ, এ খাত নিয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর নীতিমালা নেই। তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. এ বি এম খালেদুজ্জামান স্বীকার করেছেন যে খামারের সংখ্যা আগের চেয়ে কমেছে। তাঁর দাবি, পোলট্রি উন্নয়ন নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে এ খাতটি সুরক্ষা পাবে।

Comments
Comments